সিটি নির্বাচন : ১০টি প্রাসঙ্গিক ভাবনা এবং ১টি দুর্ভাবনা

শফিক রেহমান

১ আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণায় বহু ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার মধ্যে জনসাধারণের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতিটি ছিল - তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবেন।

২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এ সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে ২৮ এপৃল ২০১৫-তে ঢাকা সিটি কর্পরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পরেশন নির্বাচন অর্থাৎ ঠিক ছয় বছর চার মাসের মধ্যে (মোট ৭৬ মাসে) শেখ হাসিনা তার সেই দুটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।


প্রথমত, বাংলাদেশের মানুষ ভাতের অধিকার পেয়েছে যদিও শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত ১০ টাকা কেজি দরে চাল নয়, বর্তমানে ৪০ টাকা কেজি দরে সেই চাল পাচ্ছে। এই প্রাপ্তিকে কেউ অস্বীকার করলে তাকে দুর্মুখ বলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ২৮ এপৃল ২০১৫-তে বাংলাদেশের মানুষ ভোটের অধিকার পেয়েছে। শত-সহস্র অনিয়ম সত্ত্বেও ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি কর্পরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার খুব খুশিমুখে বলেছেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং সেজন্য তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ দাবি করেছেন নির্বাচন সফল হয়েছে। আওয়ামী মন্ত্রী ও নেতারাও তাই বলেছেন। সুতরাং তাদের দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দাবি করতেই পারেন যে মানুষকে তিনি ভোটের অধিকার বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই প্রাপ্তিকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করলে তাকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ চেতনা ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী বলতে হবে।

এই ঝুকি সত্ত্বেও অধিকাংশ টিভি ও পৃন্ট মিডিয়ার, দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকবৃন্দের এবং কূটনীতিকবৃন্দের দ্ব্যর্থহীন রায় এসেছে ২৮ এপৃল ২০১৫-র সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে অভূতপূর্ব ভোট ডাকাতি হয়েছে। ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া কারচুপির তদন্ত চেয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, বিএনপির ভোট কারচুপি সম্পর্কে বিএনপি’র সব অভিযোগের দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস বৃফিংয়ে এ কথা জানান মহাসচিবের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হক। তিনি আরো জানান ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগে বিএনপি’র নির্বাচন বয়কটের বিষয়টি জাতিসংঘ মহাসচিব অবগত রয়েছেন। নিয়মিত প্রেস বৃফিংয়ে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক তিন সিটি নির্বাচনের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, জাতিসংঘ সিটি কর্পরেশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠান বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছিল। স্থানীয় সময় ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। আমরা তার প্রতিফলন দেখিনি, বরং দেখেছি ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা। সাংবাদিকেরা সরকার সমর্থক কর্মীদের হাত থেকে রেহাই পাননি। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে সাংবাদিকেরা নাজেহাল হয়েছেন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নির্বাচনে ভোট কারচুপি, সহিংসতার বিষয়ের তাদের হতাশা ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের অবস্থান কি?
উত্তরে ফারহান হক বলেন, বিএনপি’র অভিযোগের দ্রুত তদন্তের পাশাপাশি বিরোধী দলের উদ্বেগ প্রকাশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের পথে অগ্রসর হতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব আহ্বান জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন ফারহান হক।

আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে জেতা আসলে কোনো জয় নয়।’ ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পরেশন নির্বাচন নিয়ে বেলা পৌনে ২টায় এক টুইটার বার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এর আগে অপর এক টুইটার বার্তায় তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের তিন সিটি কর্পরেশন নির্বাচন থেকে বিএনপি’র সরে আসায় হতাশ হয়েছি।’ বেলা ৩টায় আরেক টুইটে রাষ্ট্রদূত লেখেন, ‘দমন-পীড়ন ও সহিংসতার এত ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে শুনে এবং আজকের সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে তার প্রভাব বিবেচনায় হতাশ হয়ে পড়েছি।’ মার্কিন দূতাবাস থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আজ বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ব্যাপক ও বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং সিটি কর্পরেশন নির্বাচন বয়কটের যে সিদ্ধান্ত বিএনপি নিয়েছে তাতে আমরা হতাশ। যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে তার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। ’


দৈনিক প্রথম আলো তাদের রিপোর্টের শিরোনাম দেয়, ‘জিতল আ. লীগ, হারল গণতন্ত্র’ যদিও কেউ কেউ বলেন, আওয়ামী লীগও হেরেছে। আর প্রত্যাশিতভাবে শেখ হাসিনা বলেন, ’নির্বাচনে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে।’ গতানুগতিকভাবে তিনি আরো বলেন, ’ভোট জালিয়াতি অভিযোগের তদন্ত হবে।’
কিন্তু চুরির তদন্ত চোরই যদি করে তাহলে কি লাভ হবে?

২ নির্বাচন কমিশনের সংখ্যা বিন্যাসে দেখা যায় ঢাকা সিটি দক্ষিণে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকন মোট ৫৩৫,২৯৬ ভোট পেয়ে মেয়র ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। তার নির্বাচনী প্রতীক ছিল ইলিশ, যে মাছটি এখন বাংলাদেশে দুর্মূল্য। ধারণা করা যায়, আওয়ামীপ্রীতি এবং ইলিশপ্রীতি এই উভয় ফ্যাক্টরই তাকে ভোট পেতে সাহায্য করেছে।
নির্বাচনের আগে সাঈদ খোকন মোবাইল ফোনে ব্যাপক এসএমএসের মাধ্যমে ক্যামপেইন করেছিলেন। তাকে যারা ভোট দিয়ে জয়ী করেছেন, আশা করা যায় সাঈদ খোকন তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে অন্তত একটি ইলিশ মাছ পাঠিয়ে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। এখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ২৯৪,২৯১ ভোট। তার বিরুদ্ধে বহু মামলা থাকায় তিনি নির্বাচনী প্রচার কাজে অংশ নিতে পারেননি। আওয়ামী সরকার চাইলে আগামীতে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে তার বিরুদ্ধে মোট মামলার সংখ্যা ২৯৪,২৯১-তে উন্নীত করতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি প্রাপ্ত ভোটের জন্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা যেতে পারে। এটা প্রশাসনিকভাবে অসম্ভব নয় কারণ আওয়ামী লীগ সব পারে।

ঢাকা সিটি উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হক মোট ৪৬০,১১৭ ভোট পেয়ে মেয়র ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। তার নির্বাচনী প্রতীক ছিল ঘড়ি। আনিসুল হকের নিকটজনরা জানেন, তিনি বন্ধুবৎসল ব্যক্তি এবং ঈদের সময়ে তিনি তাদের সুন্দর গিফট পাঠান। এবার আনিসুল হক হয়তো চাইবেন নিজেকে ভোটারবৎসল ব্যক্তি রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। সেক্ষেত্রে আগামী ঈদে তার পক্ষের প্রতিটি ভোটারকে ধন্যবাদসূচক একটি ঘড়ি গিফট পাঠাতে পারেন।

তিনি এতগুলো ঘড়ির দাম নিশ্চয়ই ম্যানেজ করতে পারবেন যেমনটা তিনি পেরেছিলেন কোনো গাড়ি-বাড়ি না থাকা সত্ত্বেও (তারই দেওয়া নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী) নির্বাচনের যাবতীয় খরচ ম্যানেজ করতে। কিন্তু ঘড়ি ম্যানেজ করতে পারলেও আনিসুল হক ঢাকা সিটি উত্তরে নিয়মিত ঝাড়– দেওয়া (যেটা তিনি তার নির্বাচনী অভিযানে করেছিলেন) ম্যানেজ করতে পারবেন কি না সেটা ভবিষ্যতে দেখা যাবে।

ঢাকা সিটি উত্তরে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আওয়াল পেয়েছেন ৩২৫, ০৮০ ভোট। তাবিথ আওয়ালের পিতা আবদুল আওয়াল মিন্টু, এই এলাকা থেকে মেয়র পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু তার নমিনেশন পেপারে ত্রুটি থাকায় নির্বাচন কমিশন সেটা খারিজ করে দেন। তখন বিকল্প প্রার্থী রূপে তাবিথ আওয়ালকে দাড় করানো হয়। আবদুল আওয়াল মিন্টু মার্চেন্ট নেভিতে বহু বছর কাজ করার সুযোগে বিশ্বের বহু উন্নত শহর দেখেছেন এবং ঢাকা সিটির মেয়র হয়ে তার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। বহু বছর আগে তিনি ঢাকা সিটিকে পরিবর্তিত করার প্ল্যান, একটি বই আকারে প্রকাশ করেন। তার সেই স্বপ্ন আপাতত স্থগিত থাকলো। আবদুল আওয়াল মিন্টু সমুদ্রগামী জাহাজে কাজ করতেন এবং শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে শাসনকালে (১৯৯৬-২০০১) তার সরকারকে একটি ফৃগেট বা যুদ্ধজাহাজ কেনায় সহায়তা করেছিলেন। মিন্টুপুত্র তাবিথ আওয়ালের দুর্ভাগ্য যে তিনি নির্বাচনী প্রতীক পেয়েছিলেন স্থলগামী বাহন বাস। ২০০৪ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন ঢাকায় শেরাটন-শাকুরা ট্রাফিক জাংশনে পেট্রলবোমা ও গানপাউডারে আক্রান্ত একটি বাসের যাত্রীরা হতাহত হন। আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল এবং অভিযোগ ওঠে (অপ্রমাণিত) ওই বাস আক্রান্ত হয়েছিল বিরোধীদের দ্বারা। সেই তখন থেকে শেখ হাসিনা উপকারী বাহন বাসের অপকারী দিকটির সঙ্গেও পরিচিত হবার ফলে বাস বিষয়ে তার প্রচন্ড এলার্জি হয়। আর সেই এলার্জির শিকার তাবিথকে হতে হয়েছে সিটি নির্বাচনে। শেখ হাসিনা তার সমালোচনা শব্দসম্ভারে বাসকে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং বাস নিয়ে শব্দের খেলা করেন। ফলে পিতা মিন্টুর ফৃগেট গন্তব্যস্থানে পৌছাতে পারলেও পুত্র তাবিথের বাস গন্তব্যস্থানে পৌছাতে পারল না অন্তত এবার।

তবে তাবিথ সন্তুষ্ট হতে পারেন এটা দেখে যে তার এক প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রেসিডেন্ট পুত্র মাহী বি চৌধুরীর জামানত বাজেয়াফত হয়েছে। মাহী পেয়েছেন ১৩,৪০৭ ভোট। মাহী বলেছিলেন তাবিথ নাবালক এবং তার (মাহীর) পিছু পিছু তাবিথ ঘুরতেন। নাবালক তাবিথ মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করেও যখন এত ভোট পেয়েছেন, তখন সাবালক হলে এবং নির্বাচনে পূর্ণ অংশ নিলে কি হতে পারে, সেই দুশ্চিন্তায় হয়তো মাহী ভুগবেন। নির্বাচনী অভিযানে মাহীও পথে ঝাড়– নিয়ে নেমেছিলেন। মাহীর সান্ত ¦না এই যে, ভবিষ্যতে পথে ঝাড়– নিয়ে আনিসুলকে নামতে হলেও, তাকে (মাহীকে) এই অপ্রীতিকর কাজটি করতে হবে না।

ঢাকা সিটি উত্তরে মেয়র পদপ্রার্থী আরো যাদের জামানত বাজেয়াফত হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন অন্তত দুজন বামপন্থী, এক. কমিউনিস্ট পার্টি অফ বাংলাদেশ বা সিপিবি সমর্থিত আবদুল্লাহ আল কাফি (মোট প্রাপ্ত ভোট ২,৪৭৫) এবং দুই. গণসংহতি সমিতি সমর্থিত জোনায়েদ সাকি (মোট প্রাপ্ত ভোট ৭,৩৭০)। এ দুজনই ভালো পারফরম করে বিভিন্ন টকশোর দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। আদর্শবাদী হওয়া সত্ত্বেও তাদের আদর্শ যে কেন জনগণের বোধগম্য হচ্ছে না হয়তো সে বিষয়ে তারা এখন চিন্তা করবেন। অপর দিকে চরমোনাইয়ের পীরের সমর্থক প্রার্থী ফজলে বারী মাসউদ ১৮,০৫০ ভোট পেয়েছেন। নির্বাচনে ঢাকায় জামায়াত সমর্থিত ৩ জন নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে একজন ৩১,০০০ ভোট পেয়েছেন। ঢাকা দক্ষিনে জাতীয়পার্টি সমর্থিত প্রার্থী হাজি মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন পান ৪,৫১৯ ভোট। তার পক্ষে মন্ত্রীর মর্যাদায় থাকা শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নির্বাচনী আচরনবিধি লঙ্ঘন করে প্রচারণা চালান। তার সমর্থিত প্রার্থীর স্বল্প ভোটপ্রাপ্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এখন একটি ছোট আঞ্চলিক দলে পরিনত হয়েছে।

৩ অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন এই নির্বাচনের কোনো ফলাফলেরই প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। যা হয়েছে সেটা নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সংখ্যাবিন্যাস মাত্র এবং বিন্যাসটির পেছনে নির্বাচন কমিশনের যে মূলমন্ত্রটি কাজ করেছে সেটা হলো এক. ফলাফলকে যথাসম্ভব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যরূপে পেশ করা এবং দুই. নির্বাচনের মাঝপথে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন না করলে হয়তো বা জিততেও পারতেন, এমন একটা অর্জন-আশার বীজ বিএনপি ক্যাম্পে বপন করা।


এই ধারণা সত্য হোক, মিথ্যা হোক, ফলাফলসমূহের এই সংখ্যাবিন্যাসে এটা প্রতিপন্ন হয়েছে যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ ভোটার, মূলধারার দুটি পার্টিকে ভোট দেয়, অর্থাৎ বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে। অন্য কথায় বলা চলে, ভোটাররা এই দুই পার্টির দুই নেত্রীর কথায় ভোট দেয়। দেশের জন্য অতি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এই সত্যটা আওয়ামী লীগ নেত্রী বুঝতে চান না। তিনি রেকর্ড বাজিয়েই চলেছেন, বিএনপি নেত্রী ও বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন। এ ধরনের উক্তি তাকে করেছে আগের চাইতেও হালকা, অবিশ্বাস্য ও হাস্যাস্পদ।


চট্রগ্রাম সিটি কর্পরশেনের মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থী আ.জ.ম নাসির উদ্দিন। তিনি পেয়েছেন ৪৭৫,৩৬১ ভোট। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম পেয়েছেন ৩০৪,৮৩৭ ভোট।

৪ নির্বাচনের দিন বেলা সাড়ে এগারটার দিকে চট্টগ্রামে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তখন তার পাশে ছিলেন চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ। এর কিছু পরে বেলা বারোটায় ঢাকায় বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ এক প্রেস কনফারেন্সে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তারপর তার দুই পাশে অবস্থানরত দুইজন, আফরোজা আব্বাস (অনুপস্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাসের পক্ষে) এবং তাবিথ আওয়াল, নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। বলা যায় নির্বাচন নাটকের যবনিকা পতন এখানেই ঘটে।

৫ তবে মনজুর আলম আরো ঘোষণা দেন যে, শুধু এই নির্বাচন থেকেই নয় তিনি ভবিষ্যতের সব রাজনীতি থেকেও অবসর নিলেন। রাজনীতি থেকে মনজুর আলমের মতো একজন ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তির প্রস্থান শুধু যে চট্টগ্রামের রাজনীতি দুর্বৃত্তায়ন করার প্রক্রিয়াকে বেগবান করবে, তা নয়। বস্তুত সারা দেশে যারা ভদ্র ও সৎ ব্যক্তি তারাও সক্রিয় রাজনীতি থেকে ক্রমেই সরে দাড়াবেন, এমন দুশ্চিন্তা অনেকেই করছেন।
অন্য দিকে রাজনীতিতে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের আগমন হয়েছে উল্কার মতো আকস্মিক কিন্তু সূর্যের মতো স্থায়ী। অনেকের মতে, সিটি নির্বাচনের সবচেয়ে পজিটিভ দিক ছিল আফরোজার আবির্ভাব। নির্বাচনী ক্যামপেইনে আফরোজার ক্ষিপ্র পদক্ষেপ, দৃপ্ত বডি ল্যাংগুয়েজ, হিজাব-সালোয়ার-কামিজ পরিহিত হলেও ভোটারদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে কুশল বিনিময় ও তাদের হাতে লিফলেট দেওয়া, টিভি প্রশ্নকর্তাদের তাৎক্ষণিক ও টু-দি পয়েন্ট সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া, ভদ্র ও সহজবোধ্য মন্তব্য করা, এসবই আওয়ামী সমর্থিত তিন মেয়রপ্রার্থীকে ব্র্যান্ডিংয়ের দৌড়ে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছিল যদিও কোনোখানেই আফরোজা নিজে প্রার্থী ছিলেন না! ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, ভবিষ্যতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার কাছে যদি আফরোজাকে টেনে নিয়ে মহিলা দল সংগঠনের দায়িত্ব দেন তাহলে পার্টি লাভবান হবে।

৬ বিএনপি সমর্থিত তিন প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন ঘোষণার কাছাকাছি সময়ে আরো কিছু প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এরা ছিলেন জোনায়েদ সাকি , আব্দুল্লাহ আল কাফী এবং বজলুর রশীদ ফিরোজ।

কিন্তু এদের আগে বেলা সাড়ে এগারোটার দিক থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে তাদের পর্যবেক্ষকদের বিপদগ্রস্ত হতে দেখে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বা ক্রেডিবিলিটি (credibiliy) বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। পরদিন ২৯ এপৃল ২০১৫-তে ২৮টি পর্যবেক্ষণ সংস্থার ফেডারেশন ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (Election Working Group, EWG) বা সংক্ষেপে ইডাবলিউজি একটি প্রেস কনফারেন্স লিখিতভাবে জানায় :

ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডাবলিউজি)-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী নির্বাচনের দিন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নির্বাচনী অনিয়ম এবং সহিংসতার ঘটনায় ভরপুর ছিল। বিপুলসংখ্যক ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারার ঘটনা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটকক্ষ দখল এবং নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। পর্যবেক্ষিত অনেক ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলেও নানা ধরনের নির্বাচনী অনিয়মের কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সার্বিক সততা (integrity) ক্ষুন্ন হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা কর্তৃক নির্বাচন কমিশন থেকে পর্যবেক্ষণ কার্ড সংগ্রহে নানারকম প্রতিবন্ধকতার কারণে এবং এর ফলে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করতে জটিলতার কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সততা নস্যাৎ হয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনের দিনে সংঘটিত অপকর্ম এবং অনিয়মের কারণে ইডাবলিউজি এ নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য (credible) মনে করে না।

এই বিবৃতিতে ইডাবলিউজি কয়েকটি বড় অনিয়ম ও সহিংসতার লিস্ট দিয়ে আরো জানায় :

এসব অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত ব্যাপক সংখ্যক ঘটনার একটি অংশ মাত্র এবং এসব ঘটনার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিকল্পিতভাবে (systematically) তিন সিটি কর্পরেশনে যেসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটানো হয়েছে তা নির্বাচনী ফলাফলকে পরিবর্তনের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। অধিকন্তু এসব ঘটনার প্রতিটিই ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা, নির্বাচনী কর্মকর্তা, স্বীকৃত পর্যবেক্ষক, প্রার্থীর এজেন্ট এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে ঘটেছে।

ইডাবলিউজি’র অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংস্থার ১৪ জন পর্যবেক্ষককে (ঢাকা দক্ষিণ : ৭ জন, ঢাকা উত্তর : ৩ জন এবং চট্টগ্রাম : ৪ জন) ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ইডাবলিউজি’র ১৫ জন পর্যবেক্ষককে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হলেও পরে বের করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ইডাবলিউজি’র ৩৪ জন পর্যবেক্ষককে গণনাকক্ষে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পরেশনে ইডাবলিউজি’র কমপক্ষে দুইজন পর্যবেক্ষককে দুষ্কৃতিকারীরা মারধর করে। ইডাবলিউজি’র অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পর্যবেক্ষণ কার্ড গ্রহণ করা প্রকৃতপক্ষেই একটি চ্যালেঞ্জ ছিল, কোনো কোনো পর্যবেক্ষক নির্বাচনের দিন ভোর রাত (ভোর ১.০০টায়) কার্ড নিয়ে বাড়ি বা অফিসে পৌছায়। অন্য অনেক পর্যবেক্ষক কার্ড সংগ্রহ করতে না পারায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে বিরত থাকেন।

২৮ এপৃল ২০১৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে ইডাবলিউজি’র অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংস্থা, ১৭০০ পর্যবেক্ষক কার্ডের জন্য আবেদন করে। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে নির্বাচন কমিশন ১,৪১৪টি কার্ড প্রদানের অনুমোদন দেন, কিন্তু ৮২৮টি কার্ড দেয়া হয়। কার্ড দিতে বিলম্বের কারণে ইডাবলিউজি তিনটি সিটি কর্পরেশনে ৬১৯ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করতে সমর্থ হয়। ঢাকা দক্ষিণে পর্যবেক্ষক নিয়োগে নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের গতিবিধি নির্দিষ্ট কয়েকটি ওয়ার্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে (একটি বিশ্বাসযোগ্য পর্যবেক্ষণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট হচ্ছে পর্যবেক্ষকগণ যাতে অবাধে এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিনা বাধায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারে তা নিশ্চিত করা)। নির্বাচন কমিশন কোনোরকম নোটিস না দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশী পর্যবেক্ষকদেরও পর্যবেক্ষক কার্ড প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক এসব অনানুষ্ঠানিক অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও প্রতিবন্ধকতা আরোপের কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বিনষ্ট হয়েছে, নির্বাচনী অনিয়ম কমানোর পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পরিনামে সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা ক্ষুন্ন হয়েছে। (ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ, যোগাযোগ : ড. মো: আব্দুল আলীম, পরিচালক, ইডাবলিউজি সচিবালয়, ফোন : ০১৭৩৩৫৬৮০৪৪; ই-মেইল : aalim@ewgbg.org)

৭ ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ বা ইডাবলিউজি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৬-এ। এই প্রায় নয় বছরের পুরনো সংগঠনের প্রেস বিবৃতিতে যেটা উল্লেখ করা হয়নি সেটা হলো সিটি কর্পরেশন নির্বাচনসমূহ যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এমন সার্টিফিকেট অর্জনের লক্ষ্যে একটি নতুন পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নির্বাচন কমিশন অনুমোদন দিয়েছিল। ঢাকা সিটির দুই এলাকায় মোট ২,৭০০ অনুমোদিত পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ১,০০০ পর্যবেক্ষক ছিল মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (মওসুস) -এর সদস্য। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি তথাকথিত পর্যবেক্ষক ছিল এই ভূইফোড় সংস্থাভুক্ত। চট্টগ্রামে এই ভূইফোড় সংস্থার পর্যবেক্ষক সংস্থা ছিল ৫০০! এই সংস্থার বিপরীতে ঢাকা-চট্টগ্রামে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বহু বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সংস্থাসমূহ, যেমন : ডেমক্রেসিওয়াচ, ফেমা, জানিপপ, খান ফাউন্ডেশন প্রভৃতি পেয়েছিল খুব কম পর্যবেক্ষণ কার্ড। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য অখ্যাত ও অনভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠানকে ১,৫০০ পর্যবেক্ষণ কার্ড ইসু করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

৮ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষিত বুদ্ধিজীবীরা ইতিমধ্যে দাবি করেছেন এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারা বলেছেন, তার প্রমাণ, এই নির্বাচনে কেউ নিহত হয়নি। হ্যা, এই নির্বাচনের প্রায় সকল কেন্দ্রে কবরস্থানের শান্তি বিরাজ করেছে।

এই নির্বাচনে এমন শান্তি বিরাজের ভয়ে কোনো ভোট কেন্দ্রেই দীর্ঘ ভোটার লাইন দেখা যায়নি। সকালে বা দুপুরে নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পরেশনের নির্বাচন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তে বিএনপি জোট সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে কি ফল হতে পারতো। সিটি কর্পরেশনের তুলনায় ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্টেক ছিল অনেক বেশি কারণ ওই নির্বাচনে হারলে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হতো। সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে সেই স্টেক না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে তারা কি করতে পারে।

বস্তুত ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র পর থেকে বিএনপির একটি বড় অংশ মনে করছিল ওই নির্বাচনে তাদের অংশ নেওয়া উচিত ছিল এবং নির্বাচনে গেলে বিএনপি জোটই জয়ী হতো। ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমি ডিপ্লম্যাটদের অনেকে তাই মনে করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এদের সম্মিলিত সমালোচনা বিএনপির মধ্যে একটি বড় ফাটল সৃষ্টি করেছিল। খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ রেখেছিল। এখন ২৮ এপ্রিল ২০১৫-র সিটি কর্পরেশনের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ফলাফল খালেদা জিয়ার ওই সিদ্ধান্তকে ভিনডিকেট (Vindicate) করেছে। অর্থাৎ, তার সিদ্ধান্তই যে সঠিক ছিল সেটা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত করেছে। এখন বিএনপি’র সেই সব সন্দেহবাদি নেতাকর্মীরা বলছেন, সাধারণ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি ছিল একশভাগ ঠিক।

সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে আন্তরিকভাবে খালেদা জিয়া অংশ নিয়েছিলেন। ঢাকার বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার অভিযানে খালেদা জিয়া অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পথে নেমেছিলেন। তার গাড়ি বারবার আক্রান্ত হয়েছিল এবং গাড়ি গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি পথপ্রচার অভিযান চালিয়ে যান পরপর তিন দিন। এই সময়ে তার এবং তার নিরাপত্তা রক্ষীদের গাড়িসমূহের পাশের ও পেছনের কাচ ভেঙ্গে দেয় দুর্বৃত্তরা। তারা চেয়েছিল খালেদা জিয়া যেন ঘোষণা দেন তার পার্টি সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সড়ে দাড়াবেন। কিন্তু শেখ হাসিনার (যিনি বুলেট প্রুফ গাড়িতে চলেন এবং যার চলাচলের পথ এখন অতি সীমিত এবং সেই পথে তার আগমনের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য দীর্ঘ সময় সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়) তুলনায় খালেদা জিয়া যে অন্য ধাতুতে তৈরি মানুষ, সেই সত্যটা দুর্বৃত্তরা বুঝতে পারেনি। গাড়ি রিপেয়ারিংয়ের জন্য মাত্র এক দিন রেস্ট নিয়ে খালেদা জিয়া শেষ দিন অবধি আবারও গাড়িতে প্রচার অভিযান চালিয়ে যান রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত।

সুতরাং, এই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত লাভ হয়েছে, তিনি যে সাহসী ও সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন সেটা দেশবাসী এবং বিদেশীদের কাছে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। অন্য দিকে, শেখ হাসিনা তার ইমেজ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েও হারিয়েছেন বরং তার ইমেজ আরো নিচে নেমে গিয়েছে। তার অনুগত অনুসারীরাও অপ্রকাশ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন, সিটি কর্পরেশনের নির্বাচনকে পেশি ও কারচুপি মুক্ত রাখার নির্দেশ দিলে এবং সেটা বাস্তবায়ন হলে, তিনি প্রমাণ করতে পারতেন যে ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশ নিলে লাভবান হতো।

প্রসঙ্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সন্দেহবাদি বিএনপি নেতা-কর্মীদের বোঝা উচিত। ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে সেটা হতো শেখ হাসিনার টেইলর মেইড (tailor made) সংবিধান মোতাবেক যে সংবিধান শেখ হাসিনা নিজের মাপে নিজের দর্জিদের দিয়ে বানিয়েছেন। এই সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত ঘোষিত হবার পরে বিএনপির পক্ষে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলা অসম্ভব হতো। খালেদা জিয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে এখন বিএনপি আরো ন্যায়সঙ্গত ও জোরালোভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন দাবি করতে পারবে।


এ জন্যই বলা যায় সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘বিজয়ী’ হলেও, ট্যাকটিকাল বা কৌশলী বিজয় হয়েছে বিএনপির। কলংকিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েও এক দিন পরেই নির্বাচন কমিশনের সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে সত্যিই মেরুদন্ডহীন ব্যক্তি রূপে প্রমাণিত করেছে। তিনি অনুচ্চারিতভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন যে তিনি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নন।

৯ এই নির্বাচনে শেখ হাসিনা ষড়ঋতু তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। তিনি প্রায়ই মনে করিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ এবং তাই বাংলাদেশের অধিবাসীদের মনে থাকে না আগের ঋতুতে কি হয়েছিল।
২০১৫-র জানুয়ারি-মার্চ, তিন মাসের আন্দোলনে যাত্রীবাহী বাস-কোচ-গাড়িতে পেট্রল বোমায় অগ্নিদগ্ধ শতাধিক ব্যক্তির হতাহত হবার নির্মম ঘটনাবলী বাংলাদেশিরা ভুলে গিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিলে অন্যায় হবে এমন কথা শেখ হাসিনা তার ষড়ঋতু তত্ত্বতে বোঝাতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশিরা সমষ্টিগতভাবে ডিমেনশিয়া অথবা আলঝেইমার রোগে (স্মৃতিশক্তি দুর্বল অথবা লুপ্ত হবার রোগে) ভুগছে এমন অভিযোগ করলেও শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে তেমন রোগে ভোগেন না। আওয়ামী সংস্কারপন্থীদের (যাদের কেউ কেউ এখন মন্ত্রিসভার কালোকোট শোভা বর্ধন করছেন) বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আই শ্যাল ফরগিভ, বাট আই শ্যাল নট ফরগেট’ (আমি তাদের ক্ষমা করব, কিন্তু বিষয়টি ভুলব না)। তবে কি শেখ হাসিনা বাংলাদেশি নন? তিনি কি তারই প্রচারিত ষড়ঋতু তত্ত্বের ঊর্ধ্বে? এটাও তো হতে পারে তার ষড়ঋতু তত্ত্ব ভুল। বাংলাদেশিরা মনে রাখে যেমনটা শেখ হাসিনা নিজেই রেখেছেন।
বাংলাদেশিরা মনে রাখতে পারে আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী অবস্থানে থেকে আন্দোলন করছিল তখন শুধু শেরাটন-শাকুরা ট্রাফিক জাংশনে পেট্রল বোমাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু ভাংচুর হয়েছিল। এসব ধ্বংসাত্মক কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ছিল চট্টগ্রামের নবনির্মিত রেলওয়ে টার্মিনাল বিধ্বস্ত করা।

১০ প্রশ্ন উঠেছে শুধু এই নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বের আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নয় গত ৪৪ বছরে এই দুর্ভাগা দেশকে যেসব মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তার জন্য দায়ী কে?

বাংলাদেশের মানুষের মনে পড়েছে :
 ১৯৭১-এ অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকার ফলে ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল - সংখ্যাপ্রেমী আওয়ামী লীগের হিসাব মতে।
 ১৯৭১-এ অরক্ষিত অবস্থায় থাকার ফলে ২ লক্ষ নারী ধর্ষিতা হয়েছিল - সংখ্যাপ্রেমী আওয়ামী লীগের হিসাব মতে।
 ১৯৭২-১৯৭৫-এ রক্ষীবাহিনীর হাতে ৪০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছিল - জাসদের দাবি মতে।
 ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে মুক্তিযুদ্ধের তিন গুণ বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক নিয়ামত ইমাম এবং আরো অন্যান্যদের মতে। এদের মতে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৬০,০০০ থেকে ২৬৯,০০০ প্রায়। সে ক্ষেত্রে এদের মতে দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ১৮০,০০০ থেকে ৮০৭,০০০-এর মধ্যে।
 ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত বহু ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নিহত, গুম, জেলবন্দি, রিমান্ড নির্যাতিত এবং মামলা পীড়িত হয়েছেন। শত সহস্র নেতা-কর্মী-সমর্থক ফেরারি জীবন যাপন করছেন।

বাংলাদেশের মানুষ যদি সত্যিই ষড়ঋতু রোগে ভোগে তাহলে আওয়ামী লীগের বহু দুষ্কর্ম তারা ভুলে যাবে (তখন বিএনপি ছিল না) এবং তার ফলে আজকের আওয়ামী লীগ লাভবান হবে। সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে কয়েক লাখ ভোটের জন্য ষড়ঋতু তত্ত্ব প্রচার করে দেশের সাধারণ নির্বাচনে (যদি কখনো হয়) কয়েক কোটি ভোট হারানোর সমূহ সম্ভাবনার বিষয়টি শেখ হাসিনা হয়তো মনে রাখবেন।


একটি দুর্ভাবনা
১ শেখ হাসিনার শাসন আমলে (২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত) বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি নির্বাচন কমিশন দলীয় করণের নির্লজ্জ প্রচেষ্টা অব্যাহত থেকেছে। সিটি কর্পরেশনের তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী সমর্থিত তিনটি প্রার্থীকেই যে কোনোভাবে বিজয়ী করার সকল পদক্ষেপ আওয়ামী লীগ নিয়েছে। যদিও, আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট তার টুইটারে বলেছেন, ’উইনিং অ্যাট এনি কস্ট, ইজ নো ভিক্টরি অ্যাট অল’ (Winning at any cost, is no victory at all - যেকোনো মূল্যে জেতা, কোনো জয় নয়) তবুও রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে দেশে ছদ্মবেশি এক দলীয় শাসন দৃঢ়ভাবে কায়েম করার দিকে আওয়ামী লীগ আরেকটা সাফল্য অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা, মন্ত্রী ও শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদ-এর কন্যা শারমিন আহমদ, ‘তাজউদ্দীন আহমদ : পিতা ও নেতা’ বইয়ে লিখেছেন :
বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আব্বু তার চূড়ান্ত মতামত মুজিব কাকুকে জানিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত সচিব আবু সাঈদ চৌধুরীকে সাক্ষী রেখে তিনি মুজিব কাকুকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনাকে আমি অনেকবারই বলেছি আমার দ্বিমতের কথা। আর আজ আমার চূড়ান্ত মতামত দিচ্ছি। আমি আপনার এই একদলীয় শাসনের সঙ্গে একমত নই... বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার হাতে এতই ক্ষমতা দেওয়া আছে যে, সেই ক্ষমতাবলে দেশে একদলীয় ব্যবস্থা বা আর কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমরা বক্তৃতায় সব সময় বলেছি একটি সুখী সমৃদ্ধশালী দেশের কথা, যার ভিত্তি হচ্ছে গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্রের গুণগান করেছি আমরা সব সময়, আজকে আপনি একটি কলমের খোচায় সেই গণতন্ত্রকে শেষ করে দিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন বাই টেকিং দিস স্টেপ ইউ আর ক্লোজিং অল দি ডোরস টু রিমুভ ইউ পিসফুলি ফ্রম ইয়োর পজিশন।’ (অর্থাৎ, এই পদক্ষেপ (এক দলীয় শাসন) নিয়ে, আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সব শান্তিপূর্ণ পথই আপনি বন্ধ করে দিচ্ছেন)।

সিটি কর্পরেশন নির্বাচনের পর যে দুর্ভাবনাটি দেশের মানুষকে গ্রাস করেছে, সেটি হলো, শেখ মুজিবুর রহমানকে সদুপদেশ ও সতর্কবাণী দেওয়ার মতো ব্যক্তি তাজউদ্দীন আহমদ তার পাশে ছিলেন। কিন্তু এখন সে রকম কোনো বাস্তবমুখী, দূরদর্শী ও সাহসী ব্যক্তিকে শেখ হাসিনার পাশে দেখা যাচ্ছে না।

২৬ এপ্রিল ২০১৫তে লন্ডনে প্রভাবশালী দৈনিক ফিনানশিয়াল টাইমস “বাংলাদেশ আর্মি ফানডেড টু ফরগেট ইটস রোল অ্যাজ নিউট্রাল রেফারি” (Bangladesh army funded to forget its role as neutral referee বা নিরপেক্ষ ভূমিকা ভুলে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ আর্মিকে টাকা দেওয়া হয়েছে) শীর্ষক সুদীর্ঘ রিপোর্টে (গুগল সার্চ - Financial Times, London-এ পাওয়া যাবে) একই উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কি বিচিত্র বৈপরীত্য! একদিকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশি ভোটারদের অভিযুক্ত করছেন তারা স্মৃতিবিভ্রমে ভুগছে - অন্যদিকে ফিনানশিয়াল টাইমস-এর মতে বাংলাদেশি সেনাদের পেছনে টাকা খরচ করে তাদের স্মৃতিবিভ্রম ঘটানো হচ্ছে!

বোধগম্য কারণে এই রিপোর্ট প্রকাশে বাংলাদেশের মিডিয়া সাহসী হয়নি। এই রিপোর্টের মূল বাণী হচ্ছে, কৌশলের খেলায় আপাতত শেখ হাসিনার বিজয় হলেও, গণতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে, এই বিজয় হতে পারে সাময়িক মাত্র। তাজউদ্দীন আহমদের সুচিন্তিত মতামতকে শেখ মুজিবুর রহমান উপেক্ষা করেছিলেন। তার পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ কিন্তু অবধারিত।
মর্মান্তিক কিন্তু অনিবার্য।

শেখ হাসিনা ও বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দেশি ও বিদেশি গণতান্ত্রিক সদুপদেশের বাইরে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাহলে পরিণতি কি হতে পারে?

২ মে ২০১৫

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.