ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

বইমেলা নিয়ে মুহম্মদ নুরুল হুদা এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসী

নয়া দিগন্ত অনলাইন

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩৬


প্রিন্ট

বইমেলা প্রায় শেষের দিকে। আমাদের জাতীয় জীবনে এ মেলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মাসব্যাপী এ মেলায় আসছে হাজারো নতুন বই। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের আন্তরিক বিনিময়ে এ মেলা হয়ে উঠেছে অন্য রকম। মেলা নিয়ে দেশের দুই বিশিষ্টজন দিয়েছেন সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আলাউদ্দিন আদর

মেলা এলে বাংলাদেশ এক মত ও পথের দেশে পরিণত হয় : মুহম্মদ নুরুল হুদা

আপনি তো দীর্ঘ দিন বইমেলা আয়োজনের সাথে জড়িত ছিলেন। বছর ঘুরে বইমেলা এলে কেমন লাগে?
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বেশ আগে থেকেই আমার আসা-যাওয়া। বইমেলা তো আমার চোখের সামনে শুরু হলো। বইমেলার ভেতর প্রবেশ করলে মনে হয়, আমি এমন একটি জায়গায় এসেছি, যেটি পরিপূর্ণরূপে আমার! সত্তরের দশকের শুরুর দিকে যখন মেলা হতো, স্বল্পপরিসরে অনানুষ্ঠানিকভাবে ১৫-২০টি স্টল নিয়ে; তখনো আসতাম, এখনো আসি। নিজেরও একটি স্টল ছিল। এরপর ১৯৮৪ সালে মেলা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো, তখন থেকে শুরু করে ২০০৬ সালে আমি অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত সর্বাধিকবার এই মেলার সদস্যসচিব ছিলাম। সে জন্য এ মেলায় এলে মনে হয় ঘরে ফিরে এসেছি। তাই এ মেলা প্রাণের মেলা তো বটেই, সব মত ও পথের মিলনমেলা। এ যাবৎকালে এ মেলার ভেতর কোনো অঘটন ঘটেছে এ তথ্য আমার জানা নেই। যা ঘটেছে তা মেলার বাইরে। মেলায় এলে বাংলাদেশ এক মত ও এক পথের দেশে পরিণত হয়ে যায়। এখানে একটা স্বেচ্ছায় শৃঙ্খলার একটি ব্যাপার গড়ে উঠেছে। এখানে এলে দেশের সৃষ্টিশীল মানুষের ভেতর একটি গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা সৃষ্টি হয়। মনে হয় বাংলাদেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হয়েছে, হচ্ছে। এখানে কোনো ধ্বংসের বিষয় নেই। সব সৃষ্টিশীল কাজ।
আপনি তো দেশের বাইরেও অনেক বইমেলায় গেছেন। সেই মেলাগুলোর সাথে আমাদের বইমেলার মৌলিক পার্থক্য কী?
- দেশের বাইরের বইমেলাগুলো শুধু বইমেলা। বই কী? এটি একটি সৃষ্টিশীল পণ্য, জ্ঞানের পণ্য এবং একটি বাণিজ্যিক পণ্য। দেশের বাইরে যেসব মেলা হয়, সেগুলোতে যেসব বই প্রকাশকেরা প্রকাশ করেন, যেগুলোর জ্ঞানমূল্য ও প্রকাশমূল্য আছে, সেগুলো প্রদর্শিত হয়, বিক্রি হয়। তবে আমাদের দেশের চেয়ে বড় সময়ের বইমেলা আমি বিশ্বের কোথাও দেখিনি বা থাকলেও আমার জানা নেই। আমাদের বইমেলা শুধু বইয়ের মেলা নয়। বই এখানে রয়েছে, কিন্তু আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ, ভাষার চর্চা একটি বিশাল কাজ এখানে হয়ে থাকে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে যে মেলা শুরু, সেই মৌলিক কাজটি এখানে হয়ে থাকে। সে কারণে এ মেলা অন্য সব মেলা থেকে আলাদা। বলা যায়, অন্য সব মেলাকে ছাড়িয়ে যায়।
আপনি জাতিসত্তার বিকাশের কথা বললেন। আপনাকেও আমরা জাতিসত্তার কবি হিসেবে চিনি। তো জাতিসত্তা বিকাশের মৌলিক কাজ কী হচ্ছে?
বিশ্বে সব সময় দু’টি পক্ষ থাকে। আদালতে দাঁড়ালেও দু’টি পক্ষ থাকে। এখানেও যে দু’টি পক্ষ নেই তা আমি বলছি না। জাতিসত্তা বলতে আমরা বাঙালি জাতিসত্তার কথা বলছি তো? যে জাতিসত্তার মধ্যে সব ধর্ম-বর্ণ-মত ও পথের একটা বিধান আছে। এখানেও কিন্তু তাই। আবার বাংলা ভাষার ভেতরেও আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শব্দাবলি রয়েছে। ফলে বাঙালি জাতিসত্তা হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জাতিসত্তায়। আমাদের এখানে পৃথিবীর সব ভাষা বিকশিত হোক সে কথা বলা আছে। আমরা বিদেশী প্রচুর শব্দ বাংলা ভাষায় গ্রহণ করেছি, যা আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে।
আমাদের সাহিত্য অনুবাদ কম হচ্ছে- এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
- অনুবাদ বাংলা একাডেমির সৃষ্টির পর থেকে হয়ে আসছে। পৃথিবীর অন্য ভাষার জ্ঞান আহরণ না করলে নিজের ভাষার জ্ঞান ছড়াতে পারব না। সে জন্য আমরা পাকিস্তান আমল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় লেখকদের সেরা গ্রন্থগুলো অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের ভাষার মানোত্তীর্ণ সাহিত্যগুলো অনুবাদ হয় সাধারণত ইংরেজিতে। কিন্তু মানসম্পন্ন অনুবাদ খুব একটা হয়নি। এ জন্য যে উদ্যোগের প্রয়োজন, প্রশিক্ষণের প্রয়োজন সেটা হয়নি। সে কথা এবার আমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেছি।
পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন-
বাংলা পড়ুন, বাংলা শিখুন। বছরব্যাপী বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা করুন। মাতৃভাষার সঠিক চর্চার মাধ্যমে একজন পরিপূর্ণ নান্দনিক মানুষ হয়ে উঠুন...।

 

সবাই ভলো বই পড়ুন : মুস্তাফা জামান আব্বাসী

বইমেলা প্রায় শেষ প্রায়। বইমেলা কিভাবে দেখেন?
- বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। হৃদয়ের মেলা। সারা বছর অপেক্ষায় থাকি মেলায় গিয়ে বই কিনব। কিন্তু মেলায় গিয়ে দেখি হাজার হাজার মানুষ। তাদের সাথে ধাক্কাধাক্কিও খেতে হয়! অনেক সময় মোবাইল ও অর্থ চুরি হয়! কেউ চিনে ফেলে। অনেকেই দাড়িওয়ালা লোকটিকে চিনে ফেলে। আরে এ তো অনেক বছর গান গায়, ৫০ বছর ধরে ভরা নদীর বাঁকে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনা করতেন, এই তো সে লোক! তখন তারা আমার সাথে ছবি ও সেলফি তুলতে চায়। আমি প্রায় দুই-তিন শ’ ছেলে ও মেয়ের সাথে সেলফি তুলি।
কিন্তু একটু পর ক্লান্ত হয়ে একটু কফি খেতে চাই। কিন্তু কেউ আমাকে কফি খেতে দেয় না! আমি সেখান থেকে বেরিয়ে একটি কফির দোকানে ঢুুকে পড়ি। কিন্তু হায়, সেখানে চাইলেও আমি চিনি ছাড়া চা পাই না!
আমি জিজ্ঞেস করি- ভাই, আপনারা কি মুস্তাফা জামান আব্বাসীর নাম শুনেছেন? কেউ বলে শুনেছি, আবার কেউ বলে শুনিনি! কারণ আমি যে ৫৪টি বই লিখেছি সে খবর তাদের কাছে পৌঁছায়নি! যে পত্রিকাগুলোর সংবাদ পৌঁছানোর কথা, সেগুলো বিশেষ লোকদের হাতে জিম্মি! তবু যারা আমার ফেসবুক বন্ধু তারা খোঁজ রাখেন। আমার স্টলের ঠিকানা নিয়ে সেখান থেকে বই কিনে নিয়ে যায়।
আপনি তো অনেক বই লিখেছেন। বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা বলবেন?
হ্যাঁ, প্রকাশক আমার কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি নিয়ে বই করেন। আমাকে কোনো টাকাপয়সা দেয় না। কেউ কেউ বলে, আপনার বই খুব বেশি বিক্রি হয় না। তবু আমরা আপনার বই করব। তবে আপনাকে কিছু বই কিনে নিতে হবে! আবার কোনো স্টলে আমার সব বই পাঠকেরা কিনে শেষ করে দেন। তবু আমি টাকা পাই না!
আপনি তো অনেক দিন গান করছেন? কিন্তু আপনাকে ইদানীং বইমেলায় কিংবা গানের কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায় না?
- আমি ৬৭ বছর ধরে গান গেয়ে যাচ্ছি। বাংলা একাডেমিতে কত শিল্পী ও বিদেশী শিল্পী এসে গান গেয়ে পয়সা নিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাংলা একাডেমি তাদের কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইতে বলে না। আমন্ত্রণও জানায় না!
এবারের বইমেলায় আপনার কী বই এসেছে? কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
- আমার বইয়ের খুব বেশি প্রচার নেই। তবু এবারে মেলায় আসা আমার বই সুরের কুমার শচীন দেববর্মণ-এর সব কপি বিক্রি হয়ে গেছে। আলহামদু লিল্লাহ। আরেকটি বই এসেছে বাকী জীবনের কথা নওরোজ সাহিত্যসম্ভার থেকে। প্রচারের মুখে ছাই দিয়ে এ বইয়েরও সব কপি বিক্রি হয়ে গেছে।
একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পাওয়া তো পাঠকের ভালোবাসা?
- হ্যাঁ,আপনি ঠিকই বলেছেন। পাঠকের ভালোবাসা পাই বলেই আমি লিখে যাচ্ছি। শ্রোতারা যত দিন শুনবে আমি গান গেয়ে যাবো। আমি সকালে নামাজ পড়েছি। পাঁচ ওয়াক্ত পড়ি।আমি নজরুলের সেই কবিতাটি প্রতিদিন পড়ি- ‘চির উন্নত মম শির’... হ্যাঁ, পাঠকেরা আমায় সত্যি হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। সে জন্য প্রকাশক আমাকে কোনো টাকা না দিলেও আমি পাঠকদের জন্য লিখে যাবো।
বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে কথা অভিযোগ আছে। বিষয়টির দায় কার?
- আসলে মেলাটি যেভাবে পরিকল্পনার আলোকে হওয়া উচিত, সেভাবে তো হচ্ছে না। এখানে যারা একবার চেয়ারে বসে তারা আর উঠতে চায় না। সব পদক নিজের করে নিতে চায় অথচ সেটি পাওয়ার যোগ্য কি না সেটা ভাবে না। আমি কলকাতা মেলায় গেছি, সেখানে মানুষ শুধু বই নিতে আসে। যারা প্রকৃত বইপ্রেমী তাদের ভিড় থাকে। যেখানে এখানকার মতো ফুচকা থাকে না...
নতুন বই বাজারে এলে মোড়ক উন্মোচন হয়। বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
- নজরুলের, রবীন্দ্রনাথের, শরৎচন্দ্রের কোনো বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে? হয়নি। আমি মনে করি এটা নিছক আত্মপ্রচারণা।
পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন?
পাঠকদের জন্য অনেক ভালোবাসা। পাঠকদের ধন্যবাদ আমার লেখা পাঠের জন্য। নয়া দিগন্তকে ধন্যবাদ, তারা আমার লেখা প্রকাশ করে। বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা করুন, সবাই ভালো বই পড়ুন...

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫