শত্রু

মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী

নদীর পাড়ে এক মস্ত বড় জামগাছ। এই গাছের জাম যেমন বড়, তেমন সুস্বাদু। একবার খেলে অনেক দিন মনে থাকে। কিন্তু এই জাম খাওয়ার তেমন কেউ নেই। এই গাছে বাস করে দুই বানর। একজন দাদা আরেকজন নাতি। এ দু’জনই গাছের জাম ফেলে-ছুড়ে খায়। এই নদীতে বাস করে এক বুড়ো কুমির। নদীর পাড়ে শুয়ে রোদ পোহায়। গাছের নিচে পড়া জাম খায়। যদি কখনো বানরের কাছে দু-একটা জাম চায়, জাম তো দেয়ই না; বরং নাতি বানরটা ভেংচায়। দাদা তাকে বারবার সাবধান করে দেয় অযথা শত্রুতা বাড়াসনে। নাতি কথা শোনে না। বলে, কুমির আমাদের কী করতে পারবে? আমরা গাছে থাকি। কুমির আমাদের কোনো দিন ধরতে পারবে না। কুমিরকে মাঝে মধ্যেই সে নানাভাবে নির্যাতন করে। একবার কুমির ওপরের দিকে তাকিয়ে একটি জামের জন্য খুব অনুনয়-বিনয় করছিল। নাতি বানরটা তাকে ফাঁকি দিলো। কুমিরকে বলল, ‘তুমি হাঁ করো; আমি পাকা পাকা জাম তোমার মুখে ফেলব।’ কুমির মস্তবড় হাঁ করল। অমনি একটি মরা ডাল ভেঙে মুখের ভেতর নিক্ষেপ করল। কুমিরটা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। বানরটা দাঁত কেলিয়ে হাসতে লাগল। বানরের বানুরে কাজে কুমির খুব ব্যথা পেল। রাগে কটর কটর করে দাঁত কামড়াতে লাগল। এটি দেখে বানরটা আবার গা জ্বালানো একটা হাসি দিলো। মনে মনে কুমির প্রতিজ্ঞা করল, ‘যে করেই হোক তাকে উচিত শিক্ষা দেবে।’
নদীর মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপ জেগেছে। খুব নয়নাভিরাম। সবুজে সবুজে ছাওয়া। এখানে-সেখানে ফুটে আছে নাম না জানা অসংখ্য জংলি ফুল। লতানো গুল্মে চার দিক ছাওয়া। হাতেগোনা কয়েকটি গামাইর গাছ, দু’টি নারকেল গাছ ও তাদের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি জামগাছ। গাছে গাছে পাখিদের কলতান। দেখে মনে হয় কোনো স্বপ্নপুরী। এই দ্বীপ দূর থেকে দেখে বানর দুটো। খুব যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তারা সাঁতার জানে না। মাঝে মধ্যেই তাদের আফসোস হয়Ñ এত সুন্দর দ্বীপে যাওয়া হলো না। একদিন কুমিরটা বানরকে একটি টোপ দিলো। বলল, ‘জানো, ওই দ্বীপটা কত সুন্দর! একবার গেলে আর আসতে চাইবে না। তা ছাড়া ওখানকার গাছের জামও অনেক মজার।’ কুমিরের কথা শুনে বানর খুশি হলো। একবুক হতাশা নিয়ে বলল, ‘আমি তো সাঁতার জানি না।’ এবার কুমির একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, ‘এটি কোনো ব্যাপার হলো! আমার পিঠে চড়লে এক নিমিষে নিয়ে যাবো।’ বানরের মন গলে গেল। সে তার দাদুর দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। তার দাদু ইশারায় না করল। নাতি বানরটা বলল, ‘আজ যাবো না। আরেক দিন যাবো।’ কুমিরের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। কুমিরটা লেজ নেড়ে নেড়ে চলে গেল।
এবার দাদু বানরটা বলল, ‘শত্রুকে কখনো সুযোগ দিবি না। কখনো বন্ধু ভাববি না। শত্রু ক্ষতি করতে পারে। কারণ শত্রু থেকে সবাই সাবধান থাকে। যখনই বন্ধু ভাববি, সে ক্ষতি করার সুযোগ পাবে। তুই তাকে আঘাত করেছিলি। আঘাত কেউ কখনো ভোলে না। মনে তীরের মতো বিঁধে থাকে। সুযোগ পেলেই ভয়াবহ রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসে। তাকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। সুযোগ পেলে সে ভয়াবহ প্রতিশোধ নেবে।
পরদিন কুমিরটা আবার এলো; কিছু পাকা জাম নিয়ে। জামগুলো খুবই টসটসে। দেখে জিবে পানি এসে যায়। কুমির বলল, ‘জামগুলো আমি কুড়িয়ে এনেছি। গাছের জামগুলো আরো সুন্দর। তুমি গেলে ভালো হতো। জামগুলো পেড়ে খাওয়া যেত।’ তার কথায় নাতি বানরটা খুব লোভাতুর হলো। মনে মনে ভাবল, তার দাদুর বয়স হয়ে গেছে। বুদ্ধি লোপ পেয়েছে, নইলে কুমিরের মতো বন্ধুকে অবিশ্বাস করতে বলবে কেউ! কুমিরের কথায় সে রাজি হয়ে গেল। গাছ থেকে নেমে এলো। কুমির পানিতে নেমে পিঠ ভাসিয়ে রাখল। বানর লাফ দিয়ে পিঠে উঠে বসল। ওঠার সাথে সাথে কুমির কুলকুল করে একটা হাসি দিলো। হাসিটা বানরের মোটেও ভালো লাগল না। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। ভাবতে ভাবতেই অনেক দূর চলে গেল।
নদীর মাঝখানে যেতেই বানর বুঝে গেল, সে বড় ভুল করে ফেলেছে, যে ভুলের মাশুল তাকে জীবন দিয়ে দিতে হবে। কুমির ডুব দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। বানর হাবুডুবু খেতে লাগল। কুমির তাকে ওপরে তুলে ধরল। বানরটা অনেক অনুনয়-বিনয় করতে লাগল। কিছুতেই তার মন গলল না। আবার পানিতে ছুড়ে মারল। এভাবে ইঁদুর-বিড়াল খেলতে লাগল। শেষে একটা ক্রুর হাসি দিয়ে বলল, ‘তুই জাম খাস, আমি তোকে খাইÑ বলে গপ করে গিলে ফেলল।’

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.