ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

শতাব্দীর বৃহত্তম আর্থিক গণহত্যা

আলমগীর মহিউদ্দিন

০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৬


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রিন্ট

 

 গত ১৭ জানুয়ারি এ শতাব্দীর ‘বৃহত্তম আর্থিক গণহত্যার’ ৭০ দিন পার হলো। বিশ্বের সাধারণ গণহত্যাগুলো নিয়ে যেমন আলোচনার শেষ থাকে না, এই গণহত্যায় তেমন তীব্র আলোচনা হয়নি। এই ‘আর্থিক গণহত্যা’ হয়েছে ভারতে। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার গত ৮ নভেম্বর সবাইকে তাক লাগিয়ে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে দিয়েছে। কাগুজে নোটের বাতিল কোনো কোনো দেশের সরকার করে থাকে, ভারতও করেছে। এটা নতুন নয়। গত ৭৯ বছরে চারবার তারা নোট বাতিল করেছে। প্রথমে ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম ১০ হাজার টাকার নোট ছাপে এবং ১৬ বছর পরে হাজার টাকার নোট চালু করে। নোট প্রথমে ১৯৪৬ সালে বাতিল করে; পরে ১৯৭৮ সালে হাজার এবং পাঁচ হাজার টাকার নোটগুলোও বাতিল করেছিল। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আর্থিক কর্মকাণ্ডের দাবিদার। গত নভেম্বরের বাতিলপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত মূল্য হিসাবে শতকরা ৮৫ ভাগ চালু রুপি বা টাকা। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫-১৬ সালে মোট ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ধাতব মুদ্রা এবং কাগুজে নোট বাজারে ছিল। এর মাঝে ৫০০ এবং হাজার টাকার মূল্য ছিল ১৫ হাজার ১৭৯.৫ শত কোটি টাকা। এই বিপুল টাকার নোট এবার হঠাৎ বাতিল করা হলো। তাই বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক পিটার কয়েনিগ এটাকে ‘আর্থিক গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অধ্যাপক কয়েনিগ মন্তব্য করেছেন, ‘আর্থিক গণহত্যা (ফিন্যান্সিয়াল জেনোসাইড) বলে কোনো কথা আছে কি না জানি না, তবে ভারতীয় এই কর্মকাণ্ডের এর সাথে তুলনা করা চলে। যেমন সত্যিকারের গণহত্যায় ব্যাপক জীবননাশ ঘটে এবং এতে প্রধানত ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিবরা। এবার ভারতের এই কর্মকাণ্ডেও একই চিত্রের অবতারণা ঘটেছে। তারা বলি হয়েছে, নিঃস্ব হয়েছে এবং গণহত্যায় যেমন এদেরই দোষী করা হয়, সে ভাগ্য এরা বরণ করেছে। প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোও সঠিক কথা বলছে না বলে কয়েনিগ মন্তব্য করেছেন।
এই নোট বাতিলের উদ্দেশ্য তিনটি বলে ভারত সরকার জানিয়েছে। ০১. ভুয়া নোটগুলো অকেজো করা। ০২. কালো টাকার মজুদদারি বন্ধ করা। ০৩. এবং টাকার গতিপ্রকৃতির ওপর নজর দেয়া।
সরকার দাবি করছে, এই ভুয়া নোটগুলো সাধারণত পাকিস্তানে তৈরি হয় এবং বাংলাদেশ হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। অভিযোগটি মারাত্মক এবং উদ্দেশ্যমূলক। মারাত্মক এ জন্য যে, বলা হচ্ছেÑ ভারতে ভুয়া টাকা ছড়াতে পাকিস্তান যে গোপন কর্মকাণ্ড করে তা ‘সম্পন্ন করে বাংলাদেশ’। এ বক্তব্য সাধারণ পরীক্ষাতেই অসার বলে ধরা পড়ে। কারণ ভারতে প্রযুক্তি এবং এমন কর্মকাণ্ডের ইতিহাস বহু পুরনো। যদি পাকিস্তান ভুয়া ভারতীয় নোট ছাপিয়ে থাকে, তা ভারতে পাঠানোর জন্য ভারতের ওপর দিয়ে এক হাজার ২০০ মাইলের আকাশপথ পাড়ি দেয়ার কী প্রয়োজন? অপর পক্ষে, পাকিস্তানও একই অভিযোগ তোলে ভারতের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে ভারতীয় ফেনসিডিলসহ নানা অবৈধ বিষয়ের দীর্ঘ দিন যাবৎ উপস্থিতির কাহিনী সবার জানা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো- জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রখ্যাত সংস্থার বক্তব্য। তাদের মতে, ভারতে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুইনম্বরী অর্থনীতি; যার প্রধান বাহক কালো টাকা এবং ভুয়া নোট। এই বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালনা অবশ্যই বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যাপারটি বরং উল্টো। বাংলাদেশের অর্থনীতি, আর্থিক কর্মকাণ্ড, এমনকি সাধারণ জীবনধারায় এই ভারতীয় অর্থনীতির ব্যাপক প্রভাব নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। অতএব, এ দাবির একাংশ সত্য নয়। ভারতে ভুয়া নোটের বিশাল রাজত্ব, এর জন্ম এবং পরিচালনা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারত একবার অভিযোগ করেছিল যে, ব্রিটেনের দু’টি কোম্পানি তাদের নোটের নকশা বাইরে পাচার করেছে। এই নকশা নিয়ে তারা ভুয়া নোট ছাপাচ্ছে। ভারত ব্রিটেনের এই দু’টি কোম্পানিকে ২০১৪ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরে অনুসন্ধানে তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে, সেই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়। উল্লেখ্য, ইউরোপের অর্ধডজন কোম্পানি ব্যাংক নোট ছাপিয়ে থাকে। এর মাঝে ব্রিটেনের থোমাস ডিলারু সবচেয়ে পুরনো। হাজার বছরের ইতিহাসে বিশ্বের অধিকাংশ নোট এরা ছাপিয়েছে। এই কোম্পানিকেই ভারত স্বল্পসময়ের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। ডিলারুই ভারতের নাসিকে দেশটির সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস স্থাপনের আগ পর্যন্ত নোট ছাপাত। এখন ভারত তাদের সহায়তায় আরেকটি প্রেস স্থাপন করছে। ভারতীয় পত্রিকা ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট অনুসারে, ইতালি, জার্মানি ও লন্ডন থেকে টাকা ছাপানোর কাগজ ভারত আনে। সংশ্লিষ্ট কোম্পাানি হলো লুইজেন থাল- জার্মানি, ডিলারু- লন্ডন, ক্রেন- সুইডেন, আরজু উইগিনস- ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডস। ভুয়া নোট যদি কেউ ছাপতে চায় তাহলে এদের কর্মকাণ্ডের খবর জানতে হবে অথবা রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ থাকতে হবে। বিশ্বব্যাপী এই কর্মকাণ্ডটি অত্যন্ত গোপনীয় বলে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মাঝে থাকে; এর খবর যেন বাইরে না প্রকাশ পায়। যেমন, মার্কিন লেখক টেরি ব্লুমের বইটি (দি ব্রাদারহুড অব মানি) ছাপার পরপরই সব কপি সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ কিনে নেয়, যেন তা পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে না পারে। ১৯৮৩ সালের এ ঘটনাও যেন প্রকাশিত না হয় তার ব্যবস্থা নেয়া হয়। বইটিতে ব্লুম নোট ছাপানোর মোটামুটি একটি চিত্র এঁকেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কালো টাকা, ভুয়া টাকা প্রভৃতির সংশ্লিষ্টরা একে অন্যের সাথে অদৃশ্য সূত্রে গাঁথা এবং অনেকাংশে তারাই নেপথ্যের নায়ক।
অতএব, সরকারি দাবি ও বাস্তবতার মাঝে ফারাকটা সহজেই অনুমেয়। ভারতীয় লেখক শুভময় ভট্টাচার্য্য নোট বাতিলের কাহিনী বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘টাকার নোট একটি সরকারি প্রতিশ্রুতি (প্রমিসরি নোট)। যখন এটা বাতিল করা হয়, তখন সেই প্রতিশ্রুতিটিও অস্বীকার করা হয়।’ সে জন্য কোনো সরকার এগুলো করতে চায় না। কাগুজে মুদ্রা চালু হওয়ার পর মাত্র ছয়টি দেশ এই ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভারত করেছে চারবার-দু’বার বাতিল করে, দু’বার ফেরত নিয়ে (রিকল)।
মুদ্রা বা টাকার চারটি কাজ। টাকা হলো ০১. মূল্যের ভাণ্ডার, ০২. বিনিময়ে সাহায্য করা, ০৩. বিলম্বে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থাপক এবং ০৪. মূল্যের পরিমাপক। যখনই নোট বাতিল করা হয়, তখনই এসব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সাথে সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার এ ক্ষেত্রে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্য কথায় তারা এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করল। ভারত কেন বারবার টাকা বাতিল করে? এ প্রশ্ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, এবার হঠাৎ করে কেন ভারত নোট বাতিলের পদক্ষেপ নিলো? কালো টাকা, ছায়া আর্থিক ব্যবস্থা বা চোরাকারবারি- এ সব পুরনো বিষয়। একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য হলো, ভারতের মাত্র পাঁচজন ব্যক্তি এই বিষয়টি জানতেন। তবে এ বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করেছেন অনেকেই। দি ইন্টারন্যাশনাল ফোরকাস্টারে (১৯ নভেম্বর) জেমস করবেট বলেছেন, এটা ভারতের একক সিদ্ধান্ত নয়। এটা যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার একটি অংশ। তারা ভারতকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। যদি এটা এখানে সাফল্য লাভ করে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বে শিগগিরই তা কার্যকর করা হবে।
করবেট বলেছেন, এই নতুন পরিকল্পনা হলো বিশ্বে ‘ক্যাশলেস’ সিস্টেম চালু করা। অর্থাৎ কোনো টাকার নোট থাকবে না। সব দেয়া-নেয়া ও কেনা-বেচা হবে ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতিতে। এবারের ভারতীয় নোট বাতিলের পদ্ধতিগুলোও এটা স্পষ্ট করছে। যেমন, বাতিল করা নোটগুলো শুধু ব্যাংক বা পোস্ট অফিসে জমা দিতে হবে। এর ফলে ব্যাংক এবং সরকারের আর্থিক তারল্যে সহায়তা হবে। ভারতে ব্যাংক ও সরকার এখন এ সমস্যার সম্মুখীন বলে কয়েনিগ মন্তব্য করেছেন। আবার প্রতিটি জমাকারীর বিশদ বিবরণ তার সাথে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ এ তথ্যগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে জমা রাখা হবে। করবেট একটি বিষয়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তা হলো, ভারতের এই ব্যবস্থাকে সবচেয়ে উচ্চস্বরে স্বাগত জ্ঞাপন করেছে ‘তথ্য প্রযুক্তি’ (ইনফরমেশন টেকনোলজি) সংস্থাগুলো। কারণ এতে তাদের আয় হবে আকাশচুম্বী।
জার্মান অনুসন্ধানী সাংবাদিক নরবার্ট থেয়ারিং উল্লেখ করেছেন, এত বড় একটা সিদ্ধান্ত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের পার্লামেন্টে উত্থাপন করেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ এবং ইউএসএইড ও ভারতীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘অ্যান্টি-ক্যাশ পার্টনারশিপ’ চুক্তির পরপরই এ ঘটনাটি ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এরপর বিল গেটসও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পরপরই এই ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে জেমস করবেটের দাবির যেন জোরালো হয়ে ওঠে। ইউএসএইডও অর্থ মন্ত্রণালয়ের চুক্তিটিকে ‘ক্যাটালিস্ট’ (অনুঘটক) বলে অভিহিত করা হয়েছে। পুরো ঘটনার পেছনে রয়েছে রথচাইল্ড-রকফেলার-মরগ্যান প্রভৃতি বিশাল ব্যাংক ও ধনিকগোষ্ঠী।
পিটার কোয়েনিগ উল্লেখ করেছেন, নোট বাতিল ঘটনাটি ঘটে ‘গ্রুপ অব থার্টি’ বলে পরিচিত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সংস্থার সদস্য রঘুরাম রাজন রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট হলে। এর আগে তিনি আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন এবং সম্ভবত এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ম্যাডাম ল্যাগার্ডের স্থলাভিষিক্ত হবেন। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি মাত্র একটি দেশভিত্তিক নয় এবং এর নেপথ্যে রয়েছে বিশ্বে নতুন আর্থিক ব্যবস্থা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা।
ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলে এবং নোট বিদায় নিলে কী সুবিধা হবে? ক্যাটালিস্টের গবেষণা অনুসারে, এর নিয়ন্ত্রণকারীরা তখন একটি বোতাম টিপেই সবার সব খবর জানতে পারবেন। এমনকি, কে কোথায় আছে তা নির্ধারণও সম্ভব হবে। যেমন, বর্তমানের স্বল্পোন্নত প্রযুক্তিতেও প্রতিদিন দশ শত কোটি তথ্য এরা পর্যবেক্ষণ করছেন। পূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেমে আর্থিক লেনদেন শুরু হলে এর ব্যাপকতা কী হবে, তা শুধু অনুমেয়। এই মনিটর করার ক্ষমতা শুধু ইহুদি-সংস্থাগুলো করতে পারবে; কারণ ১৯৮৩ থেকে কৌশলে এই ক্ষমতা তারা কুক্ষিগত করে এখন মাত্র ছয়টি ইলেকট্রনিক সংস্থায় ন্যাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
এক কথায় এফইডি, বিআইএস এবং আইএমএফ এক সারিতে আসার ফলে পশ্চিমা ‘ক্যাশলেস সোসাইটির’ উদ্দেশ্য সফল হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। এর মাঝেই এই ডলারনির্ভর সিস্টেম কত শক্তিশালী হয়েছে তার উল্লেখ করেছে জার্মানির বিখ্যাত ফ্রাঙ্কফার্টার আলজেমেইন জিটাং পত্রিকা। তারা বলে, জার্মানির এক কোম্পানির একজন কর্মচারী ইরানের সাথে আইনসম্মত ব্যবসা শুরু করেন। তখনই তাকে মার্কিনিরা ‘টেরর’ লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সে কোম্পানির সব ডলার আদান প্রদান বন্ধ হলে তাদের ব্যবসা গোটাতে হয়।
নরবার্ট হারিং মন্তব্য করেছেন, এই ডিজিটাল আদান-প্রদান পদ্ধতির পূর্ণ চালু অবস্থা কেমন ভয়াবহ হতে পারে তার উপমা হলো জার্মান নেতৃস্থানীয় ডিউটস ব্যাংকের (উবঁঃংপযব ইধহশ) ভাগ্য। তারা মার্কিন কিছু উপদেশ-নিষেধ উপেক্ষা করলে (সেপ্টেম্বর ২০১৬), মার্কিন সরকার ইউএসএতে তাদের ব্যবসা এবং ডলারের মাধ্যমে তাদের সব আদান-প্রদান নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়ে জরিমানা আরোপ করে। এর পরিমাণ ছিল ১৪ শত কোটি ডলার। বছরব্যাপী আলোচনা করে তারা ৭০০ কোটি ডলার জরিমানা দিয়ে কোনোমতে টিকে থাকে। হারিং লিখেছেন, বিশ্বের অন্যতম, বৃহৎ ব্যাংককে ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেউলিয়া করা যদি এমন সহজ হয়, তাহলে নোটের ব্যবহার যত কমবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতির আয়ত্তে যাবে, তত এই নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। তাই ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর জন্য ডলার পদ্ধতিনির্ভর পশ্চিমাশক্তি তৎপর হয়ে পড়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অধিকাংশ দেশ এখন এর আওতায় এসে গেছে। তৃতীয় বিশ্ব বিশেষ করে এশিয়া ও সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন (এসসিও) সদস্যরা এই পদ্ধতির বাইরে। এসসিও এখন ডলার নিয়ন্ত্রিত আর্থিক পদ্ধতির শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ। ভারত এর সদস্য হওয়ার অপেক্ষায়। ভারত ব্রিকসের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) সদস্য। এ জন্যই ‘ক্যাশলেস’ কর্মকাণ্ডের পরীক্ষা ভারতে হলো। এখানে এটা সাফল্য লাভ করলে, এসসিও এবং ব্রিকস (যা এখন ডলারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী) অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, এর আগে লিবিয়া এবং ইরাক ডলার রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে চরম মূল্য দিয়েছে।
ভারতের ৯৫ শতাংশ নাগরিক নগদ টাকাই আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার করে থাকে। কারণ ব্যাংক এবং ডিজিটাল পদ্ধতি ভারতের অর্ধেক অংশেও পৌঁছেনি। এখানে তাই পরীক্ষাটি চলছে।
টাকা বাতিলের পর ভারতের জনগণ কোন অবস্থায় আছে তার স্পষ্ট ও সঠিক চিত্র ছিটেফোঁটা সংবাদমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও আসছে। লাখ লাখ লোক নিঃস্ব হয়ে গেছে এবং বহু মানুষ আত্মহত্যা করেছে বলে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর এসেছে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় কারো আর্থিক এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকবে না এবং গোপনীয়তা চলে যাবে এর নিয়ন্ত্রকদের হাতে। সবশেষে এর নিয়ন্ত্রক হবে মার্কিন-ইহুদি চক্র, এটা বলে নরবার্ট হারিং সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি ঘটানো সম্ভব এবং তাতে বিশ্বের জনসংখ্যা কমানো যাবে। বর্তমানের দশমিক ১ ভাগ মানুষ যারা বিশ্বের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন তাদের ক্ষমতা হবে নিরঙ্কুশ। কয়েনিগ তাই ভারতের এই টাকা বাতিল করাকে বলেছেন ‘আর্থিক গণহত্যা’।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫