ঢাকা, সোমবার,২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

মতামত

প্রশাসন যখন ‘দলকানা’

তৈমূর আলম খন্দকার

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ১৭:০০


প্রিন্ট

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সুজলা সুফলা, হিমালয় ও বঙ্গোপসাগর ঘেরা এই বাংলাদেশকে অতীতে শোষণ করেছে বহু জাতি, উপজাতি। ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ থেকেই বাংলাদেশের উৎপত্তি। বৈজ্ঞানিকরা এটাও মন্তব্য করছেন যে, বায়ু দূষণের পরিমাণে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে দিন দিন উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মেরু অঞ্চলের বরফ অতিমাত্রায় গলে যাওয়ায়, সমুদ্রপৃষ্ঠে উচ্চতা বৃদ্ধি হওয়ার ফলে এমন একদিন আসতে পারে যে, বাংলাদেশের একটি বিরাট অংশ সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। এটা বৈজ্ঞানিকদের ধারণা। তবে বিভিন্ন বিষয়ে বৈজ্ঞানিকদের আগাম বার্তা অমূলক নয় বলে বার বার প্রমাণিত হয়েছে।
ভৌগোলিক সীমারেখার দিক দিয়েও বাংলাদেশ অনেক লোভনীয় অবস্থায়। ফলে পৃথিবীর বড় বড় শক্তি অর্থাৎ আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত, চীন সবার শ্যেনদৃষ্টিও বাংলাদেশের প্রতি। এ কারণেও বাংলাদেশের রাজনীতি ও সার্বভৌমিকতা এখন ষড়যন্ত্রের শিকার। বন্ধুরাষ্ট্র থেকেও আমাদের দেশ কি নিরাপদ? প্রতি মাসেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশী নিধন একটি নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। যাকে কার্যত সরকার কোনো ঘটনাই মনে করছে না বা করতে পারছে না অথবা উপলব্ধি থাকলেও বাস্তবতার নিরিখে প্রতিবাদের অবস্থান নেয়ার ভাষা যেন আপনা আপনিই স্তব্ধ হয়ে গেছে। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার প্রতিবাদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতেই সীমাবদ্ধ। অধিকন্তু সীমান্ত রক্ষার অধিকর্তা অর্থাৎ বর্ডার গার্ডের মহাপরিচালক গত মাসে (জানুয়ারি ২০১৭) ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ তো করেনইনি বরং এটাকে তিনি জাস্টিফাই করেছেন। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে যাদের কাছে তাদের (কর্মচারীদের) জবাবদিহি করার কথা, সেই কর্তৃপক্ষের সবুজ সঙ্কেত ছাড়া তিনি এ মন্তব্য করতে পারেন না। নতুবা দেশের নাগরিক যখন বিদেশী সৈন্যদের দ্বারা গুলিতে নিহত হয় তখন বর্ডার গার্ডের মহাপরিচালক এ ধরনের উক্তি করেন কোন মানসিকতায়?
এ দেশের মানুষ যুগে যুগে নির্যাতিত, নিপীড়িত হয়েছে। প্রতিবাদ করেছে, দাবি আদায় হয়েছে। কিন্তু প্রতিকার স্থায়ীকরণ হয়নি। মোগল নির্যাতন করেছে জমিদারদের মাধ্যমে, ব্রিটিশ নির্যাতন করেছে উপনিবেশবাদী প্রশাসন সৃষ্টি করে, সাবেক পাকিস্তান সে ধারা অব্যাহত রেখেছে, যা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্দোলন, সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশটি ২৪ বছরের ব্যবধানে দুইবার স্বাধীন হয়েছে, সে দেশের সাধারণ জনগণও প্রজাতন্ত্রের প্রশাসন দ্বারা নিপীড়িত-নিগৃহীত হচ্ছে, যাদের গাড়ি, বাড়ি, সন্তান-সন্ততি পরিবার-পরিজন জনগণের টাকায় লালিত-পালিত। রাষ্ট্রযন্ত্র অনেক ক্ষেত্রে জনগণকে হয়রানি, নিপীড়ন-নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর আইনের আবরণ রয়েছে সেহেতু প্রশাসনকে ব্যবহার করা হলে পরবর্তীতে আইনি জটিলতার কোনো ঝুঁকি থাকে না- এ বিশ্বাসেই আইন রক্ষার লোকজন আইন বিঘিœত করে মানুষের অধিকার বিঘ্নিত করছে। দলীয় ক্যাডাররা যেহেতু হালুয়া রুটির ভাগাভাগি নিয়ে খুনাখুনিতে ব্যস্ত, সেহেতু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে ‘দলীয় ক্যাডার’দের পাশাপাশি ‘রাষ্ট্রীয় ক্যাডার’দের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে এ কারণে তিনটি জিনিস প্রয়োজন। ১. অর্থসম্পদ (অর্থাৎ রাজধানীতে বাড়ি, গাড়ি ও বড় অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্স), ২. প্রমোশন ও ৩. সুবিধা মতো লোভনীয় স্থানে পোস্টিং। এ তিনটি বিষয়ই সরকারের হাতে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক সেহেতু ব্যক্তিবিশেষের সন্তুষ্টি বিধান আমলাদের একমাত্র ধ্যান-ধারণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রতি বিমুখতা দিন দিন প্রকাশ পাচ্ছে।
বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৭(১) মোতাবেক ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োজন কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ অধিকন্তু অনুচ্ছেদ ২১(২)’তে বলা হয়েছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ কিন্তু প্রশাসনিক ক্যাডারদের আচরণের কারণে সংবিধানে সংরক্ষিত মৌলিক অধিকারের (অনুচ্ছেদ-২৬ থেকে ৪৭ পর্যন্ত) সম্মিলিত ধারাগুলোর সাথে ওই ধারাগুলোও পদদলিত হচ্ছে। পরিবেশ পরিস্থিতি, রাষ্ট্রযন্ত্র বা প্রশাসনিক আমলাদের আচরণ (সংবিধান মোতাবেক যাদের দায়িত্ব জনগণের সেবা করা) অর্থাৎ কাজ করার ধরন প্রভৃতি কি প্রমাণ করে যে, জনগণই বাংলাদেশের মালিক? বরং এটাই প্রমাণিত হচ্ছে প্রশাসনিক আমলারাই দেশের মালিকের মতো আচরণ করছেন, জনগণ হলো বলির পাঁঠা। কর দেবে আর হয়রানির শিকার হবে এটাই যেন জনগণের ভাগ্যের লিখন।
আমলারা দলকানা, অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীর চেয়ে একটু বেশি। প্রশাসনিক আইডেন্টিফিকেশন দেয়ার আগে তারা এলাকার পরিচয়টা দিয়ে নিজের ক্ষমতা জাহির করে। রাজধানীর প্রায় সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজেকে একটি জেলার অধিবাসী হিসেবে পরিচয় দেন। সরকারই পুলিশনির্ভর; আইনকে লঙ্ঘন করেছে। জনগণের অধিকার ছিনতাই করা যারা অধিকার মনে করে, তারা সরকারপ্রধান ঘেঁষা পরিচয় দিয়ে একটু একস্ট্রা বেনিফিট নিতে চায়। বিশেষ জেলার লোক হলে উপরতলা থেকে শেল্টার পাওয়া যায়, সিভিল সার্ভিস ক্যাডার যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন তারা লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে একই পরিচয় দিতে চান কিভাবে?
কোনো মানুষ যখন ‘রাতকানা’ রোগে আক্রান্ত হয় তখন দিনের আলোতেও ঝাপসা দেখে। প্রশাসন (নিরপেক্ষ থাকা যাদের দায়িত্ব) যখন দলকানা হয়ে যায় তখন মানুষের দুর্ভোগের আর সীমা থাকে না। সাধারণ মানুষ তখন আইনের আশ্রয় নিতে পারে না। কারণ ‘আইনে’ প্রদত্ত ক্ষমতা বলেই আমলারা হয়রানি করে এমন লোকের ওপর যাদের মাথার ওপর কোনো প্রভাবশালী ক্ষমতাধর (মন্ত্রী/এমপি/সরকারি দলের নেতা) ব্যক্তি নেই। আমলাতন্ত্রের একটি নিজস্ব স্বভাব আছে। তা হলো, ক্ষমতাধরদের ধমক আমলাদের অনেক পছন্দ, যাদের মামার জোর নেই সেসব সাধারণ মানুষের রক্ত চুষতেও অনেক আমলা পছন্দ করে। এই হয়রানির হাত থেকে বাঁচার উপায় কী? স্বাধীনভাবে বাঁচার, সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করার, সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবিতে জনগণ যেখানে দেশটিকে দুইবার স্বাধীন করল, তার পরও কি আমলাতান্ত্রিক হয়রানি থেকে জনগণ রক্ষা পাবে না?
দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছে (যদিও এ কমিশন অনেক ক্ষেত্রে সরকারের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে)। কুয়াকাটা, কক্সবাজারসহ দেশের অভিজাত ও আকর্ষণীয় স্থানে আমলাদেরই প্লট বেশি। বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড অনুসারে ‘১-১১’ সরকারের সময় দুর্নীতি দমন টাস্ক ফোর্সে কর্মরত কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের প্রাইভেটকার ক্রয়ের সংখ্যাই ছিল বেশি। তবুও তারা দুর্নীতি দমন কমিশনের আওতায় আসেনি।
আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্যাতন করার সংস্কৃতি এত প্রকট ছিল না, এখন তা মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এ ক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে। কাজকর্মে মনে হয়, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী মনে করে যে, নির্যাতন-নিপীড়নের লাইসেন্স দিয়েই তাদের হাতে লাঠি-বন্দুক দেয়া হয়েছে। কিন্তু বস্তুত এমন আচরণ চলছে সর্বত্র। সরকারি দলের লোকের জন্য ফাইলে নোট দেয়া হয় একরকম, সরকারবিরোধী হলে নোট হয় আরেক রকম।
প্রশাসনিক আমলাদের জবাবদিহিতায় আনার জন্য একটি কমিশন থাকা এখন সময়ের দাবি। কারণ রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারী হয়ে তারা নাগরিকদের সাথে দুই ধরনের আচরণ করা কিংবা সরকারবিরোধী হওয়ার কারণে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করাকে (যা অহরহ ঘটছে) আইনগত অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে যে, একই বিষয়ে পৃথক পৃথক দরখাস্তকারী (সরকারসমর্থক ও বিরোধী) হলে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারি অফিসগুলোতে হয়ে থাকে। যদি আমলাদের ফাইল চালাচালিকে ন্যায় ও ইনসাফের আওতায় আনতে হয়, তবে তাদের নিয়ন্ত্রণ একটি কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা যায়, যাতে জনগণ আমলাদের অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এ ধরনের কমিশনের দায়িত্বে যিনি থাকবেন তিনিও তো আমলা। তথাপিও কাজটি শুরু হওয়া আবশ্যক।

লেখক : কলামিস্ট ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫