ঢাকা, বুধবার,২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বিবিধ

একুশে ফেব্রুয়ারি ও বিশ্ব ভাষা

মো. জোবায়ের আলী

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১৬


প্রিন্ট

ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির প্রধান বাহন। মানুষের মনে স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশচেতনা উৎসারণে ভাষা এক উল্লেখযোগ্য শক্তি। যুগে যুগে প্রবল প্রতাপশালী আগ্রাসী শক্তির সামনে অসহায় দুর্বল জাতিগুলো কেবল তাদের স্বাধীনতাই হারায়নি, সেসব বৈদেশিক শক্তির ভাষার আক্রমণে তাদের মাতৃভাষাও হারিয়েছে। বিজয়ী প্রতাপশালীরা সবসময়ই তাদের ভাষা বিজিত জাতিগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এভাবে পৃথিবী থেকে অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে। একটি ভাষার বিলুপ্তি মানে সভ্যতার একটি অমূল্য অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
পৃথিবীতে এখনো কম-বেশি ২৫ হাজার ভাষা আছে ভাবা যায়? ভাষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এথনোলগ; ল্যাগুয়েজ অব দ্যা ওয়ার্ল্ডের ২০০৯ সালে প্রকাশিত হিসাব মতে, সারা বিশ্বে প্রায় সাত হাজার ৩৫৮টি ভাষা এবং প্রায় ৩৯ হাজার ৪০০টি উপভাষা রয়েছে। এর মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা আছে প্রায় পাঁচ হাজার। পৃথিবীর কিছু ভাষা আছে যে ভাষায় মাত্র কয়েক হাজার মানুষ কথা বলে। বিভিন্ন ভাষাভাষী জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সারা বিশ্বের ভাষাগুলোকে বেশ ক’টি ভাষা পরিবারে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪৬ শতাংশ লোক ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা নানাবিধ মজার তথ্য দিয়েছে ভাষা সম্পর্কে। ইউনোস্কো বলছে, প্রচলিত হাজার ছয়েক ভাষার মধ্যে কোনো কোনো দেশে প্রচলিত আছে একাদিক ভাষা। আবার এমন অনেক দেশও আছে বৈকি, যাদের কোনো মাতৃভাষা নেই। প্রতিনিয়ত অযতœ অবহেলা ও সংগ্রহের অভাবে এমনকি ভাষার মৃত্যু ঘটছে। আবার আগ্রাসী ভাষার হুমকির মুখে পড়ে, যাকে বলে আগ্রাসন, কোনো কোনো ভাষার চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে, রূপ বদল হচ্ছে। ছয় হাজার ভাষার মধ্যে ৯৬ শতাংশ ভাষা ব্যবহার করে মাত্র চার শতাংশ লোক। ইন্টারনেট সার্চ করলে ৯০ শতাংশ ভাষার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। আফ্রিকার ৮০ শতাংশ ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা ও বানান রীতি নেই। প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপ পাপুয়া নিউগিনির ৫০ লাখ মানুষ কথা বলে ৮২০ রকম ভাষায়। ইন্দোনেশিয়ার মানুষ কথা বলে ৭৪২টি ভাষায়। নাইজেরিয়ার মানুষ ৫১৬টি ভাষায় এবং ভারতে ব্যবহৃত হয় ৪২৭টি ভাষা। ১৫৩০ সালে পর্তুগিজরা ব্রাজিলে উপনিবেশ স্থাপনের পর এখন পর্যন্ত দেশটির ৫৪০টি বা ৭৫ শতাংশ ভাষার অপমৃত্যু ঘটেছে। অষ্টাদশ শতকে অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর ইতোমধ্যে দেশটির ২৫০টি অর্থাৎ ৯০ শতাংশ ভাষার বিলুপ্তি ঘটেছে।
ধ্বনি ভাষার আদি প্রাণ। ভাষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পৃথিবীর ভাষা বিকাশ ও প্রসারের সূচনালগ্ন থেকে কোনো একসময় ভাষা ছিল কমপক্ষে পাঁচ লাখ। তবে এর মধ্যে মোট ভাষার ৭৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। মজার ব্যাপার, সভ্যতার এই আধুনিক যুগেও প্রতি ১৫ দিন পর একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। বিশ্বের ভাষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার শব্দ আছে ইংরেজি ভাষায়।
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলে কোন ভাষায়? এ নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান ভাষা হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোক কথা বলে মান্দারিন চীনা ভাষায়। চীনা ভাষাভাষীর সংখ্যা ১০২ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার, দ্বিতীয় স্প্যানিশ ৩৫ কোটি ২০ লাখ, তৃতীয় ইংরেজি ৩৩ কোটি ২০ লাখ, চতুর্থ বাংলা ১৯ কোটি ৯০ লাখ। অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ‘প্রতি ৩৬ জনে একজন কথা বলে বাংলায়। পঞ্চম স্থানে রয়েছে হিন্দি/উর্দুÑ১৯ কোটি ২০ লাখ, আরবি ১৮ কোটি ৪০ লাখ, পর্তুগিজ-১৮ কোটি, রুশ-১৭ কোটি, জাপানি-১০ কোটি ১০ লাখ, ফ্রেঞ্চ-৮ কোটি ৬০ লাখ।
ইংরেজি, আরবি, চীনা (ম্যান্দারিন), স্প্যানিশ, ফরাসি এবং রাশিয়ান এই ছয়টি হলো জাতিসঙ্ঘের অফিসিয়াল ভাষা। এ ছাড়া হিন্দি, বাংলা, পর্তুগিজ এবং এস্পেরান্তো ভাষাকে জাতিসঙ্ঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে ৫৮টি স্বাধীন দেশের অফিসিয়াল ভাষা ইংরেজি। এ ছাড়া আরো ২৬টি অসার্বভৌম দেশে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ ও আমেরিকান কলোনির অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ইংরেজি ব্যবহার হয়। তেমনি ২৪টি দেশে আরবি, ৩০টি দেশে ও ১৬টি ফ্রেঞ্চ কলোনিতে ফ্রেঞ্চ, ৯টি দেশে পর্তুগিজ এবং ২০টি দেশে স্পেনিশ অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় সিয়েরালিওন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম রাজ্যের কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলায়। এ ছাড়াও আন্দামান ও নিকোবর দীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা হলো বাংলা।
১৯৯৮ সালে কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের কাছে।
আমাদের মহান একুশের ভাষা আন্দোলনের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনের সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আমাদের মাতৃ ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানিয়ে চরম আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ইউনেস্কোভুক্ত ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব সমর্থন করে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ‘এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসঙ্ঘ’- সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করা হয়। বাংলাদেশের এই প্রস্তাব আইভরি কোস্ট, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ওমান, গাম্বিয়া, চিলি, ডোমিনিয়ন, বাহামাস, বেলারুশ, ভানুআতু, ভারত, সাইক্রোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, স্লোভাকিয়া ও হন্ডুরাস সমর্থন করে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে এটি একটি মহৎ অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের পরে বোধহয় এত বড় অর্জন আর আমাদের হয়নি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু বাংলাদেশের নয়, সব দেশের সব ভাষাভাষীর। তবুও দিবসটি পালনের জন্য যে ২১ ফেব্রুয়ারিকে বেছে নেয়া হলো, তার জন্য বাংলাদেশের মানুষ গর্ববোধ না করে পারে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫