ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বর্ণমালার দুঃখ

মোজাফফর হোসেন

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ১৮:৩৪ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ১৮:৪১


প্রিন্ট

একটি ভাষাকে ধরে রাখা এবং সে ভাষাকে নিজের চোখে দেখার একমাত্র মাধ্যম হলো বর্ণ। বর্ণকে ধ্বনি প্রকাশক চিহ্ন বলা হয়। অর্থাৎ ধ্বনিকে ধরে রাখা যায় বর্ণের মধ্যে। ধ্বনি হচ্ছে ভাষার ক্ষুদ্রতম একক আর ধ্বনির লিখিত রূপের একক হচ্ছে বর্ণ। ধ্বনিকে ভাষার প্রাণ বলা হয়ে থাকে; বর্ণ সেই প্রাণের আধার। ধ্বনিকে লিখিত রূপে প্রকাশ করার জন্য বাংলা ভাষার নিজস্ব বর্ণ রয়েছে। সে বর্ণের ইতিহাস-ঐতিহ্যও অনেক পুরনো। এটি বাংলা ভাষার গর্ব। পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজারের কাছাকাছি (ধারণা করা হয়) ভাষা থাকতে পারে। এসব ভাষার মধ্যে অনেক ভাষারই বর্ণ আছে, আবার কিছু কিছু ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণ নেই। বাংলা ভাষার যে নিজস্ব বর্ণ আছে সে দিক থেকেও বাংলা ভাষাসমৃদ্ধ। ভাষা লিখিতভাবে প্রকাশ করার জন্য বর্ণমালার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বর্ণ ছাড়াও একটি ভাষা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে পারে।
বাংলা ভাষাতে ধ্বনির রূপভেদে ৫০টির মতো বর্ণ রয়েছে। পরিশীলিত এই ধ্বনিমালা আছে বলেই এ ভাষার লেখ্য ও কথ্য দু’টি রূপই বিদ্যমান এবং সমান তালে সচল। লিখিত বর্ণমালার মাধ্যমে ভাষার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপটিকে পরিষ্কার করে তোলা হয় আর কথ্য রূপটি শ্রুতিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে ধ্বনির মাধ্যমে। একটি ভাষাকে দীর্ঘজীবী করতে এই দু’টি রূপেরই গুরুত্ব প্রশ্নাতীত।
ভাষার লিখনপদ্ধতির উদ্ভব ঠিক কখন হয়েছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। গবেষকদের ধারণা মানব সভ্যতার উষালগ্নে রাষ্ট্রীয় কার্যসম্পাদনের জন্য লিখনের উদ্ভব ঘটে। জানা যায় আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব চার শ’ বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় লিখনপদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। তবে লেখার জন্য বর্ণ কিভাবে এলো এ বিষয়ে কিছু উপকথা প্রচলিত আছে। চীনা উপকথা অনুসারে ‘সাং-চিয়েন’ নামের ড্রাগনমুখো এক লোক প্রাচীনকালে চীনা বর্ণ তৈরি করেছিলেন। মিশরীয় উপকথা মতে পাখির মতো মাথা এবং মানুষের দেহের মতো দেহবিশিষ্ট দেবতা ‘থথ’ তৈরি করেছিলেন মিশরীয় লিপি। ভারতীয় উপকথার বর্ণনায় পাওয়া যায় হিন্দু দেবতা ‘ব্রহ্মা’ ভারতবর্ষের ব্রাহ্মী লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ব্রহ্মার নামানুসারে এই লিপির নাম হয় ব্রাহ্মী লিপি। তবে লিপিবিশারদদের মতে চিত্র থেকে কালের বিবর্তনে সৃষ্টি হয় বর্ণ বা লিপি। উল্লেখ্য, মুসলিমরা এসব তথ্যে আস্থা রাখতে পারেন না। মুসলিম সমাজের বিশ্বাস মতে আদম আ: পৃথিবীর প্রথম মানুষ। ‘আল্লাহ আদম আ:কে ভাষা শিখিয়েছেন’ (সূরা রহমান : আয়াত ২-৩) এবং ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন কলমের মাধ্যমে’ (সূরা আলাক : আয়াত ৪)। পবিত্র কুরআনের এ তথ্যমতে মানুষ (আদম আ:) লিখনবিদ্যা ও শিখনজ্ঞান নিয়েই পৃথিবীতে পদার্পণ করেছিলেন। যুগের পরিক্রমায় মানুষকে লিখনপদ্ধতি উদ্ভাবন এবং ভাষা আয়ত্ত করতে হয়নি। এ ছাড়া আদম আ:-এর ভাষা ছিল আরবি। পশ্চিমা ভাষা একাডেমির মতে, ব্রাহ্মী লিপি সেমিটিক লিপি থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সেমিটিক লিপি হচ্ছে ইন্দো-আরবীয় লিপি। কুরআনে বর্ণিত তথ্যসূত্র ধরে গবেষণা হলে সব পৃথিবীর ভাষা ও তার লিখনপদ্ধতি বিষয়ে সঠিক ইতিহাস উদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
ভাষা ও লিখনপদ্ধতি নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে কুরআনের তথ্য-উপাত্তের বাইরে তা হয়েছে। আর সেসব অনুসন্ধানে এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে বর্ণমালাভিত্তিক সবচেয়ে প্রাচীন যে লিপি; তা হলো ফিনিশীয় লিপি। ভূমধ্যসাগরের তীরে ফিনিশীয় জাতির বসবাস ছিল। অনুমান করা হয় গ্রিক ও ইহুদিরা ফিনিশীয়দের কাছ থেকে বর্ণমালার আইডিয়া পেয়েছিলেন; সেখান থেকে রোমানদের কাছে বর্ণমালার ধারণা চলে আসে। রোমান বর্ণমালার আদলে ইউরোপের বিভিন্ন ভাষার বর্ণমালা তৈরি হয়। ভারতবর্ষের ব্রাহ্মীলিপির ওপর ফিনিশীয় লিপির প্রভাব পড়েছিল বলে মনে করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপির প্রচলন ছিল। এরপর সম্রাট অশোকের সময় মৌর্যলিপিতে বিবর্তন শুরু হলে সে পরিবর্তনের ধারায় জন্ম নেয় কুষাণ লিপি। কুষাণ লিপিতে দু’টি ধারা সৃষ্টি হলে উত্তরী লিপির মধ্যে গুপ্তলিপি প্রধান হয়ে ওঠে। এই গুপ্তলিপি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতেও লক্ষ করা গেছে। গুপ্তলিপি থেকে জন্মগ্রহণ করে ‘কুটিল’ লিপি। এই লিপি ষষ্ঠ থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। কুটিল লিপির একটি বিবর্তনে তৈরি হয় ‘নাগরী’ লিপি; তার পূর্বশাখা থেকে দশম শতকের দিকে এসে বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে বলে লিপিবিশারদেরা মনে করেন। কম্বোজ রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালদেবের বাণগড় দানপত্রের লিপিতে আদি বাংলা বর্ণমালায় খচিত লেখা দেখা যায়। সেই থেকে বাংলা বর্ণমালার পথচলা।
ছাপাখানা তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলা বর্ণের গঠন স্থিত হতে পারেনি। মুদ্রণযন্ত্র তৈরির পরও কিছু কিছু হরফ পরিমার্জন করা হয়েছে। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড সাহেবের মাধ্যমে বাংলা মুদ্রণশিল্প জন্মলাভ করে। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুরে ব্যাপ্টিস্ট মিশনে প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মিশনের উইলিয়াম কেরি ও উইলিয়াম ওয়ার্ড ছিলেন ছাপাখানা বিশেষজ্ঞ। উইরিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড ও পঞ্চানন কর্মকারের প্রচেষ্টায় বাংলা হরফের চেহারার উন্নতি হতে থাকে। উনিশ শতকের তৃতীয় দশকেই বাংলা ছাপার চেহারা অনেকখানি পাল্টে যায় এবং ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাংলা বর্ণ প্রেসে ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক যোগ্যতা অর্জন করে। ফলে বাংলা ভাষা লেখ্য ও কথ্য দু’টি রূপেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
চর্যাগীতিকার ভাষা (বাংলা) মধ্যযুগের আগ পর্যন্ত আর বড়–চণ্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভাষা ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত (বাংলা ভাষা তার) নিজস্ব শব্দাবলিতেই ভাব প্রকাশ করেছিল। ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গে মুসলিমরা অভিযান করলে তার পর থেকে বাংলা ভাষাতে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। মহাকবি আলাওল কর্তৃক রচিত ‘পদ্মাবতি’ কাব্যের ভাষা তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এর পর থেকে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে পর্তুগিজ, ডাচ, ফিরিঙ্গি, উর্দু, হিন্দি, তুর্কি, চীনা, জাপানি, মালয়, স্পেনীয়, বর্মি, গুজরাটি, জার্মান, ওলন্দাজ, ফরাসি, ল্যাটিন, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দমালা। এসব ভাষার বহু শব্দ বাংলা ভাষাতে স্থায়ী রূপলাভ করেছে। অনেকেই মন্তব্য করেন বাংলা ভাষার গ্রহণক্ষমতা বেশি বলেই বিদেশী শব্দগুলোকে আপন করতে পেরেছে এবং ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এ কারণে যে ভাষার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা তারা ভাবতে চেষ্টা করেননি। ভারত উপমহাদেশে ইংরেজরা কর্তৃক কলোনি স্থাপনের মধ্য দিয়ে ইংরেজি ভাষার অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। নিজেদের প্রয়োজনে বাংলা শেখার জন্য ইংরেজরা শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করলেও তাদের ব্যবহৃত ইংরেজি অনেক শব্দ বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়ে আজো চলে আসছে। ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে কিন্তু ইংরেজি ভাষার আগ্রাসন সময়ের ব্যবধানে আরো জোরালো হয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভাষাও এখন বাণিজ্যের মাধ্যম হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিতে ইংরেজি ভাষার চর্চা জীবন-জীবিকার উপায়-উপকরণে পরিণত হতে চলেছে। ফলে জীবিকা অনুসন্ধানী বাংলা ভাষাভাষীরা এখন ইংরেজি চর্চায় মনোনিবেশ করছে। যে দেশের মানুষ মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে রক্ত দিয়েছে বলে গর্ববোধ করে, বছরান্তে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়; সে দেশের মাটিতে দিনের পর দিন নতুন নতুন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শব্দসংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। লাখ লাখ টি-শার্টের বুকে ও পিঠে ইংরেজি শব্দের সিল লাগিয়ে ইংরেজি চর্চার সুযোগ করে দেয়া হয়। আদালতের ভাষা এখনো ইংরেজিতে রয়ে যায়। মন্ত্রীরা সাংবাদিকদের সামনে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। হিন্দি গান, সিরিয়াল, সিনেমায় ব্যস্ত হয়ে যায় তরুণ প্রজন্মের নতুন নতুন নাগরিক। কথায় কথায় তারা বাংরেজহি (বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি একসাথে) ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে। বিদেশী শব্দ নিয়ে খেলা করে। সে দেশে বাংলা বর্ণমালার চর্চা কিভাবে হয়? তা চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। এভাবে বাংলা ভাষায় যদি ৮০ শতাংশ ইংরেজি আর ২০ শতাংশ হিন্দি শব্দ জায়গা দখল করতে পারে, তখন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে কি না ভাবতে হবে। বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন যদি অনুষ্ঠান সর্বস্ব হয় তাহলে এ ভাষাকে বেশিদিন টিকে রাখা কষ্টকর হতে পারে।
ভাষাকে টিকে রাখতে চাইলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার সুনিশ্চিত করা এবং আত্মস্থ করার ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। খেয়াল করলে দেখা যায় ৬১০ থেকে ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আরবি ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অন্য দিকে চর্যাগীতিকার পদগুলো রচিত হয়েছে আরো ৫০ বছর পর থেকে (৬৫০-১২০০ খ্রি:)। আরবি ভাষাভাষী তো নয়-ই এমনকি বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মধ্যে যারা আরবি জানেন তাদের জন্য কুরআন পাঠ করে বুঝে ওঠা মোটেই কষ্টকর নয়, অথচ বাংলা ভাষায় রচিত চর্যাপদগুলো এখন বাংলা ভাষাভাষীরা আর পড়ে বুঝে উঠতে পারেন না। এখান থেকে অনুমান করা সহজ হতে পারে আরবি ভাষার অলৌকিকতা কী আর বাংলা ভাষার পরিপক্বতা কোথায়?

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫