ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

রকমারি

শোলার অনন্য শিল্পকর্ম

হাসান মাহমুদ রিপন

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৭:২৮ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৮:১৭


প্রিন্ট

বাঙালির ঐতিহ্য ও লোকজ জীবনের এক অনন্য শিল্পকর্ম শোলা শিল্প। এ শিল্প আমাদের দেশজ গুল্মজাতীয় এক ধরনের উদ্ভিদ ব্যবহার করে করা হয়। আর অঞ্চলভেদে এ উদ্ভিদকে মালি শোলা ও ভাট শোলা বলে থাকে। শোলা নরম ও হালকা হওয়ায় ইংরেজিতে ‘স্পঞ্জ’ নামে বেশ পরিচিত। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ এ বাংলাদেশ। আমাদের দেশে বর্ষাকালে জলাশয় ও নিচু জায়গায় গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ এ শোলার বংশবিস্তার ঘটে। তবে এখনো পর্যন্ত এ গুল্মজাত উদ্ভিদের কোথাও কোনো চাষাবাদ করা শুরু হয়নি। এটি বিভিন্ন ফসলের সাথে আগাছা হিসেবে জন্মে থাকে।

ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, লোকাচার, ধর্মাচার, সামাজিক বিবর্তন, জাতিতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপট সব মিলিয়ে লোক সংস্কৃতিতে, লোকশিল্পে অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছে শোলার শিল্পকর্ম। এ শোলার শিল্পকর্ম সনাতন ধর্মালম্বীরাই বেশি ব্যবহার করে আসছে। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেবদেবীর প্রতীমা অলঙ্করণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানে, মন্দির বা কোনো স্মৃতিসৌধের মডেল তৈরির জন্য শোলার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মসৃণ ও পাতলা শোলার ফালি আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি ক্যানভাসে জলরঙ দিয়ে নানা লোকজ গাথা ও ধর্মীয় কাহিনী চিত্রিত করা হয়ে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পূজা-পার্বণে দেবদেবীর প্রতিকৃতি শোলার ক্যানভাসে জলরঙে আঁকা হয়। এ ছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনের জন্য তৈরির শোলার মুকুট বা টোপর এবং মালার ব্যবহার এক অপরূপ কারুকার্যময় বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে।

এ শিল্প জেলে সম্প্রদায়দেরও ব্যবহার করতে দেখা যায়, মাছ শিকারের বড়শির ফাতনা তৈরিতে, মাছ ধরার জাল ও গৃহসজ্জার জিনিসপত্র তৈরি করার জন্য শোলার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। শোলার তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী গ্রামাঞ্চলের মেলায় যেমন- চৈত্রসংক্রান্তির মেলা, পৌষ মেলা, লক্ষ্মীপূজার মেলা, কালীপূজার মেলা এবং বৈশাখি মেলায় সমাদৃত। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে এসব দ্রব্যসামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শোলার শিল্পকর্ম তৈরি হয়। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম ও বরিশালের দক্ষিণাঞ্চলে এক সময় শোলার কাজের জন্য খ্যাত ছিল। এই পেশায় নিয়োজিত কারুশিল্পীরা মালাকার বা শোলারী নামে পরিচিত।

কথা হলো ঝিনাইদহের শোলা শিল্পী গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সাথে। তিনি ৪১ বছর ধরে এ শিল্পকর্মের সাথে জড়িত। শিশুকাল থেকে খেলার ছলে প্রথমে ককশিট দিয়ে বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরি করতেন। প্রথম কর্মজীবনে মনোনিবেশ করেন পাকিস্তান আমলে কুষ্টিয়ার জগদীশ সুগার মিলের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে। এরপর যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিলে তিনি সনাতন ধর্মালম্বীর লোক হওয়া সেখান থেকে তার চাকরি চলে যায়। পরবর্তীতে ঢাকার সাইন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় আইডিয়াল কলেজের পিওন পদে নতুন করে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রতিটি কর্মস্থলেই শোলা শিল্পকর্মকে তার অবসর দিনযাপনের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। ফলে তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে কলেজের বিভিন্ন আসবাবপত্রের সাথে আসা ফোম শোলা বা ককশিট ব্যবহার করে শিল্পকর্ম তৈরি করতে থাকেন। এমনি করে চলতে থাকলে ওই কলেজের শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম ও এক ছাত্রীর নজরে পড়ে যায় গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর ককশিটের তৈরি অসাধারণ সব শিল্পকর্ম। একপর্যায় ওই কলেজ ছাত্রীর অনুপ্রেরণায় তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমিতে বিসিকের বৈশাখী মেলায় তার হাতে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্মের মধ্যে শ’তিনেক পণ্য নিয়ে অংশ নেন। সাত দিনের মেলার প্রথম দিনেই তার সবগুলো শিল্পকর্ম বিক্রি হয়ে যায়। শোলা শিল্পের প্রতি ক্রেতাদের বিপুল আগ্রহ দেখে কলেজের সবাই তাকে এ শিল্প নিয়ে কাজ করার জন্য উৎসাহ দেয়। ১৯৮৪ সালের দিকে তিনি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে যোগদান করেন। এখানে যোগদানের পর তিনি কাজের ফাঁকে শোলা শিল্প নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু করেন। এতে ওই প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা তাকে সহযোগিতা করেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মেলায় তার শোলা শিল্পকর্ম নিয়ে অংশ নিয়ে বিভিন্ন পুরস্কারও পেতে থাকেন। ফলে দিন দিন শোলা শিল্প নিয়ে তার কাজের পরিধিও বৃদ্ধি পেতে থাকে। গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চলতি বছরে জানুয়ারি মাসে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে অবসর নেয়ার পর শিল্পকর্মের প্রতি আরো বেশি মনোনিবেশ করেন। তার নিপুণ হাতে তৈরি অসাধারণ বিভিন্ন শিল্পকর্মের মধ্যে কুমির, পালকি, গরুর গাড়ি, তাজমহল, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, ঘোড়ার গাড়ি, পাখা, মাছ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি শিল্পকর্ম আকার ও কারুকাজের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী জানান, শোলা শিল্পকর্ম দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটকদের কাছে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ শিল্পকর্মের সাথে জড়িতদের পণ্য বিক্রির বাজার তৈরি করে দিলে এ শিল্পের আরো প্রসার ঘটবে।

কথা হলো আরো কয়েকজন শোলা শিল্পীর সাথে। নিখিল মালাকার, বাবা শঙ্কর কুমার মালাকার। তিনি শোলার কাজের মূল কারিগর, মাগুরা জেলার শালিকা উপজেলার শতপাড়া গ্রামে তাদের বাড়ি। চার ছেলে দুই মেয়ের মাঝে নিখিল মালাকার বড়। তার রয়েছে দুই ছেলে। বংশগতভাবে তিনি এ পেশায় জড়িত। তারা দুই ভাই এ শিল্পের সাথে জড়িত থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা পড়ালেখা করছে। বিষ্ণুপদ মালাকার, বাবা অমল মালাকার। বিষ্ণুরা তিন ভাই দুই বোন, একই এলাকায় বাড়ি। তারা এ শোলা শিল্পকর্মের পণ্য সামগ্রী নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মেলায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকার বিসিক মেলা, বৈশাখী মেলা, সোনারগাঁওয়ে লোকজ কারুশিল্প মেলা। শোলা শিল্পী নয়ন মালাকার, তপন মালাকার, বিশ্বনাথ মালাকার নওগাঁ জেলার আত্রাইয়ে ভবানীপুরে তাদের বাড়ি। তারা বলেন, আমরা জন্মের পর দেখেছি আমাদের দাদা-দাদীরা এ পেশায় কাজ করে আসছেন। বর্তমানে আমরাও এ শিল্পকে পেশা হিসেবে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। শিল্পীরা আরো বলেন, শোলা মূলত ধানের জমিতে বেশি হয়। আগে আমরা বিভিন্ন এলাকার ধানের জমি থেকে শোলা সংগ্রহ করতাম। কিন্তু প্রায় ১০-১২ বছর ধরে এ শোলা ক্রয় করে আনতে হচ্ছে। শোলা দিনে এনে শুকানোর পর খুব সামান্য পরিমাণ জলীয় পদার্থ ধারণ করে। ফলে ওজনে খুব হালকা হয়ে যায়। শুধু একটি ধারালো ছুরি ও কাঁচির সাহায্যে কারুশিল্পীরা বিস্ময়করভাবে তাদের দক্ষতা ও নৈপুণ্যের মাধ্যমে এই শোলা দিয়ে সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত ঝালর, চমৎকার ফুল, নানা ধরনের খেলনা, মুখোশ, সাজসজ্জা ও অলঙ্কারসহ বাংলার চিরায়িত সব নির্দশন তৈরি করেন। শোলার সব শিল্পকর্ম তৈরির জন্য প্রয়োজন তেঁতুলের বিচির তৈরি আঠা, বাঁশ, পাট, সুতা, কাগজ ও বিভিন্ন রঙ। শিল্পীরা জানান, শোলা শিল্পকর্ম সনাতন ধর্মালম্বীরাই বেশি ব্যবহার করে থাকে।

লোকজ কারুশিল্পীরা জানান, আমাদের গ্রামীণ বিভিন্ন শিল্পকে ধরে রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগে এখনো কারুশিল্পের বাজার তৈরি হয়নি। ফলে দেশের একমাত্র বেসরকারি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান আড়ং গ্রামের বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে বাজার তৈরি করলেও শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। আর তাই এসব শিল্পকর্মের সাথে জড়িত শিল্পীরা তাদের পরিবারের অন্যদের এ শিল্পের সাথে নতুন করে জড়াতে চাচ্ছেন না। এসব কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের দেশীয় শোলা শিল্পসহ দুর্লভ বিভিন্ন শিল্পকর্ম।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫