ঢাকা, শুক্রবার,২৬ মে ২০১৭

প্রযুক্তি দিগন্ত

প্রযুক্তি দুনিয়ায় এখনো পিছিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা

নাজমুল হোসেন

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বিজ্ঞানের কল্যাণে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে প্রযুক্তির আশীর্বাদ। ঘরে, বাইরে, হাতের মুঠোয়, কোথায় নেই প্রযুক্তির ব্যবহার। হাতে হাতে স্মার্টফোন। অবিরাম চলছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। এর মাধ্যমে দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রতি মুহূর্তে চলছে যোগাযোগ। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিতে ভাষা মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির প্রচলন তরুণদের মধ্যে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি অবহেলিত বাংলা ভাষা। লিখেছেন নাজমুল হোসেন


সময়ের সাথে সাথে ‘তথ্যপ্রযুক্তি’ পরিণত হয়েছে একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে। বাংলাদেশে এর ব্যবহারও ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি েেত্র বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে আরো গতিশীল করার ল্েয এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হচ্ছে। সরকার দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসার ও বিকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং দেশের আপামর জনগণকে এই প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করতে হলে অবশ্যই একে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করতে হবে। সে ল্েয এ েেত্র যতটা সম্ভব মাতৃভাষার অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন।
বিজয় সফটওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রযুক্তি বিকাশের সাথে সাথে বাংলা ভাষা ব্যবহারের এই উন্নতিটুকু দরকার ছিল। তবে আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি। আর এজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
ইংরেজি ফন্টে বাংলা লেখাকে বাংলা ভাষার জন্য বিপজ্জনক লণ বলে মনে করেন তিনি। বাংলা বিজ্ঞানসম্মত ভাষা হলেও, প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাংলাকে ইংরেজির সমক করতে না পারার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বাংলাভাষাকে আরো শক্তিশালী করতে প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজন।
আমেরিকার জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. রাগিব হাসান বাংলা উইকিপিডিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, বাংলা ভাষার ব্যবহারে আমরা এগিয়েছি। আর এ েেত্র ইউনিকোড প্রযুক্তি সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এতদিন কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো, যার কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল ছিল না। এখন সার্বজনীন ইউনিকোডে বাংলা লেখা হচ্ছে, ফলে ইন্টারনেটে বাংলার ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। বাংলা ব্লগের বিপুল জনপ্রিয়তা ও বাংলা উইকিপিডিয়ার বিস্তার এর বড় প্রমাণ।
সম্প্রতি উবুন্টু লিনাক্স, মাইক্রোসফট উইন্ডোজ এর মাধ্যমেও বাংলায় কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওপেন অফিস, ফায়ারফক্স এসবেরও বাংলা সংস্করণ বেরিয়েছে। প্রতিনিয়ত অত্যন্ত উদ্যমী একঝাঁক তরুণ কাজ করে চলেছেন বিভিন্ন সফটওয়্যারকে স্থানীয়করণ করতে। ইন্টারনেটে বাংলা লেখার সুবিধা অনেকে না জানায় এখনো অনেকে বাংলা কথাকে ইংরেজি হরফে লিখছে বা ইংরেজিতেই আলাপ করছে। এক্ষেত্রে আরো যতœশীল হতে হবে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
পৃথিবীর সপ্তম শীর্ষ ভাষা বাংলার প্রযুক্তিতে ব্যবহার খুবই সামান্য। কম্পিউটারে বাংলা ভাষায় লিখতে এখনো ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন কিবোর্ড লে-আউট। আমাদের বহুল আকাক্সিত ডট বাংলা ডোমেইনের উদ্বোধন হয়েছে সম্প্রতি। বাংলার ব্যবহার প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছায় বিপাকে অপোকৃত কম শিতি প্রযুক্তিনির্ভর মানুষ। এ অবস্থায় কম্পিউটারে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ-সংক্রান্ত এক প্রকল্প উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মঙ্গলবার রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একনেক বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে প্রকল্পটি। একনেকের অনুমোদন পেলে ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)।
প্রকল্পের আওতায় বাংলানির্ভর নতুন ১৬টি সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। এতে ব্যয় হবে ১৫৯ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ হচ্ছে ব্যাপক হারে। স্কুলশিার্থী থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষক পর্যন্ত সবার জীবন বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। তবে বাংলার ব্যবহার কম থাকায় অনেক েেত্র সমস্যা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেসব সমস্যা লাঘব হবে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে নেতৃস্থানীয় হিসেবে বাংলা কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠার ল্েয প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। তা ছাড়া আইসিটিসহায়ক বাংলা ভাষার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রমিতকরণ করা হবে প্রকল্পের আওতায়। বাংলা কম্পিউটিংয়ের জন্য বিভিন্ন টুলস, প্রযুক্তি ও বিষয়বস্তুর উন্নয়ন করা হবে। এর আওতায় সফটওয়্যার উদ্ভাবন করা হবে ১৬টি। পরিচালনা করা হবে বিভিন্ন সমীা, জরিপ ও গবেষণা।
আশার আলো
সরকারি দফতরের প্রশাসনিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। সরকারি নথিপত্র, চিঠি, প্রজ্ঞাপন ও অন্যান্য নথি এখন বাংলায় লেখা হচ্ছে। পুরনো অনেক আইন ইংরেজিতে থাকলেও নতুন আইন-কানুন সব বাংলায় লেখা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে সব তথ্য এখন ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় দেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারে বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাতেই সম্ভব হচ্ছে কম্পিউটারে লেখালেখি, বই-পুস্তক ও পত্রপত্রিকা প্রকাশ, গবেষণা, ওয়েবসাইট নির্মাণ, তথ্য ও ছবি অনুসন্ধান, ই-মেইল আদান-প্রদান, এমনকি ব্লগিং-ও। ব্যবহারিক দিক বিবেচনায় এ সবই বাংলা ভাষার জন্য একটি মাইলফলক। জনপ্রিয় ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগল ১৩০টি ভাষার সঙ্গে বাংলাকেও যুক্ত করেছে। ফলে এখন গুগল বাংলায়ও ব্যবহার করা যায়। কম্পিউটারে ফোনেটিক কিবোর্ড ব্যবহার করে খুব সহজেই সব ধরনের বাংলা লেখা সম্ভব হচ্ছে। বাংলা উইকিপিডিয়া এখন বিশ্বের বৃহত্তম বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট। বাংলা ভাষার অগ্রগতি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেসবুকেও। অভ্র সফটওয়্যারে ইউনিকোড ব্যবহার করে ফেইসবুকসহ সব সাইটেই বাংলায় লেখালেখি সম্ভব হচ্ছে। অভ্রকে অনেকেই বলছেন ইন্টারনেটে বাংলা ব্যবহারের মাইলফলক। কিছু মোবাইল ফোনেও বাংলাতেই সংপ্তি বার্তা (এসএমএস) আদান-প্রদান করা যাচ্ছে। এ ছাড়া মাস তিনেক আগে জি-মেইল ১২টির ভাষার সঙ্গে বাংলাকেও অনুবাদিত ভাষা হিসেবে যুক্ত করায় এখন ফোনেটিক বাংলাতেই ই-মেইল আদান-প্রদান সম্ভব। এমনকি যিনি বাংলা টাইপ করতে জানেন না, তিনিও ফোনেটিকে ইংরেজি অরে বাংলা উচ্চারণে শব্দটি টাইপ করলে, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলা হয়ে যাচ্ছে। অভ্র ছাড়াও ১৯৮৭ সালে বাংলা সফটওয়্যার ‘বিজয়’ এবং একই নামে ১৯৮৮ সালে বাংলা কি-বোর্ড আবিষ্কার করেন। বাংলায় এই ফন্ট ও কিবোর্ডই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ মে কম্পিউটারে প্রথম পত্রিকা ‘আনন্দপত্র'ও প্রকাশ করেন মোস্তফা জব্বার। শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে ‘মুনীর অপটিমা’ টাইপরাইটার আবিষ্কার করেন। এর পর অনেক অফিস-আদালতে কাগজ-কলমের বদলে টাইপরাইটার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার পথচলা। এরপরে আটের দশকে দেশে কম্পিউটার চালু হলে ‘বিজয়’-এর বাংলা লেখালেখি, পত্রপত্রিকা প্রকাশ আরো সহজ হয়। ধারাবাহিকতায় ইউনিজয়, প্রভাত, অভ্র ছাড়াও আরো কয়েকটি বাংলা কিবোর্ড আবিষ্কৃত হয়। একই সঙ্গে সম্ভব হয় ফোনেটিক পদ্ধতিতে বাংলা লেখা। এ সবই প্রযুক্তির হাত ধরে বাংলা ভাষারই প্রসার।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রহণ করে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া দেশগুলো প্রযুক্তিতে ব্যবহার করছে নিজ নিজ মাতৃভাষা। চীন, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশে তথ্যপ্রযুক্তিতে মাতৃভাষার ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এসেছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মানুষও তথ্যপ্রযুক্তিকে মাতৃভাষায় ব্যবহারের উপযোগী করে নিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার যত ব্যবহার বাড়বে, আমরা ততই উপকৃত হবো। সর্বেেত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনো নিশ্চিত হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার বাড়লে সর্বেেত্র বাংলা ভাষার ব্যবহারও বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫