ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

প্রেম ও প্রতারণা

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ১৮:৫১ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:১৮


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

একদিন ক্লাসের মাঝখানে একটি মেয়ে ফেইন্ট হয়ে পড়ে। আমি সযত্নে তাকে মেডিক্যালে নিয়ে যাই। ডাক্তার সাহেব পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে কানে কানে আমাকে বললেন, ‘অসুখটি শারীরিক নয় মানসিক’। আমি মেয়েটিকে বিভাগে ফিরিয়ে এনে আমার কক্ষে বসাই। তাকে পিতৃসুলভ মমত্ব দিয়ে তার মনের উপসমের চেষ্টা করি। মেয়েটি আমার সামনে অঘোরে কাঁদলো। অবশেষে বলল, ‘সে তাকে প্রতারণা করেছে’। মেয়েটি দেখতে ভালো না হলেও লেখা পড়ায় ভালো ছিল। তাই ছেলেটি নোটফোট নিয়ে কেটে পড়েছে। মেয়েটির মানসিক কষ্ট আমি অনেকটা ঘোচাতে পেরেছিলাম। সে আমাকে বাবার আসনে বসিয়েছিল। সে এখন মর্যদাপূর্ণ চাকরি করে। আরেক দিন ওভার স্মার্ট মেয়ে আমার ভাইয়ের সুবাদে বাসায় আসে। তার অভিযোগ আমেরিকা প্রবাসী একজন তার সর্বনাশ করেছে। সে একটি দামি গাড়ি চড়ে ক্যাম্পাসে এসেছিল। বলেছিল সে অনেক বড়লোক। গাজীপুরে তার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে। তাকে নিয়ে ওই লোক ফ্যাক্টরিতেও গিয়েছিল। পরে জানা গেল সবই প্রতারণা। গাড়ি, ফ্যাক্টরি কিছুই তার নয়। প্রতারণার পর যখন মেয়েটি জানল সে আমেরিকা ফিরে গেছে, তখন গাড়ি-ফ্যাক্টরির মালিক স্বীকার করে যে, বন্ধুত্বের খাতিরে সে এসব করেছে। আরেকটি মেয়ের কথা। সবেমাত্র সে ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। এক বড় ভাই প্রেমের অভিনয়টি এতটা চাতুর্যের সাথে করে যে অল্প দিনেই মেয়েটি তাকে বিয়ে করে। মেয়েটির ভুল যখন ভাঙল তখন তার সর্বনাশ হয়ে গেছে।
একটি ব্যক্তিগত গল্প বলি। বরিশালের এক ছেলে আমার (লেখক) ছেলে বলে পরিচয় দিয়ে এক ধনাঢ্য ব্যক্তির মেয়ের সাথে প্রেম করে। অবিভাবক আমার পরিচয়ের কারণে ছেলেটিকে প্রশ্রয় দেয়। অবশেষে ছেলেটি যখন মেয়েটিকে নিয়ে চম্পট দেয় কেবল তখনই ওই অবিভাবকেরা আমার সাথে যোগাযোগ করে। তারা একথা শুনে অবাক হয় যে আমি নিঃসন্তান। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে কয়েক মাস পরে মেয়েটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প। এরকম হাজারো গল্প আপনাদের জানা আছে।
আজকের বাংলাদেশের তথাকথিত প্রেমের যে নিষ্ঠুর, নির্মম এবং কুৎসিত চিত্র আমরা দেখছি, তা আমাদের হৃদয়কে ব্যথিত করে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করি। ক. প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় লালমনিরহাটে মিনা আক্তার নামের পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করেছে কলেজছাত্র শাকিল। লালমনিরহাটে এ ঘটনা ঘটে (১২ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ প্রতিদিন)। খ. গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় নারী এসএসসি পরীক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও চিত্র ধারণ করায় অপমানে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। মেয়েটির বাবা অভিযোগ করেন ছেলেটি কিছু দিন তার মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। সাড়া না দেয়ায় স¤্রাট নামের ছেলেটি দুই সহযোগী নিয়ে ওই ঘটনা ঘটায়। গ. পঞ্চগড়ের অটোয়ারিতে প্রেমের প্রতারণার দায়ে দুই যুবককে জেলহাজতে প্রেরণ করে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। দুই যুবতী মেয়ে বাদি হয়ে দু’জনার বিরুদ্ধে প্রেমের প্রতারণার অভিযোগ করে আদালতের কাছে বিচার চায় (২৩ অক্টোবর-২০১৬, প্রথম আলো)। ঘ. প্রেমে ব্যর্থ হয়ে গ্রামের রাস্তায় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় প্রেমিক। বাহার নামের প্রেমিক ঝুমা নামের কলেজছাত্রীর ওপর এ হামলা চালায়। সিলেটের জকিগঞ্চের রসূলপুরে এই ঘটনা ঘটে। হামলায় ছাত্রীটি মারাত্মকভাবে আহত হয় (১৭ জানুয়ারি-২০১৭, প্রথম আলো)। ঙ. স্মার্ট, বাকপটু এবং সুন্দর চেহারার এক ছাত্র এসব পুুঁজি করে ফেইসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমে ফেলে ধনীর দুলালিদের। এরকম প্রতারণার অভিযোগ অসংখ্য। চ. সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের এক ছাত্রী প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় প্রিতম নামের এক যুবক কলেজের কমন রুমে গিয়ে ওই ছাত্রীকে আহত করে। পত্রপত্রিকা খুললেই প্রায় প্রতিদিন এরকম প্রেম প্রতারণার খবর আপনাদের চোখে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ের আরো দু-একটি আলোচিত ঘটনা উল্লেখ করা যায় যা সমাজ ও সরকারকে আলোড়িত করেছে। ৩ অক্টোবর ২০১৬ ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের চাপাতির আঘাতে মুমূর্র্ষু অবস্থা হয় এমসি কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। অসংখ্য লোকের উপস্থিতিতে ওই দুষ্কৃতকারী নারগিসের ওপর হামলা চালালেও কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত লোকজনের নিষ্কৃয়তার সমালোচনা করেছেন।
শুধু বাংলাদেশে নয় প্রেম নামের প্রতারণা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। তিন দিন আগে ভ্যালেনটাইন ডে নামে প্রেম দিবস পালিত হয়েছে পৃথিবীর সব দেশে। আমাদের দেশে এর আগের দিন পালিত হয়েছে ১ ফাল্গুন। বসন্তের আগমনী বার্তা হিসেবে। ঋতুরাজ বসন্তকে প্রেমের প্রতীক মনে করা হয়। সুতরাং দেশে বিদেশে প্রেমের আমেজ সর্বত্র। এরই মধ্যে বেসুরো কথা শুনিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সেন্ট ভ্যালেনটাইন ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের মধুর আমেজে বিষ ঢেলেছে এ সংবাদ বিবরণী। বলা হয় অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ভালোবাসার নামে ছড়িয়ে পড়েছে উপদ্রব। ভালোবাসা দিবস কেন্দ্র করে দেশগুলোয় প্রেমের নামে প্রতারণার স্বীকার হচ্ছেন অনেকে। মূলত একাকীত্বে ভোগা লোকজনকেই অনলাইনে প্রেমের ফাঁদে ফেলে পকেট খালি করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ ভালোবাসার নামে প্রতারণা থেকে সাবধান করে দিয়েছে জনগণকে। অস্ট্রেলিয়া কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজ্যুমার কমিশন (এসিসিসি) জানিয়েছে, দেশটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার মধ্যে প্রেমসংক্রান্ত প্রতারণার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ খসানো হয়। আর ৪৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষই এধরনের প্রতারণার খপ্পরে পড়েন বেশি। মধ্য বয়সী লোকজনকে চিহ্নিত করে অনলাইনে প্রেমের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এর বিনিময় অপরিচিতদের কাছে অর্থ পাঠাতে বলা হয়। এসিসিসির কর্মকর্তা এই বলে সতর্ক করছেন, ‘প্রতারক প্রেমিকেরা দিন দিন আরো চতুর ও সুযোগ সন্ধানী হচ্ছে। যদি অনলাইনে কারো সঙ্গে ভালো লাগার সম্পর্ক হয়, তবে খোঁজ খবর করে নেবেন’। এদিকে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের পুলিশ মিলে কুয়ালালামপুর থেকে সাত শ’ সন্দেহভাজন লোককে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে ১১ জন নাইজেরিয়ার নাগরিক। তারা প্রেম ও সঙ্গ দেয়ার ফাঁদ পেতে বহু লোকের কাছে থেকে অর্থ হাতিয়েছেন। পুলিশ বলেছে তারা ২০১৬ সালে ১০৮ জনের সাথে প্রতারণা করে ৫০ লাখ ডলার খসিয়েছেন। মালয়েশিয়ার বাণিজ্যিক অপরাধ তদন্ত সংস্থার পরিচালক বলেছেন, ‘প্রেমের ফাঁদে ফেলার জন্য মিষ্টি কথার খুদে বার্তা পাঠিয়ে মন গলানো চেষ্টা করে এ ধরনের চক্রের সদস্যরা। তারা কখনো ফোনে সরাসরি কথা বলে না।
তাহলে দেখলেন দেশে এবং বিদেশে ‘প্রেম বলে কিছু নেই’। আছে শুধু স্বার্থ সুবিধা এবং পাশবিকতা। পাশ্চত্য জগতে- ইউরোপ-আমেরিকায় প্রেম অনেক অনেক দিন আগেই উবে গেছে। আছে শুধু উপভোগ। তারা মানুষের মতো উপভোগ করে না। তাদের উপভোগ পশুর পর্যায় চলে যায়। তাদের জীবন সংস্কৃতি অনুরূপ। বাংলাদেশ হাজার বছরের মূল্যবোধ সমৃদ্ধ একটি জাতি। এই জাতির জীবন বোধ, বিশ্বাস-ভালোবাসা বিনষ্ট করার জন্য হাজারো ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা বিশ্বাস করি আজো প্রেম আছে। আমরা টমাস মুর-এর মতো বিশ্বাস করি, ‘প্রেমের নীরব স্বপ্ন যত মধুর তার অর্ধেক মধুরতা আর কিছুতেই নেই’। ধন-সম্পদ উড়ে যায়, আরাম আয়েশ অন্তর্হিত হয়, আশা যায় শুকিয়ে কিন্তু প্রেম থেকে যায় আমাদের মাঝে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, ‘জীবে দয়া বা প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। মনীষী ফয়ের বাখ প্রেমকে বিশ্লেষণ করেন জীবনের স্বত্ব হিসেবে। তিনি বলেন,‘কেবল মাত্র তারই মূল্য আছে যা কোনো কিছুকে ভালোবাসে, ভালোবাসা না থাকা নিজের অস্তিত্ব না থাকারই শামীল। ‘প্রতিটি মানুষের জীবনেই প্রেম আসে।’ আমরা যে সমাজে বসবাস করছি, একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করছিÑ এসবই প্রেম। যারা প্রেমের গভীরতা বোঝে না, তারা মনে করে নারীকে ভালোবাসাই প্রেম। আসলে প্রেম শাশ্বত। পৃথিবীতে প্রেম ব্যতীত মানুষ বসবাস করতে পারে না। সভ্যতার ঘাত-প্রতিঘাতে প্রেমের পদচিহ্ন রয়েছে। অনেক যুদ্ধ ও শান্তির জন্য প্রেমের ঘটনাবলি অবিনশ্বর হয়ে আছে। রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট, প্যারিস এবং হেলেন, সেলিম ও আনারকলি, শাহজাহান ও মমতাজ, মার্ক এন্টোনি অ্যান্ড ক্লিওপার্টা, অরফিয়াস এবং ইউরিডাইস, নেপোলিয়ান এবং জোসেফাইন, ডার্সি অ্যান্ড এলিজাবেথ, মেরি এবং পিয়েরি কুরি, রানী ভিক্টোরিয়া এবং প্রিন্স অ্যালবার্ট, হিটলার এবং ... এর প্রেম কাহিনী বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। আমাদের দেশেও লাইলি ও মজনু, শিরি-ফরহাদ, বেহুলা-লক্ষিণদ্বর, মাথিন এবং মালকা বানুর গল্প অনেকেই জানেন। সেই সব অনাবিল রূপকথার মতো প্রেম কাহিনী আমাদের মনে আবেগ সৃষ্টি করে। কিন্তু আজকাল মহামারীর মতো তথাকথিত সর্বনাশা প্রেমের বিস্তার আমাদেরকে বিস্মিত না করে পারে না। আমাদের প্রাইমারি স্কুলেও প্রেম প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের কোনো জায়গায়ই মেয়েরা নিরাপদে নির্বিঘেœ স্কুলে যেতে পারে না। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বন্দ্ব কলহের বড় একটি কারণ প্রেম। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যে ছেলেটি বা মেয়েটি প্রেম করে না সে একঘরে হওয়ার শামিল। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় এসব প্রেম অনেক ক্ষেত্রে শক্তিনির্ভর। এবং অবশেষে শরীরনির্ভর। এসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয় তথা সমগ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের সম্মান রক্ষার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। কিছু দিন আগে ইভটিজিং নামে মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে সমাজ ও সরকারকে হিমশিম খেতে হয়েছে। প্রেম এমন বিষয় নয় যে, আইন করে বন্ধ করা যায়। অথবা আইন করে প্রেমের নির্দেশ দেয়া যায়। এটি স্বাভাবিক যদি তা সত্যিকার প্রেম হয়। সব ধর্মে প্রেমের কথা বলা হয়েছে। রাধা-কৃষ্ণের প্রতীকী প্রেমে সৃষ্টি ও স্রষ্টার ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। ধর্মবেত্তারা বলেন, ‘আল্লাহর প্রেম মানুষকে উপরে উত্তোলন করে আর পার্থিব প্রেম আত্মাকে জমিনের নিচে নিয়ে যায়।’ একটি হাদিসের ভাবার্থ এরকম ‘যে আল্লাহর জন্য ভালোবাসল এবং তার জন্যই কাউকে ঘৃণা করল, তা ছাড়া তারই জন্য কাউকে দেয়া এবং দেয়া থেকে বিরত থাকল সে তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নিল।’
বাংলাদেশ সমাজের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে বিষয়টির গুরুত্ব অনূভব করে গবেষণা, সমীক্ষা এবং সমাধানের পথ নির্দেশনা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা সামাজিক বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন তাদের ওপর অধিকতর দায়িত্ব বর্তায়। যে কোনো সমস্যা অনুধাবনের জন্য যেমন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়টি অধ্যয়ন জরুরি, তেমনি সমাজ তত্ত্বের গহিন গভীরে প্রবেশ করাও অনিবার্য প্রয়োজন। আমার প্রাথমিক বিবেচনায় ১. নেট, ই-মেইল, টুইটার, ফেসবুক, ভাইভার, মেসেঞ্জারসহ কম্পিউটর ও মোবাইলে ব্যবহৃত ইনফরমেশন টেকনোলজির অপব্যবহারের প্রধান কারণ। আমাদের সমাজে যুবক-যুবতী এমনকি কিশোর-কিশোরীরা যথেচ্ছভাবে মোবাইলে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করছে। অনেক সময় সারাদিন সারারাত তাদের এনিয়েই ব্যস্ত দেখা যায়। সেলফি এ ক্ষেত্রে একটি বাড়তি উপদ্রব। এ কথার অর্থ এই নয় যে, আমরা বিজ্ঞানের অবদানকে অস্বীকার করব। ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’ সেই গতানুগতিক বিতর্কে সতর্কতার সাথে আমাদের বিজ্ঞানের অভিশাপকে পরিহার করতে হবে। পাশ্চাত্য জগতে এধরনের সমস্যা কম তার কারণ তারা বিজ্ঞান ও এর ব্যবহারিক সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের সমাজ-শিক্ষা-সংস্কৃতির যথার্থ উন্নয়নের আগে তথ্য বিপ্লব ঘটায়, ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ২. আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এক বিরাট সংখ্যক যুব গোষ্ঠী বেকার এবং আধাবেকার। তারা তাদের কাম্য সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারছে না। তার ফলে হতাশা থেকে ‘প্রেম বিলাপ’ এর মতো ঘটনা ঘটছে। ৩. আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটেছে। সম্পদ আহরণ ও উপার্জনের ক্ষেত্রে সন্ত্রাস এবং অপরাধ প্রবণতা একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুবকরা হয়তো এটা বিশ্বাস করছে যে অর্থ-বিত্ত যখন শক্তির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব, তখনস হয়তো ‘চিত্ত’ ও ‘সন্ত্রাসের’ মাধ্যমে দখল করা সম্ভব। ৪. গণমাধ্যম অর্থাৎ সিনেমা, টিভি চ্যানেল, নাটক ইত্যাদি মাধ্যমে যা প্রদর্শিত হয় তাতে মানব-মানবিকতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয় না। বরং সন্ত্রাস-শঠতা তথা শক্তি প্রয়োগকে বিজয়ী দেখানো হয়। প্রেম নির্ভর এসব কিছু কিশোর যুবক মনে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। ৫. শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের যে কাক্সিক্ষত নাগরিক গোষ্ঠী তৈরি হওয়ার কথা তা না হয়ে একদল বস্তুবাদী, ভোগবাদী এবং আয়েশি নাগরিক শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাণিজ্যিকরণ ঘটেছে। এর ফলে সৎ, সাহসী, নিষ্ঠাবান নাগরিক তৈরি না হয়ে স্বার্থপর, সুবিধাবাদী, সঙ্কীর্ণ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত নাগরিক শ্রেণী তৈরি হচ্ছে। এরা যথার্থ নৈতিক মানসম্পন্ন না হওয়ার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে না। আমাদের অবশ্যই মহৎ, চিরন্তন এবং সংস্কৃতিবান হতে হবে। অবশেষে কবি গুরুর ভাষায়, ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে,/ কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে। / গরব সব হায় কখন টুটে যায়, / সলিল বহে যায় নয়নে।’

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫