ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৭ জুলাই ২০১৭

বিবিধ

প্রাণের মেলার মনের কথা

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫৬


প্রিন্ট

শুরু হয়েছে বাংলা ভাষাভাষীদের প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭’। আমাদের জাতীয় জীবনে এই মেলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মাসব্যাপী এই বইমেলায় আসবে হাজারো নতুন বই। লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের আন্তরিক বিনিময়ে এ মেলা হয়ে উঠবে অন্যরকম। মেলা নিয়ে দেশের বিশিষ্ট লেখক ও কবি দিয়েছেন সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন আলাউদ্দিন আদর

সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য বইয়ের বিকল্প শুধুই বই
কে জি মোস্তফা
বইমেলার প্রথম দশক পার হয়ে দ্বিতীয় দশক চলছে। এই বইমেলা নিয়ে কিছু বলুন।
- বইমেলা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলছে।এটি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে চির জাগ্রত রাখছে। কিন্তু বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এখন ইন্টারনেট আমাদের শিশুদের ঘরে কম্পিউটারমুখী করে রেখেছে। সে জন্য বইমেলায় ওরা আর ছুটে আসছে না। আগের দিনে আমাদের বই ছিল একমাত্র বিনোদনের উপকরণ। আমরা বই পড়ে আনন্দ পেতাম। বই পড়ে বিশ্ব সম্পর্কে জানতাম। নিজেকে চিনতাম। মননের বিকাশ ঘটত। বই আমাদের মাঝে নেশা ধরিয়ে দিত। বই পড়ে রাত কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু এখনকার প্রজন্ম সেই অবস্থায় নেই। তারা ইন্টারনেটে গেমসহ নানা কিছু দেখে। তাই বইমেলা তাদের অতটা কাছে টানতে পারে না। তবু অনেকেই মেলায় আসে। আসছে। আসতে আসতে মেলা জমে উঠবে।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাহলে আপনার আহ্বান কী?
- বিশ্ববিখ্যাত লেখক লিউ টলস্টয় বলেছেন, জীবনের জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন। এক-বই, দুই-বই, তিন-বই। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, মনুষ্যত্বের বিকাশের জন্য, সত্যিকার জ্ঞান অর্জনের জন্য, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য বইয়ের বিকল্প শুধুই বই। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের প্রভাবে বইবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেটের প্রয়োজন আছে, তবে তা প্রয়োজন বেশি যেন না হয়। পাঠ্যবইয়ের পর তরুণদের ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। তরুণেরা ভালো বই পড়লে নানা রকমের অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়বে না। তাদের বলব- ভালো বই পড়।
আপনি বলছেন বই মননের বিকাশ ঘটায়। যে বই মননের বিকাশ ঘটাত সেই বইয়ের কাজ কেমন হচ্ছে?
- কী বই পড়ব? শিশু কিশোরদের উপযোগী বই বাজারে কেমন আছে? সেটা নিশ্চয় ভাববার বিষয়। এখন তো অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের লেখায়ও বানান বিভ্রাট ও শব্দের যথাযথ প্রয়োগের অভাব দেখা যায়। আমাকে অনেকেই বই দেয়, এই সমস্যার কারণে আমার পড়তে ইচ্ছে করে না। শিশু-কিশোরেরা যেটা ছাপার অক্ষরে দেখে সেটাকে শুদ্ধ মনে করে। পাঠ্যবইয়ে এখন ভুল পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সবাইকে। আমি বলব, আমাদের যেই ভাষার জন্য মানুষ শহীদ হলো সেই ভাষার সঠিক চর্চা করুন। ভালো সাহিত্য পাঠকদের হাতে তুলে দিন। প্রকাশকেরাও আজকাল নিজের অর্থে খুব বেশি বই করছে না। লেখকদের নিজের অর্থ খরচ করে বই করতে হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের বিকাশে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে
শিশুদের মনুষ্যত্ব বিকাশের কথা বলছি। কিন্তু বাজারে এখন দেখছি ভূতের বইয়ের ছড়াছড়ি। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
- হ্যাঁ, এগুলো শিশুদের কল্পনাশক্তি সেভাবে বাড়াচ্ছে না। আর বেশি ক্ষতি করছে কম্পিউটার গেম। যেকোনো জাতির আসল জিনিস হলো তার শিকড়। শিকড় বাদ দিয়ে কোনোভাবে আকাশে ওঠা সম্ভব নয়। শিকড় মাটিতে প্রথিত থাকতে হবে। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য মজার মজার গল্পে তুলে ধরতে হবে।
পাঠক-লেখক প্রকাশক ও আয়োজক সবার উদ্দেশ্য কি অল্প কথায় বলবেন?
- সবার প্রতি বলব- ভালো কিছু সৃষ্টি করুন। মা-মাটি-মাতৃভূমির পক্ষে লিখুন। দেখেশুনে যাচাই করে ভালো বই কিনুন। আপনার প্রিয়জনকে ভালো বই উপহার দিন।

 

পাঠকদের বই কেনার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে
জাহিদুল হক

অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে আমরা বলি প্রাণের মেলা। যে আবেগ ও মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এটির আয়োজন হয়, সেটি কতটুকু বাস্তবায়ন হয়?
- আমি যেকোনো একটি মেলাকে প্রথমত বাণিজ্যিকভাবে দেখি। এই মেলাটিকেও বাণিজ্যিকভাবে দেখি। কিন্তু এটির প্রত্যাশা ও আবেদন ভিন্ন। এখানে ভালো মানের লেখা বই বের হবে, ভালো বাইন্ডিং, চমৎকার ছাপায় সেগুলো বাজারে আসবে। পাঠকেরা সেগুলো কিনবে, এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু মেলায় যারা আসে সবাই বই কেনে না। আমার মনে হয় যারা আসে তাদের অর্ধেক মানুষও বই কেনে না। পাঠকদের বই কেনার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে। যত বেশি পাঠক বই কিনবে, লেখক ভালো লিখবে, প্রকাশক ভালো বই প্রকাশ করবে ততই এটি প্রাণের মেলা হয়ে উঠবে।
কলকাতা বইমেলা বা আন্তর্জাতিক বইমেলাগুলোর সাথে আমাদের বইমেলার মৌলিক পার্থক্য কী?
- মৌলিক পার্থক্য- আমাদের বইমেলা খুবই প্রাদেশিক। এটির একটি আন্তর্জাতিক রূপ দেয়া উচিত। আমাদের বইমেলাতে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত লেখকদের বই আরো বেশি আসা উচিত। ভালো প্রকাশনাগুলোর অংশগ্রহণ থাকা উচিত। তাহলে এটি আন্তর্জাতিক রূপ পাবে।
মননের উন্মেষ ঘটায় যে বই সে বই লেখা হচ্ছে কি? বিশেষ করে গবেষণাগ্রন্থ বা অনুবাদের কথা যদি বলি?
- না, তা হচ্ছে না। আমি মনে করি, আমাদের সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য সামগ্রিকতা দরকার। প্রচুর বিদেশী বইয়ের অনুবাদ দরকার। আমাদের সাহিত্যের অনুবাদ ব্যাপক হারে করা দরকার। অথচ আমাদের সাহিত্যের অনুবাদ হয় না বললেই চলে! বিশ্বসাহিত্যে আমাদের স্থান নিতে হলে অনুবাদের বিকল্প নেই। আমাদের সাহিত্য খুবই উঁচু মানের সাহিত্য, এটি বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে পারছি না শুধু ভালো অনুবাদের অভাবে।
বাংলা একাডেমি অনেক পরিশ্রম করে বইমেলার চমৎকার আয়োজন করে। তবু বইমেলা তাদের কাজ নয়- এমন সমালোচনা কেন?
- বাংলা একাডেমির কাজ বইমেলা করা নয়। বাংলা একাডেমির কাজ গবেষণা করা, অনুবাদ করা সর্বোপরি বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করা। ভালো সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা। আমি মনে করি, বইমেলাকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দেয়া উচিত। এটিতে প্রবেশ মূল্য থাকা উচিত, যাতে প্রকৃত পাঠকেরাই শুধু প্রবেশের সুযোগ পায়।
শেষ কথা কী বলবেন?
- বই কিনুন, পড়ুন, সন্তানকে ভালো বই কিনে দিন।

 

সারা বছর আমরা অপেক্ষা করি এই মেলার জন্য
আফরোজা পারভীন

একুশের চেতনায় আয়োজিত হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এই মেলা আপনাকে কেমন আলোড়িত করে?
- একুশে বইমেলা এখনো ভীষণ রকম আলোড়িত করে। সারা বছর আমরা অপেক্ষা করি এই মাসের জন্য। আমি কলকাতা বইমেলাসহ বিশ্বের অনেক বুক ফেরারে অংশ নিয়েছি। কিন্তু আমাদের বইমেলার আবেদন সেখানে পাইনি। লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়। সারা বিশ্ব থেকে, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বইপ্রেমী মানুষ ছুটে আসে এবং আমরা যারা লিখি তারাও উদগ্রীব হয়ে বসে থাকি নতুন বইয়ের অপেক্ষায়। এসব কিছু মিলিয়ে বইমেলা আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। ভাষা শহীদদের স্মরণে এই আয়োজন আমাদের জাতীর জন্য বিশাল বিষয়। কারণ ভাষার জন্য আর কোনো দেশের মানুষকে এভাবে জীবন দিতে হয়নি। আর আমি একজন শহীদের (মুক্তিযুদ্ধে আমার বড় ভাই শহীদ হন) বোন হিসেবে বিষয়টির গুরুত্ব আমার কাছে অনেক বেশি। কাজে ভাই হারানোর যে কষ্ট, যে দাহ এবং শহীদদের নিয়ে যে গর্ব তা বেশি অনুভব করি।
* আপনি বলছেন আপনি দেশের বাইরের অনেক বুক ফেয়ারে গেছেন, সেই মেলার সাথে আমাদের বইমেলার বড় পার্থক্য কী?
- পার্থক্য হচ্ছে এই আমাদের দেশের প্রকাশনা যেন পুরো একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সে জন্য এই মাসে প্রচুর চাপ পড়ে। লেখক, প্রকাশক, বিপণনকর্মী, বাইন্ডার ও মুদ্রণ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই ভীষণ রকমের চাপে থাকে। সে জন্য লেখক অনেক সময় তার শ্রেষ্ঠ বইটি উপহার দিতে পারেন না। প্রকাশক মনের মতো বই প্রকাশ করতে পারেন না। প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং ভালো মানের হয় না। সব ছাপিয়ে পাঠক ভালো মানের বই থেকে কিছুটা বঞ্চিত হয়। যেটা বিদেশী বইয়ের সাথে একটা বড় পার্থক্য তৈরি করে। আরেকটা বিষয়, নতুন লেখকদের অনেকেই চমৎকার লিখেন। আবার অনেক লেখক পুরো প্রস্তুত না হয়ে বই করে ভালো মানের কাছাকাছি পৌঁছতে পারেন না।
অনেক দিন যাবৎ একটা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যে, প্রকাশকেরা লেখকদের কাজ থেকে টাকা নিয়ে যেনতেন বই করে দিচ্ছে। বিষয়টা কতটুকু কিভাবে দেখছেন?
- হ্যাঁ, এমন একটা অভিযোগ প্রায়ই শুনি। কিন্তু এ যাবৎ আমার প্রায় ৭০টি বই বেরিয়েছে। এখন হয়তো আমি পুরনো লেখক। কিন্তু যখন আমি প্রথম বই করি তখনো আমাকে টাকা দিতে হয়নি। বিষয়টা এমনি হলে তা দুঃখজনক। এখন অবশ্য সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বই কিনছে এবং লেখকদের সাথেও চুক্তি করে, তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন হয় তা সঠিক জানি না। অনেক প্রকাশক টাকার হিসাব দেয় না এমন অভিযোগ রয়েছে, যা মোটেও উচিত নয়।
শিশুদের মননের উন্মেষ ঘটাতে পারে সে ধরনের সাহিত্য কি হচ্ছে?
- হ্যাঁ, হচ্ছে। হয় তো তা খুব বেশি নয়। ভূত ও রাক্ষসের গল্প নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে সে ব্যাপারে বলব, এসব বিষয় নিয়ে গল্পের দরকার আছে। কল্পনাশক্তি বাড়াতে রহস্য বা রূপকথার প্রয়োজন রয়েছে। তবে লেখকদের শিক্ষণীয় বিষয়ের ওপরও জোর দেয়া উচিত। মৌলিক গল্প চর্চা ছাড়া হয় না। চর্চা করতে হবে।
অল্প কথায় কিছু বলতে বললে কী বলবেন?
- আগের বছরের মেলাটিকে যেন পরের বছরের মেলাটি অতিক্রম করে যেতে পারে সেভাবে আমাদের চিন্তা করা উচিত। লেখকের উচিত সবচেয়ে সেরা বইটি উপহার দেয়া। প্রকাশকের উচিত সেরা প্রকাশনা উপহার দেয়া। পাঠকের উচিত সেরাটা খুঁজে নেয়া।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫