ঢাকা, সোমবার,২৪ এপ্রিল ২০১৭

শেষের পাতা

মালয়েশিয়া হাইকমিশনের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অভিযোগের পাহাড়

৬ মাস পর কোনো দালাল থাকবে না : হাইকমিশনার

মনির হোসেন

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০৬:৩৩


প্রিন্ট
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম অপেক্ষমাণ শ্রমিকদের সাথে করমর্দন করছেন

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম অপেক্ষমাণ শ্রমিকদের সাথে করমর্দন করছেন

মালয়েশিয়া হাইকমিশন বাংলাদেশী শ্রমিকদের কোনো উপকারেই আসছে না। এমন শত শত অভিযোগের পাহাড় বৈধ ও অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিকদের। তবে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেছেন, এসব অভিযোগ আগের হতে পারে। বর্তমানে হাইকমিশনের কাজকর্মে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কোনোভাবেই দালালদের আর হাইকমিশনের আশপাশে ঘেঁষতে দেয়া হচ্ছে না। যার কারণে কর্মীরা এখন সিরিয়াল অনুযায়ী তাদের ডিজিটাল পাসপোর্ট তৈরি, পাসপোর্ট নবায়ন থেকে শুরু করে সবই হচ্ছে নিয়ম মোতাবেক। মোট কথা হাইকমিশনের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী শ্রমিকবান্ধব হওয়ার চেষ্টা করছে।
কুয়ালালামপুরের ফ্যাক্টরি এলাকা হিসেবে পরিচিত শাহ আলম সম্প্রতি সরেজমিন খোঁজ নিতে গেলে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশী বৈধ ও অবৈধ শ্রমিকেরা বলেন, আমরা কেউ ১০ বছর ধরে আবার কেউ বলেন, আমরা এক বছর ধরে বসবাস করছি। তাদের একজন মাগুরার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন। তিনি বলেন, আমি কলিং ভিসায় এ দেশে এসেছিলাম ২০০৭ সালে। কিন্তু এখানে আসার পর দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ হয়ে পড়ি। এরপর আবার বৈধ হওয়ার জন্য এ দেশের সরকার সুযোগ দেয়। আমি সেই সুযোগ নেয়ার জন্য এজেন্টকে রিংগিট দিই। কিন্তু ওই এজেন্ট আমার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। শুধু আমার টাকা নয়, এমন হাজার হাজার শ্রমিকের টাকা নিয়ে পালিয়েছে স্থানীয় ও আমাদের দেশীয় দালালরা। এসব বিষয়ে হাইকমিশনে অভিযোগ করেও আমরা কোনো লাভ পাইনি। বরং আরো হয়রানি বেড়েছে। তার দাবি, আমাদের হাইকমিশন থেকে শ্রমিকেরা সহযোগিতা পায় এটা আমি অন্তত বিশ্বাস করি না।
শুধু জয়নাল হোসেন নন, হাইকমিশনের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের এমন অভিযোগ শত শত প্রবাসী শ্রমিকের। ভিস্তানা হোটেলের পাশের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন বাংলাদেশী শ্রমিক শৈশব (ছদ্ম)। তিনি বলেন, আমি এ দেশে এসেছিলাম বৈধভাবেই। কিন্তু এখনো আমি অবৈধই আছি। কাজ করছি ঠিকই কিন্তু যখন তখন পুলিশের হাতে ধরা পড়তে পারি। তাই পকেটে সবসময় ইমিগ্রেশন থেকে একটি কাগজ ও নগদ ২০০-৩০০ রিংগিট রাখি। তিনি বলেন, ডিজিটাল পাসপোর্ট বানাতে হাইকমিশনে গিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারি খরচের বাইরে আরো অনেক টাকা খরচ করার পর পাসপোর্ট হাতে পেয়েছি। তার মতে হাইকমিশনে দালালদের উৎপাত। এমন কোনো কাজ নেই যে কাজ করতে দালাল ধরতে হয় না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দালালদের সাথে হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ থাকায় কেউ দালাল ছাড়া কাজই করতে পারে না। তাই এখন কেউ বিপদে পড়লে হাইকমিশনে সহযোগিতার জন্য আর যেতে চায় না। বর্তমান হাইকমিশনার যোগ দেয়ার পরও কি একই অবস্থা- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগে আর পরের বিষয় আমরা বুঝি না। আমরা বুঝি হাইকমিশন আমাদের দেশের গার্ডিয়ান। এখন তার কর্মকর্তা আর কর্মচারীরা কী করছে তা তো তাকে অবশ্যই খোঁজ রাখতে হবে। যে শ্রমিকের সাথে দেখা করি সেই শ্রমিকই হাইকমিশনের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভের কথা অকপটে বলেছেন। তবে বর্তমান হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম তার নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়া হাইকমিশনের সার্বিক কার্যক্রম সরেজমিন দেখিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, মূলত মালয়েশিয়াতে যারা বাংলাদেশী হিসেবে ফাস্ট জেনারেশন, তারা খুবই ডেঞ্জারাস প্রকৃতির। তাদের কারণেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীদের এত বদনাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বদনাম হচ্ছে এরা জড়িয়ে পড়েছে কিডন্যাপের মতো জঘন্য কাজে। আমি এসে এসব জানার পর এদের সরকারের সাথে বৈঠক করে কিভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা যায় এবং হাইকমিশনে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শ্রমিকেরা কোনো ধরনের দালাল ছাড়াই তাদের কাজ অল্প সময়ে শেষ করে চলে যেতে পারেন ইতোমধ্যে সেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রমিক-বান্ধব হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগে হাইকমিশনে আসা শ্রমিকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন নতুন এ ভবনে শ্রমিকদের বসার জন্য জায়গা ভাড়া নিয়েছি। ক্যান্টিন করে দিয়েছি। ক্যান্টিন মালিককে বলেছি, আমার গরিব শ্রমিকদের জন্য ৩-৪ টাকার মধ্যে খাবারের কমন মেনু রাখতে হবে। দালালদের উৎপাত প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, ১৫-২০ বছর ধরে যেসব শ্রমিক হাইকমিশন ঘিরে দালালি করত তারা এখন বলে বেড়াচ্ছে এ হাইকমিশনার আমাদের সর্বনাশ করে ফেলেছে। তিনি দাবি করে বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে হাইকশিনের আশপাশে নয় পুরো দালাল চক্রকেই আমরা নির্মূল করতে পারব। হয়রানি বন্ধ হোক এটা এ দেশের সরকারও চায়। তার মতে, হাইকমিশনের দরজা জানালা সবকিছুই এখন ভিজ্যুয়াল। একজন আরেকজনকে সহজেই দেখতে পাবে। লুকোচুরির কিছুই নেই।
হাইকমিশনের সাথে ছিলেন লেবার কাউন্সিলর সায়েদুল ইসলাম। তিনি শ্রমিক হয়রানি প্রসঙ্গে বলেন, অবৈধ শ্রমিক যারা পুলিশের হাতে আটক হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে রয়েছে এমন ১৩টি ডিটেনশন ক্যাম্প আছে এ দেশে। আর রয়েছে ৪৯টি জেলখানা। আমিসহ তিনজন কর্মকর্তা রুটিন মতো প্রতি সপ্তাহে ক্যাম্পগুলো ভিজিট করে শ্রমিকদের সমস্যা জানার চেষ্টা করছি।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫