ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

এশিয়া

নারী গুপ্তচর ব্যবহার নতুন নয় উত্তর কোরিয়ার

আহমেদ বায়েজীদ

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ২২:০৩


প্রিন্ট
কিম হিয়ন-হুই ও ওন জিয়ং-হোয়া

কিম হিয়ন-হুই ও ওন জিয়ং-হোয়া

মালয়েশিয়ায় নিহত হয়েছেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের সৎ ভাই কিম জং ন্যাম। ক্ষমতা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন ন্যাম। ধারণা করা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার দুই নারী গুপ্তচর ন্যামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। তাদের একজনকে আটকও করেছে মালয়েশিয়ার পুলিশ। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে উত্তর কোরিয়ার শাসকদের নারী গুপ্তচর ব্যবহারের নজির অতীতেও ছিল। এ রকম কয়েকজন নারী গুপ্তচরের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হলো :


কিম হিয়ন-হুই : ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিমানে বোমা রাখার কাজে কিম হিয়ন-হুইকে ব্যবহার করে উত্তর কোরীয় গোয়েন্দা সংস্থা। আন্দামান সাগরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয় ১১৫ আরোহীর সবাই।

বাগদাদ থেকে সিউলগামী কোরিয়ান এয়ার ফাইট ৮৫৮-এর যাত্রী হিসেবে বিমানে ওঠেন ২২ বছর বয়সী কিম হিয়ন-হুই। তার সাথে ছিল ৭২ বছর বয়সী আরেক গুপ্তচর কিম সিউং। ভুয়া জাপানি পাসপোর্টে বাবা-মেয়ের পরিচয়ে দুজনে বিমানে ওঠেন। বিমানটি আবুধাবিতে যাত্রাবিরতি করলে নেমে যায় এ দুই গুপ্তচর। কিন্তু একটি লাগেজে করে বিমানে রেখে যায় শক্তিশালী বোমা।

 

কয়েক ঘণ্টা পর মিয়ানমার উপকূল অতিক্রমকালে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। এর কয়েক ঘণ্টা পর বাহরাইন এয়াপোর্টে সন্দেহভাজন হিসেবে তাদের আটক করে গোয়েন্দারা। গ্রেফতার নিশ্চিত বুঝতে পেরে সায়ানাইড যুক্ত সিগারেট মুখে পুরে আত্মহত্যা করে কিমের বাবা রূপি সিউং। কিমও একই কাজ করতে গেলে দ্রুত তার হাত থেকে সিগারেট ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও পরে ‘সরকারের চাপে পড়ে অন্যায় করেছে’ মর্মে তাকে মাফ করে দেয় দক্ষিণ কোরীয় সরকার। বর্তমানে সেখানেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন কিম হিয়ন-হুই।


কিম হিয়নকে অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানোর আগে দেশে ও দেশের বাইরে সাত বছর প্রশিক্ষণ দিয়েছে উত্তর কোরীয় গোয়েন্দা সংস্থা। প্রশিক্ষণের পর কিম সিউংয়ের সাথে মস্কো হয়ে বুদাপেস্ট পাঠানো হয় তাকে। বুদাপেস্টে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় বোমা ও ভুয়া জাপানি পাসপোর্ট। সেখান থেকে বাগদাদ এসে কাজ শুরু করে এ নারী গুপ্তচর। ওই বছর অনুষ্ঠিত সিউল অলিম্পিক আয়োজন বন্ধ করতে এ ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।


ওন জিয়ং-হোয়া : ২০০১ সালের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করে এ উত্তর কোরীয় নারী গুপ্তচর। দেশটির শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় তার ওপর নির্যাতন হতে পারে এ ভয়ে পালিয়ে এসেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে। তার বিরদ্ধে অভিযোগ ছিল, সেনা কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করে গোপন তথ্য সংগ্রহ করে উত্তর কোরিয়ার পাচার ও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার পরিকল্পনার।

দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর এক তরুণ ক্যাপ্টেনের সাথে দীর্ঘ দিন প্রেমের অভিনয় করেন এ সুন্দরী গুপ্তচর। গুপ্তচরবৃত্তিতে ওন এত ধূর্ত ও কৌশলী ছিলেন যে, দক্ষিণ কোরিয়ার মিডিয়া তাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিখ্যাত নারী গুপ্তচর মাতা হ্যারির নামে ডাকতে শুরু করে। ওন দাবি করেছেন, দক্ষিণ কোরীয় সরকার তাকে দুই সেনাকর্মকর্তাকে হত্যার দায়িত্ব দিলেও তিনি তা পালন করেননি। আর যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তথ্য সংগ্রহের কথাও আশিংক সত্য বলে দাবি করেন। উত্তর কোরিয়া তাকেও দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় তার। জেল থেকে বেরিয়ে সিউলে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন তিনি।


লি সান-সিল : ১৯৯২ সালে সিউলের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানায়, তাদের দেশে সক্রিয় উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির ৬২ জনের একটি গোপন দলকে আটক করেছে তারা। লি সান-সিল নামে ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর নেতৃত্বে গোপনে সংগঠিত হয়েছিল দলটি। লি সান ১০ বছর ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করছিলেন।

তবে গ্রেফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে একটি ছোট সাবমেরিনে চড়ে সে উত্তর কোরিয়ায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির একজন শীর্ষ নেতা ছিলেন লি। গোপন সংগঠন কায়েম করার মিশন নিয়ে তাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠায় দেশটির গোয়েন্দ সংস্থা। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গোপনে উত্তর কোরিয়ার প্রতি অনুগত লোকদের নিয়ে গোপন কর্মকাণ্ড শুরু করেন লি। যদিও এক সময় তা ধরা পড়ে যায় দক্ষিণের গোয়েন্দাদের কাছে।


পরে গ্রেফতারকৃত আরেক উত্তর কোরীয় গুপ্তচরের কাছ থেকে জানা যায়, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান প্রসিডেন্ট কিম জং উনের দাদা কিম ইল সাং অন্তত দুই বার লি সানের বাড়িতে গিয়ে তার সাথে দেখা করেছেন (দেশে থাকাকালীন)। পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে সম্মানসূচক খেতাব ও নামাঙ্কিত ঘড়িও উপহার দিয়েছেন তিনি। আরো বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে লি সান উত্তর কোরিয়ার পার্লামেন্ট সদস্যও ছিলেন। ২০০০ সালে মারা যাওয়া এ নারী গুপ্তচরকে পিয়ং ইয়ংয়ের ‘দেশপ্রেমিকদের সমাধিক্ষেত্রে’ সমাধিস্থ করা হয়।

ডন ও উইকিপিডিয়া অবলম্বনে

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫