ঢাকা, বুধবার,২৬ এপ্রিল ২০১৭

প্রিয়জন

প্রাণের মেলা বইমেলা

শওকত আলী রতন

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শুরু হয়েছে বাঙালির প্রাণের মেলা বইমেলা। ভাষা আন্দোলনের বীরশহীদদের স্মৃতিতে বাংলা একডেমির উদ্যোগে মাসব্যাপী গ্রন্থমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৮৪ সাল থেকে মেলার নামকরণ করা হয় অমর একুশে বইমেলা।
বইমেলার জন্য সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন এ দেশের সাহিত্যপ্রেমী গুণীজনেরা। অবশেষে যখন বইমেলা কড়া নাড়ে দরজায়, তখন অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন প্রকাশক সংস্থাগুলো। জ্ঞানের তৃষ্ণাকে মেটাতে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন বইপ্রেমীরা। তাই বছরের অন্য সময়গুলোর চেয়ে ফেরুয়ারি মাসে কাজের ব্যস্ততা বেড়ে যায় বহুগুণে। এসময় বাংলা একাডেমি প্রান্তর পরিণত হয় লেখক ও ভক্তদের এক মহামিলন মেলায়; যা শুধু মেলা এলেই চোখে পড়ে।
ভাষার মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক প্রাবন্ধিক, অভিনেতা অভিনেত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক কর্মী, খেলোয়াড়সহ অন্যান্য পেশাজীবী মানুষের পদচারণা যেন চিরচেনা রূপে পরিণত হয়। এ ছাড়া বাংলা ভাষাভাষী মানুষ মেলায় ছুটে আসেন দূর প্রবাস থেকে। এ বছর রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় মেলা দর্শনার্থীর সংখ্যা ও বিক্রি সন্তোষজনক হবে। মেলার প্রথম দিকে বিক্রি কম হলেও ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ছে বলেও জানা যায়। মেলার শেষের দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকায় বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই শেষ দিকে বেচাবিক্রিতে মনোযোগ দেন অনেকেই। এ বছর মেলায় শিশুতোষ স্টলগুলোতে বই বিক্রি হচ্ছে তুলানামূলক বেশি। ছুটির দিনগুলোয় শিশু-কিশোরেরা মা-বাবার হাত ধরে মেলায় আসেন।
বইমেলা শুরু থেকেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ থাকলে ২০১৫ সাল থেকে বাংলা একাডেমি থেকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বেশির ভাগ স্টলই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ বছর বইমেলায় মোট ৬৬৩টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে ১১৪টি এবং সোহরাওয়াদী উদ্যান অংশে ৩২৯টি ইউনিট দেয়া হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১২টি চত্বরে সজ্জিত করা হয়েছে।
এরই মধ্যে মেলা থেকে বই সংগ্রহের জন্য মেলায় আসার দিনক্ষণ ঠিক করে রেখেছেন অনেকে। আশা করা হচ্ছে এবারের মেলা জাঁকজমকপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন প্রকাশকেরা। প্রিয়জনকে বই উপহার দেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন বইপ্রেমীরা। তবে বরাবরের মতো এবারো দেশের প্রথিতযশা লেখকদের বই বিক্রি বেশি হবে মনে করছেন অনেকেই। প্রকাশকেরা মনে করেন, আগের চেয়ে দিন দিন পাঠকেরা বইয়ের প্রতি ঝুঁকছেন ও বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে সাধারণ মানুষের।
এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। জানা যায়, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা বই। এসব বই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান নিজ উদ্যোগে। ১৯৭৬ সালে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন বইমেলার প্রতি। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি; এ সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করেন। ১৯৮৪ সালে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয় । সেই ৩২টি বইয়ের ক্ষুদ্র মেলা কালানুক্রমে বাঙালির সবচেয়ে স্বনামধন্য বইমেলায় পরিণত হয়েছে। মেলা শুরুর কয়েক দিন আগ থেকে ঠিক করা হয় প্রকাশনীগুলোর স্টলগুলো। প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্নার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি এলাকা বিভাজন করে স্থান বরাদ্দ দেয়া হয়। এ ছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষাশহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নামে ভাগ করা হয়। এ মেলায় দেশের খ্যাতনামা সব প্রকাশনী, বই বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বাইরে, যেমন ভারত, রাশিয়া, জাপান থেকেও নানা প্রকাশনা সংস্থা অংশগ্রহণ করে। এ মেলায় সরকারেরও বহু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, যেমন- বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর তাদের স্টল নিয়ে অংশ নেয়। বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও অংশ নেয়। এ বছর বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণে বৃহৎ পরিসরে দু’টি স্টল বসানো হয়েছে। ক্রেতারা সাধারণত বাংলা একাডেমির বই ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ রয়েছে বাংলা একাডেমির স্টল, যেখান থেকে সারা বছরই পাঠকেরা বই কিনতে পারেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকবে। শিশু কর্নারে এবার নতুন সংযোজন মাতৃদুগ্ধ সেবাকেন্দ্র। রয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি ক্যান্টিন এবং বাংলা একাডেমির অংশে আরো দু’টি ক্যান্টিন চালু করা হয়েছে। বই দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকাকে সিসি টিভির আওতায় আনা হয়েছে, সেই সাথে মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থা নিয়োজিত আছে। আসুন এবং সময় করে ঘুরে যান, প্রাণের মেলা অমর একুশে বই মেলায়।
দোহার প্রিয়জন

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫