ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

বিবিধ

হারিয়ে যাওয়া ভাষা

খন্দকার মাহমুদুল হাসান

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩৩


প্রিন্ট

জীবজগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রধানতম কারণ তার বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ। প্রাগৈতিহাসিক মানুষ তার দন্তনখরের ক্ষিপ্রতার জোরে নয়, বরং বুদ্ধির জোরেই টিকে গেছে। প্রকৃতির পরাক্রম এবং জীবকুলের হিংস্রতাজনিত বিক্রম তার অস্তিত্ব সঙ্কটকে প্রবল করে তুললেও শুধু বুদ্ধিকে সম্বল করে প্রতœ-প্রস্তর যুগের দীর্ঘযাত্রাপথে সে কোনো রকমে রক্ষা করেছে নিজেকে হারিয়ে যাওয়া থেকে। সেই দুর্বল অথচ বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের অন্যতম প্রধান স্মারক হলো তার মুখের ভাষা। প্রাগৈতিহাসিক মানুষ প্রতœ-প্রস্তর যুগে নিজ দরকারে যে আদিতম অর্থজ্ঞাপক ধ্বনিসমষ্টির সৃষ্টি করেছিল নিঃসন্দেহে তা ছিল জটিলতাবর্জিত এবং নিতান্তই সামান্য কয়েকটি। তবে সেই প্রাথমিক ভাষা নিদর্শন বহু সহস্র বছরের কালপরিক্রমায় আজ বিলুপ্ত। তবে সামগ্রিকভাবে ভাষা বিলুপ্ত হয়নি, বরং তাতে উৎকর্ষ এসেছে। জটিলতা-প্রাঞ্জলতা-বহমানতা এসব আছে বলে ভাষায়ও বিবর্তন এসেছে। এ কথা ঠিক, পৃথিবীর আদিতম ভাষার ক্রমবিবর্তিত রূপ হিসেবেই পরবর্তীকালের অজস্র ভাষা ও ভাষাপরিবারগুলোকে আমরা পেয়েছি। তবে যেহেতু ভাষা হলো বহতা নদীর মতো, তাই তা থেমে থাকেনি। নিত্যপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে সে আজো।
এই কালপরিক্রমায় বহু ভাষার মৃত্যু ঘটেছে। সেসব ভাষা মানুষের মুখে আর ফেরে না। সম্ভবত ভাষা-মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রস্তুর যুগেই ঘটেছিল। সভ্যতাপূর্ব মানুষের আন্তঃমহাদেশীয় মহাপরিব্রাজন জনিত পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাহেতু এবং নবতর জীবন-জটিলতা জনিত প্রয়োজনে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল নবতর শব্দগুচ্ছের সৃষ্টি। বাক্য গঠনে কৌশলের ভিন্নতাও ছিল সময়ের দাবি। এভাবেই নিত্যনতুন ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভাষা-মৃত্যুর একমাত্র কারণ এই বিচ্ছিন্নতা বা জীবন-জটিলতা নয়, বরং আরো কিছু অনিবার্য কারণ এর পেছনে ছিল। এই কারণগুলো ঐতিহাসিক পর্যায়ে এসে ভিন্নমাত্রায় স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক-সামাজিক কারণেও ভাষামৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রবল প্রতাপে রাজভাষার বাধ্যতামূলক ব্যবহার দিনে দিনে পূর্বপ্রচলিত বিশেষ বিশেষ ভাষার ব্যবহারকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। রাজভাষা কিংবা বড় জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত প্রতাপান্বিত ভাষা এই প্রক্রিয়ায় প্রজার ভাষা অথবা ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর ভাষাকে বিপন্ন করে তোলে। এভাবে যে মানুষ ভাষার সৃজন করেছে, সেই হত্যা করেছে অন্য ভাষাকে। আড়াই হাজার বছরের বেশি আগে নেবুচাদনেজার প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছিল, তা কিন্তু ভাষাক্ষেত্রের পরিবর্তনেও স্থায়ী অবদান রেখেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে মেসোপটেমিয়ার পরাক্রমশালী ক্যালদীয় সম্রাট নেবুচাদনেজার হিব্রুভাষী ইসরাইলিদের দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘জুদা’ রাজ্য দখল করে জেরুসালেমে লুণ্ঠন চালিয়ে অধিবাসীদেরকে দাস বানিয়ে তার রাজধানী ব্যাবিলনে নিয়ে যান। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দের দিকে পারস্যের সম্রাট সাইরাস ক্যালদীয় সাম্রাজ্য ও ব্যাবিলন জয়ের পর হিব্রুভাষীদের নিজ এলাকায় পুনঃপ্রবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হলেও খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে আলেকজান্ডারের বিজয়ের পরবর্তীকালে এরা মাকিদোনীয়- গ্রিক অধীনতায় ন্যস্ত হয় এবং দীর্ঘকাল তাদের রাজনৈতিক ও ভাষাগত নিপীড়নের মধ্যে থাকতে হয় তাদেরকে। সিরিয়ারাজ চতুর্থ অ্যান্টিওকের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৮ অব্দের দিকে তারা বিদ্রোহ করে। আরো পরে রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ অব্দে জুদা রাজ্য দখল করে এবং ৭০ খ্রিষ্টাব্দে তাদের বিদ্রোহের শাস্তি হিসেবে রোমানরা জেরুসালেম লুট করে। হিব্রুভাষী ইহুদিরা গণ-অভিবাসনে বাধ্য হয়। নেবুচাদনেজারের আক্রমণের (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দ) পর এই ভাষাজাতি আর কখনো মূল অবস্থানস্থলে একত্রিত হতে পারেনি আগের মতো। এরপর তাদের গোষ্ঠীগুলো প্রায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পৃথিবীর নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সে অবস্থাতেই থাকে। তবে দাউদ-সলোমনের আমলের মূল ১২টি গোত্রে বিভক্ত হিব্রুভাষী ইসরাইলিরা আজ পর্যন্ত একক সঙ্ঘবদ্ধ ভাষাজাতি হিসেবে পুনরুত্থিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। এই সুদীর্ঘ কালপরিক্রমায় প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশলী ভাষা হিব্রুর মৃত্যু ঘটেছে। ভাষাটিতে আর কেউ কথা বলে না বলেই মারা গেছে ভাষাটি।
পৃথিবীর বহু ভাষারই মৃত্যু হয়েছে। এই তালিকায় খুব উল্লেখযোগ্য হলো লাতিন ও সংস্কৃত। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার এবং এই পরিবারের ভাষাগুলোর সৃষ্টি একটি মাত্র আদিভাষা অর্থাৎ মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে। এই পরিবারের খুব উল্লেখযোগ্য ভাষা হিসেবে প্রাচীনকালে দাপটের সাথে টিকে ছিল এই দুটো ভাষাও। সহিত্যকীর্তির কারণে ভাষা দু’টি স্মরণীয় অথচ আজ তারা বেঁচে আছে স্মৃতিতে।
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে উপমহাদেশ এবং নিকটবর্তী একাধিক দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপি, প্রাচীন মিসরে প্রচলিত হায়ারোগ্লিফ এবং মেসোপটেমিয়ায় প্রচলিত কিউনিফর্ম লিপি, খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের সেমেটিক লিপি, খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দের ফিনিশীয় লিপি প্রভৃতির লিখিত নিদর্শন এবং তাদের পাঠোদ্ধার সম্ভব হওয়ায় অনেকগুলো বিলুপ্ত ভাষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকি আজো বিদ্যমান। বাংলাদেশের অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাই আজ ঝুঁকির মধ্যে আছে। জনসংখ্যা হ্রাস বিশেষ ভূখণ্ডে একটি বা একাধিক ভাষার অস্তিত্বকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপন্ন দশার ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে- লুসাই, খুমি, চাক, মুণ্ডা, ওবাঁও, খোয়াং প্রভৃতি। অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে অন্তত ২৮টির বিলুপ্তি এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। যদিও বাঙালি তুলনামূলকভাবে বড় ভাষাজাতি, কিন্তু বাংলা ভাষাও পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয়। ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। বিশ্ববাসীর জন্যও এই আন্দোলনের চিরন্তন বার্তা রয়েছে। তার পরও বাঙালির ভাষার ওপরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অধিকতর পরিচিত ও প্রচলিত একাধিক ভাষার চাপ বিদ্যমান। সচেতনতার সাথে নিজ ভাষার মহিমাকে নিজেদের মধ্যে প্রোথিত করতে না পারলে অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের বিলুপ্ত ভাষার পরিণতি যে আমাদেরও হবে না, তা জোর দিয়ে বলার সাধ্য কিন্তু আমাদের নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫