ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ এপ্রিল ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতিতে রক্তক্ষরণ

আলফাজ আনাম

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:০৬


আলফাজ আনাম

আলফাজ আনাম

প্রিন্ট

রাজনীতির মাঠে এখন ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রতিপক্ষ নেই। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এক রকম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ ছাড়া তো রাজনীতি চলে না। এর পরও সারা দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এক ধরনের চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। নেতাকর্মীরা সরব। দেশে চলছে ‘উন্নয়নের’ রাজনীতি। এই রাজনীতির সামনের কাতারে আসার জন্য দলের মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কারণ, উন্নয়নের খরচের চুইয়ে পড়া অর্থের একটি অংশের ‘হকদার’ মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। এখানে যার ক্ষমতা ও প্রভাব বেশি, তার পকেটে অর্থের সমাগম হবে বেশি।
ব্যক্তিস্বার্থ আর অঞ্চলভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এখন অনেক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিরোধী দলকে প্রতিরোধে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন। সাথে ছিল পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভোট ছাড়া এই নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যত দেশে একদলীয় শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। এরপর ক্ষমতাসীন দলের টার্গেট ছিল স্থানীয় সরকারের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে রাজনৈতিক পরিচয়ে হতো না। ফলে এসব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতা বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ততটা দৃশ্যমান ছিল না। কিন্তু তৃণমূলপর্যায় থেকে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কৌশলের অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এর আরেকটি লক্ষ্য ছিল স্থানীয় পর্যায় থেকে বিরোধী দলকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলা।
বিরোধী দলবিহীন রাজনীতির কৌশল এখন ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ক্ষেত্র তৈরি করা হয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বিরোধী দলের প্রার্থীরা যে স্থানীয় সরকারে জিততে পারবেন না, সেই বার্তা ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে ছিল স্পষ্ট। ফলে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচনের সময় এদের পরিচয় ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশের বেশি পদে আওয়ামী লীগের এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী ছিলেন না। কারণ, এই নির্বাচন ছিল আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্র্যাসির স্টাইলে। অর্থাৎ স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন। দেখা যাচ্ছে, ৩৯টি জেলা পরিষদ নির্বাচনে ১৩টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এর আগে গত বছরের মার্চ মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথম ধাপে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদের ৪১২টিতে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনের মাঠে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছে। এ নিয়ে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, তার জের এখনো চলছে। আগামী দিনে যেকোনো নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের এই বিরোধ আরো বাড়বে। কার্যত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগ এখন বহুভাগে বিভক্ত। ক্ষমতাসীন দলের এক পক্ষ আরেক পক্ষকে প্রতিরোধ করছে।
স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত হওয়ার প্রথম অর্জন হলো, এলাকার কর্তৃত্ব নিজের পক্ষে চলে আসা। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জলমহাল ও বালুমহাল দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কিংবা জমি বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের দখল ও নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ক্ষমতাবান এসব শক্তির কাছে। ফলে অবৈধ এসব সুযোগ সুবিধা নেয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এখন খুনোখুনির পরিমাণ বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, গত বছর সারা দেশে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোন্দলে মারা গেছে ৮৩ জন। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি দুনিয়ার আর কোনো রাজনৈতিক দলে ঘটে কি না সন্দেহ আছে।
দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, এসব সহিংসতায় শুধু নিজেদের দলের নেতাকর্মীরা মারা যাচ্ছেন তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। সর্বশেষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সহিংসতার সময় স্থানীয় একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের দাবি- শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মিরু নিজের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করেছেন। পৌরমেয়র জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। শাহজাদপুর আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বে মিরু ছিলেন একটি পক্ষ। এখন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার। অপর দিকে পুলিশ মিরুকে রাজধানী থেকে গ্রেফতার করেছে। প্রশ্ন হলোÑ মিরু এবং তার সহযোগীরা যখন গুলি ছুড়ছিলেন, তখন পুলিশ কী করছিল? গণমাধ্যমে খবর এসেছে, দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এর আগে আমরা বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশকে নির্বিচারে গুলি ছুড়তে দেখেছি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রাস্তায় ধরে পায়ে গুলি করার ছবি বহুদিন সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু একজন সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার পরও পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে এই আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেফতার করার সাহস দেখাতে পারেনি।

একজন মিরু বা নূর হোসেন হয়তো শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু এ রকম শত শত মিরু ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছেন

লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, সারা দেশে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যারা নিহত হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বা গুলিতে মারা গেছে। আমরা এর আগে মাগুরায় মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার নির্মম ঘটনা দেখেছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাদের প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়ার দৃশ্য সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে অনুমান করা যায়, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে বিপুলসংখ্যক বৈধ বা অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের হাতে কী পরিমাণ অস্ত্র আছে, তার ধারণা পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ওয়ার্ড কমিশনার ও সাত খুনের মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। পরে এসব অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনে কতটা প্রভাব থাকলে একজন ব্যক্তি এতগুলো অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। নূর হোসেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। তার হত্যাপরিকল্পনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে নি¤œ আদালতে র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১১ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নূর হোসেন আর মিরুর মতো ব্যক্তিরাই স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আছেন। এদের হাতে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যখনই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তখন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, এসব ঘটনার দায় দল নেবে না। অবশ্যই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থান প্রশংসনীয়। তিনি এর মাধ্যমে বোঝাতে চাইছেন যে, সন্ত্রাসীদের পক্ষে দলের কোনো অবস্থান নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিরু ও নূর হোসেন তৈরি হয়েছেন দলকে ব্যবহার করে। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে কখনোই এরা এতটা প্রভাবশালী হতে পারতেন না। আসলে এসব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী যখন বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করেছেন, তখন তাদের আশকারা দেয়া হয়েছে। এখন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করছেন। প্রকৃত অর্থে যদি এসব অপরাধীর দায়িত্ব দল নিতে না চায়, তাহলে উচিত হবে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান চালানো। একই সাথে যারা অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন, তাদের লাইসেন্স বাতিল করা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কম-বেশি পুলিশের নিরাপত্তা পাচ্ছে, এর পরও কেন তাদের অস্ত্রের প্রয়োজন হচ্ছে তা একটি বড় প্রশ্ন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের একজন অস্ত্রধারী জনপ্রতিনিধির গুলিতে একজন সাংবাদিক নির্মমভাবে নিহত হলেন। এই সাংবাদিকের রক্তে ভেজা পরিচয়পত্রের ছবি পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এমন জনপ্রতিনিধি দিয়ে নিপীড়নমূলক শাসন কায়েমে সাংবাদিকদের ভূমিকা কম নয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিনাবিচারে হত্যা কিংবা পায়ে গুলি করে পঙ্গু করার মতো ঘটনার পক্ষে টেলিভিশনের টকশোতে এ দেশের অনেক সাংবাদিক সাফাই গেয়েছেন। দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, পুলিশের সামনে একজন সাংবাদিক নিহত হলেও পুলিশ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি।
দেশে বিরোধী দল ও মতবিহীন রাজনীতির যে পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, এর মূল্য ক্ষমতাসীন দলকে আগামী দিনে আরো বেশি দিতে হবে। কারণ দেশজুড়ে দলের মধ্যে যে বিভক্তি ও বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে, তা দিন দিন আরো বাড়তে থাকবে। রাজনৈতিক যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করেছেন ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে পেশিশক্তির অধিকারীরা। যারা এখন দলের প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে চাইছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এখন হয় জেলে অথবা এলাকাছাড়া; না হয় পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনো মতে রাজনীতির বাইরে থেকে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। মামলার ঘানি টানতে অনেকে হয়ে পড়েছেন নিঃস্ব। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারের মেয়াদ বাড়ানো যায়, কিন্তু এর প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বিপজ্জনক। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে খুনোখুনি এর একটি আলামত মাত্র। একজন মিরু বা নূর হোসেন হয়তো শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু এ রকম শত শত মিরু ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছেন। এদের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, শেষ পর্যন্ত তাদের রক্ষা করা দলের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে একদলীয় শাসনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার নজির কম নয়। কিন্তু এর শেষ পরিণতি কখনোই সুখকর ছিল না। বিরোধী দল না থাকলেও দলের ভেতর থেকে ক্ষমতার পাটাতন দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। 

alfazanambd@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫