ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ মার্চ ২০১৭

বিবিধ

প্রাণের মেলা বইমেলা

পঞ্চানন মল্লিক

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩১


প্রিন্ট

লেখক ও পাঠকের মনের অনুরণন মিশে থাকে যে মেলায়, তার নাম বইমেলা। স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর অন্যতম হচ্ছে এই মেলা। সেই ১৯৭২ সালের ফেব্র“য়ারির ৮ তারিখে, চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণের বটতলায় এক টুকরো চট বিছিয়ে তার ওপর ৩২টি বই সাজিয়ে গোড়াপত্তন করেছিলেন এ মেলার বলে জানা যায়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান। পরে তার দেখাদেখি অন্যরাও অনুপ্রাণিত হন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে বইমেলার সাথে প্রথম সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি মেলার সাথে যুক্ত হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলার’ আয়োজন সম্পন্ন করেন। তবে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর ক্রমেই এগিয়ে চলা। সেই ৩২টি বইয়ের প্রথম মেলা আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির ঐতিহ্যের প্রাণের মেলায়। প্রতি বছর বইমেলাকে সামনে রেখে লেখকদের প্রাণ যেন জেগে ওঠে। লেখকেরা সারা বছর লেখা সঞ্চয় করে রাখেন এ মেলায় প্রকাশের জন্য। ফেব্রুয়ারি আসার কয়েক মাস আগে থেকে সম্পাদকের দফতরে আনাগোনা ও যোগাযোগ শুরু হয়। স্ক্রিপ্ট বা পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের মনঃপূত হলে শুরু হয় বইয়ের মুদ্রণপ্রক্রিয়া। এভাবে আলোর মুখ দেখে শত শত বই। জীবনের প্রথম বইটি যেন লেখকের কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়তর। একজন কৃষক যেমন কষ্ট-ক্লেশে জমিন চাষ করে তাতে সোনার ফসল ফললে তৃপ্তিতে আত্মহারা হয়ে যান, একজন লেখকও তেমনি প্রথম বইয়ের দর্শন স্পর্শে আবেগাপ্লুত ও আনন্দে আত্মহারা হন। সে অর্থে বই লেখকের সন্তানের মতো। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশ্য এখন বই তুলতে হয় প্রাণের মেলায়। তার পরেও লেখকেরা পিছপা হন না। ছুটে যান হার্দ্যকি টানে। বইমেলা যেন তাদের সেই প্রত্যাশার দুয়ার খুলে দেয়। নানান শ্রেণীর পাঠকেরাও আসেন বইমেলায়। কেনেন সাধ্যমতো পছন্দের বই। পাঠকের সুবিধার জন্য বর্তমানে প্রকাশনী ও তাদের স্টলগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে দেয়া হয়। যেমন- প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশুকর্নার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটলম্যাগ এলাকা ইত্যাদি। বইমেলায় মেলায় বেশ জনপ্রিয়তার সাথে স্থান দখল করে নিয়েছে ভাঁজপত্র, লিটল ম্যাগাজিন, ডিজিটাল প্রকাশনা (যেমন- সিডি, ডিভিডি) ইত্যাদি। প্রতিদিন মেলায় থাকে বিভিন্ন আলোচনা সভা, স্বরোচিত কবিতা পাঠের আসর, সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এ ছাড়া মেলায় রয়েছে লেখককুঞ্জ, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থেকে পাঠক ও দর্শকদের সাথে তাদের বই ও লেখার ব্যাপারে মতবিনিময় করেন। নতুন মোড়ক উন্মোচিত বই ও তার লেখকের নাম মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে নিয়মিত ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া প্রকাশিত নতুন বইয়ের তালিকাও লিপিবদ্ধ করা হয়। লেখক-পাঠকেরা বইমেলায় ঘুরে অপার আনন্দে মেতে ওঠেন। পরিচয় ঘটে অনেক অজানা, অচেনা লেখকের সাথে। গড়ে ওঠে সেতুবন্ধ, হয় ভাব ও মতের বিনিময়। আজকাল ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলাপর্যায়েও বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় লেখক-পাঠকদের প্রাণের দাবি এখানে পূরণ হয়। আধুনিক নেট কেবলের যুগে যদিও হারিয়ে যাচ্ছে সৃজনশীল বইয়ের আবেদন ও পাঠাভ্যাস। তবুও বইমেলা যেন এখনো জাগিয়ে রেখেছে সৃজনশীল সাহিত্য আর লেখকের প্রাণকে।
যদিও ১৯৫২ সালের ফেব্র“য়ারির ২১ তারিখে বাংলা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী মহান শহীদদের স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই আয়োজন করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলার’; তবুও তার পাশাপাশি বাংলার হাজারো লেখক-পাঠকদের মনের সৃজনশীল সজীবতাকে টিকিয়ে রাখবে এ মেলা- এমনটাই প্রত্যাশা। দেখতে দেখতে শেষ প্রান্তে চলে এলো মেলা। শেষ হয়েও যাবে সহসা। শেষ হলে ফের আগামী মেলার আশায় দিন গোণা সেও আনন্দের।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫