ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ মার্চ ২০১৭

আলোচনা

আমাদের বইমেলা এবং বইয়ের গুরুত্ব

ড. আশরাফ পিন্টু

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১২


প্রিন্ট

বিশিষ্ট লেখক সরদার জয়েন উদ্দীন। তিনি এক অভিনব পদ্ধতিতে বইপড়ার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। আর তা হলো- একটা গরুর গায়ে কাগজ সেটে তাতে লিখে রেখেছিলেন, ‘আমি বই পড়ি না।’ অর্থাৎ যারা গরু বা গরু জাতীয় প্রাণী তারা বই পড়ে না। আর মানুষ যারা তারা অবশ্যই বই পড়বে। তিনি গরুর গায়ে এমন নীরব প্রতিবাদস্বরূপ কথা লিখে বোধ হয় এমনটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন।
বইপড়া বা বইয়ের গুরুত্ব মানবজীবনে অপরিসীম। বই-ই মানবজীবনকে উন্নত করে। রুচিশীল করে। বইপড়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যতই অত্যাধুনিক ইলেকট্রো মিডিয়া তথা অনলাইন পত্র-পত্রিকা পঠন, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ বুলাই বা ব্যবহার করি না কেন বইপড়ার মতো মজা তাতে নেই। নতুন বইয়ের গল্পই অন্য রকম। বই চিত্তলোকের সাথে আত্মিক সম্পর্ক ঘটিয়ে আনন্দের যে অনন্তলোকে নিয়ে যায়, সে আনন্দ ঐ ইলেকট্রো মিডিয়াগুলো দিতে পারে না। পারে না দিতে বই পাঠের তৃপ্তি। কাগজে লিখিত জিনিসের যে গুরুত্ব তা তো কালজয়ী- তা ইলেকট্রো মিডিয়ার মতো স্বল্প সময়ে বা হঠাৎ কোনো যান্ত্রিক গোলোযোগে নষ্ট হয় না বা একেবারে উধাও (ডিলিট) হয়ে যায় না। ঘরের শোভা বৃদ্ধি করে বই। বই কাগজে ছাপা বলে বহু বহু যুগ স্থায়িত্ব লাভ করে। চোখে আনন্দ দেয়। ধরলে প্রশান্তি জাগে মনে। তাই তো কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার চোখ ঘোলা হয়ে যাবে কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা- যদি তেমন বই হয়।’ সত্যিই বই চির যৌবনের আনন্দে জোগ থাকে।
বইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘‘মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।’’ আর আমাদের ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ পাঠক, প্রকাশক ও বইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। তৈরি করেছে এক ধরনের আনন্ধঘন পরিবেশ। এক সময় প্রকাশ করা সারা বছর ধরে বই প্রকাশ করতেন। অর্থাৎ বইমেলার জন্য তারা বসে থাকতেন না। এতে কি মেলার চেয়ে (মাত্র এক মাসের চেয়ে) বেশি বই বিক্রি হতো? সম্ভবত না। এখনো মেলা ব্যতীত কিছু বই প্রকাশ হয় কিন্তু এক মাসের মেলায় আমাদের যত বই বিক্রয় হয় তার সিকি ভাগও মেলা ব্যতীত বাকি এগারো মাসে বিক্রয় হয় কি না সন্দেহ। আবার প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তাই প্রায় সব বই-ই ফেব্রুয়ারি মেলা উপলক্ষে প্রকাশ পায়। আর এ জন্যেই বইমেলা আমাদের আত্মার মেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে- যে মেলায় শুধু বিক্রয়ই নয়, প্রকাশক-লেখক-পাঠকের সাথে এক আত্মিক যোগাযোগ ঘটে এবং সেই সাথে ঘটে আত্মার উন্নতিও। লেখক পাঠকের পারস্পরিক মতবিনিময়, চিন্তার আদান-প্রদান এবং একে অপরের কাছাকাছি আসারও এক মহা আয়োজন।
বই থেকে আবার বইমেলাতে ফিরে যাই। বাংলা একাডেমির বটতলায় বইয়ের একটি ছোট্ট পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন মুক্তধারা (পুঁথিঘর লি.)-এর প্রকাশক বাবু চিত্তরঞ্জন সাহা। সেই দিন যে বইমেলার অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল আজ তা ফুলে-ফলে শোভিত হয়ে মহীরুহ হয়ে উঠেছে। তাই আজকের মেলা হয়ে উঠেছে সর্বজনীন আনন্দোৎসব। যার গুরুত্ব এবং বিস্তার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। শুধু ঢাকাই নয়, পাবনা, বগুড়া, খুলনা, রাজশাহীসহ আরো অনেক শহরে ‘অমর একুশে বইমেলা’ হচ্ছে।
অন্য শহরগুলোতে মাসব্যাপী মেলা না হলেও পাবনাতে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (পুরো এক মাস) অমর একুশে বইমেলা উদযাপিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে হয়তো এমন দিন আসবে আমাদের ৬৪ জেলাতেই মাসব্যাপী বইমেলা উদযাপিত হবে। এর পর হয়তো ছড়িয়ে পড়বে উপজেলা এবং গ্রাম পর্যায়ে। সেই দিন হয় তো বেশি দূরে নয়। তবে এর সাথে আরো একটি কথা হলো- বইমেলার বিস্তৃতি হবে হোক; সেই সাথে প্রয়োজন ভালো বই প্রকাশের- যার নিশ্চয়তা দিতে হবে আমাদের প্রকাশকদের; তবেই আসবে আমাদের সর্বক্ষেত্রে সাফল্য।
ভালো বই পাঠকের হাতে তুলে দেয়ার বিষয়ে লেখকদেরও প্রতিশ্রুতি নিতে হবে। প্রকাশক যেমন ভালো বই প্রকাশ করার আয়োজন করবেন। লেখককেও ভালো বই লেখার পণ করতে হবে। লেখক ভালো লিখলে প্রকাশক তা-ই ভালোভাবে প্রকাশ করবে। এভাবে লেখক প্রকাশকের যৌথ চেষ্টায় পাঠক পাবেন একটি মানসম্মত নন্দিত বই। যা পাঠ করে একজন পাঠক ঘটাবেন নিজের আত্মার উন্নতি। বই পাঠের আনন্দ অন্য রকম আনন্দ। এ আনন্দের সাথে আরো কোনো আনন্দের তুলনা নেই।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫