ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

রকমারি

ভাষাশহীদ রফিকের গ্রাম পারিল

আব্দুর রাজ্জাক

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৮:০৪


প্রিন্ট
মনিকগঞ্জে ভাষাশহীদ রফিকের গ্রামের বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু এখানে  শহীদ রফিকের স্মৃতিবিজড়িত তেমন  কিছুই নেই

মনিকগঞ্জে ভাষাশহীদ রফিকের গ্রামের বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু এখানে শহীদ রফিকের স্মৃতিবিজড়িত তেমন কিছুই নেই

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের গর্ব। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে এসেছে স্বাধীনতা। আমরা পেয়েছি আমাদের অধিকার। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এখন প্রায় সবারই জানা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রাণ দিয়েছিলেন যারা, তাদের নাম আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি; কিন্তু ছালাম, রফিক জব্বারের নাম আমাদের অজানা না থাকলেও আমরা অনেকেই জানি না তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে কি না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাষাশহীদদের বাড়ি বা তাদের স্মৃতি দেখতে পাবেন কি না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই যারা প্রাণ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম রফিক। ভাষাশহীদ রফিকের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইর।

রফিকের বাড়ি
উত্তর-পূর্বে ধলেশ্বরী, দক্ষিণ-পশ্চিমে কালীগঙ্গা, এরই মাঝে সবুজ-শ্যামল দ্বীপের মতো জনপদ সিংগাইর। সিংগাইর উপজেলায় বলধরা ইউনিয়নের পারিল গ্রামেই জন্ম হয় ভাষাশহীদ রফিকের।
৩৭ শতাংশ জমির ওপর ভাষাশহীদ রফিকের পৈতৃকভিটা। এই জমিটি সব ভাইয়ের সন্তানদের মাঝে বণ্টন করা হয়েছে। রফিকের নামে তিন শতাংশ জমি রাখা হয়েছে। পৈতৃকভিটার তাদের বড় ভাই আব্দুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম, ভাতিজা শাহজালাল ও তার স্ত্রী বাড়িটির হাল ধরে রেখেছেন। রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম মানিকগঞ্জ সদরে সরকারি বরাদ্দকৃত বাড়িতে থাকেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা ঢাকায় থাকেন। রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে ২০০৮ সালে ৩৪ শতাংশ জমিতে জেলা পরিষদ নির্মাণ করে একটি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। শহীদ রফিকের বর্তমান বাড়িটি তৈরি করে দিয়েছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকা। রয়েছে আরেকটি মাটির জরাজীর্ণ ঘর। ২০০০ সালে রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রশিকার চেয়ারম্যান ড. কাজী ফারুক নিজস্ব অর্থায়নে একটি ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেখানেই থাকে রফিকের পরিবার। শহীদ এই পরিবারের সদস্যরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রফিকের নামে গড়া স্মৃতি জাদুঘরে তার কোনো স্মৃতিচিহ্ন রাখা হয়নি। কিছু স্মৃতিচিহ্ন রাখা আছে তাদের পরিবারের কাছে। আর ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬৪ বছর পর ২০১৬ সালে শহীদ রফিকের বাড়ির আঙিনায় বৃহৎ পরিসরে নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার।

বর্তমান অবস্থা
বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষা করতে শহীদ রফিকের ছোট ভাই মরহুম আব্দুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম (৭০) বাস করছেন এখানে। আলাপকালে তিনি বলেন, এই বাড়ির স্মৃতি রক্ষায় আমাকে এখানে থাকতে হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেসব মানুষ এসে শহীদ রফিক সম্পর্কে তথ্য চাচ্ছেন, তা দিতে দিতেই আমি ক্লান্ত। তিনি বলেন, রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম মানিকগঞ্জ সদরে সরকারি বরাদ্দ বাড়িতে থাকেন। বছরে সরকারিভাবে বরাদ্দ ৬০ হাজার টাকা ভাতা তিনিই নেন। আমি আজ অসুস্থ। সবাই আসেন সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে। কেউ আমাদের খবর রাখেন না। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের কথা মনে পড়ে। রফিকের ছোট ভাইয়ের ছেলে শাহজালাল ওরফে বাবু তার স্ত্রী ও গোলেনূর বেগম আছেন এই বাড়িতে।
একমাত্র জীবিত আছেন রফিকের ছোট ভাই খোরশেদ আলম। ভাই হারানোর কষ্ট আর বেদনায় আজো কেঁদে ওঠেন তিনি। ছোট ভাই খোরশেদ আলমের বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর। বড় ভাই রফিকের কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই। তবে মায়ের মুখে রফিকের অনেক গল্পই তিনি শুনেছেন। শহীদ রফিকের ভাতিজা আব্দুর রউফ জানান, শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতেই আমাদের খোঁজ পড়ে। সাংবাদিক ও বিভিন্ন মিডিয়ার ভিড় জমে যায় বাড়িতে। তা ছাড়া বড় বড় অনেক অনুষ্ঠানে আমাদের কোনো ডাক পড়ে না।

ভাষাশহীদ রফিক স্মৃতিগ্রন্থাগারে নেই ভাষা আন্দোলনের পর্যাপ্ত বই

এই ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এলাকাবাসী তার সম্মানে পারিল গ্রামের নামকরণ করেন রফিকনগর। আর সেখানেই নির্মাণ করা হয় ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘর। শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ স্মৃতি জাদুঘরে রফিকের তেমন কোনো নিদর্শন নেই, নেই রফিকসহ ভাষাশহীদদের জীবনাদর্শ সম্পর্কিত বইও। ফেব্রুয়ারি মাস এলে পাঠাগারটি ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়। ২০০৮ সালে সেখানে গড়ে তোলা হয় তার স্মৃতির জাদুঘর। কিন্তু সেখানে রফিকের স্মৃতিবিজড়িত তেমন কিছু না থাকায় কাছে টানতে পারেনি নতুন প্রজন্মকে।
সিংগাইরের চারিগ্রাম এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র উজ্জল হোসাইন জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষ আসে এই জাদুঘর দেখতে। তবে এ জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসসমৃদ্ধ বইয়ের সংখ্যা খুবই কম যা সত্যিই দুঃখজনক।

পারিল গ্রামের মো: ফিরোজ, বায়রা এলাকার দেওয়ান সাদ্দাম হোসেনসহ আরো অনেকেই বললেন, ‘ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিক দেশের গর্ব-সম্মানের বীর। এ সময় তারা দাবি করে জানান, রফিক উদ্দিন স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারে শহীদ রফিকের ব্যবহৃত সামগ্রী রাখা হোক। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনে এই অগ্রনায়ক সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে পারবে।’
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকার শহীদ রফিকের নামে তার নিজ গ্রামে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তার বসতবাড়িতে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরো বই যেন পর্যাপ্ত থাকে, সে বিষয়ে অবশ্যই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

ফিরে দেখা একুশে ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি রফিক মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেনের সাথে লক্ষ্মীবাজারের দিকে যাওয়ার পথে মেডিক্যাল কলেজের গেটের কাছে এলে পুলিশ তাদের উত্তর দিকে যেতে বাধা দেয়। তখন তারা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মীবাজারের দিকে রওনা দেন এবং মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের উত্তর-পশ্চিম দিকের গেটের কাছে পৌঁছেন। সেখানেও একদল বন্দুকধারী পুলিশকে দেখতে পান তারা। তখন মোশাররফ হোসেন হোস্টেলের ১৩ ও ১৯ নম্বর শেডের পেছনে দাঁড়িয়ে একজনের সাথে কথা বলতে থাকেন। রফিক তখন দাঁড়িয়েছিলেন ২২ নম্বর শেডের কাছে। কিছুক্ষণ পরই একদল পুলিশ হোস্টেলে ঢুকেই গুলি শুরু করে। এদের গুলিতে হোস্টেলের বারান্দাতেই নিহত হন রফিক। তথ্যগুলো গবেষক বশীর আল্ হেলাল তার ভাষা আন্দেলনের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছে­ যা শহীদ রফিক হত্যা মামলা থেকে নেয়া। শতভাগ না হলেও এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, রফিকই ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, যিনি ভাষা আন্দোলনে প্রথম শহীদ হন পুলিশের গুলিতে, তার মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। ১৯৫২-এর ২২ ফেব্রুয়ারি সংখ্যার দৈনিক আজাদ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘গতকল্য (বৃহস্পতিবার) বিকেল প্রায় ৪টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি চালনার ফলে বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিকুদ্দিন আহমদের মৃত্যু হয়।’ সাপ্তাহিক নতুন দিন পত্রিকা তাদের দ্বিতীয় বর্ষ ১৬-১৭ শ’ সংখ্যায় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সৌজন্যে শহীদ রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া ছবি ছাপে। বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্যিক বশীর আল্ হেলাল তার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন, ‘হয়তো আসলে রফিক উদ্দিন আহমদ প্রথম শহীদ হন।’ এ গ্রন্থে তিনি তথ্য-উপাত্ত-যুক্তি দিয়ে রফিককেই প্রথম ভাষাশহীদ হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। ‘ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার’ গ্রন্থে ড. রফিকুল ইসলাম ভাষা আন্দোলনকালে ঢাকায় অবস্থানরত শহীদ রফিকের ভগ্নিপতি মোবারক আলী খানের যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, তাতেও প্রমাণিত হয় রফিকের মাথার খুলিই উড়ে গিয়েছিল এবং তিনিই ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫