ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ মার্চ ২০১৭

রকমারি

মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজারী গুড়

আব্দুর রাজ্জাক

২৮ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৯:২৭


প্রিন্ট

মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়। গোটা দেশে এক নামেই পরিচিতি বিশেষ এই খেজুর গুড়। লোভনীয় স্বাদ আর মনমাতানো সুগন্ধে অতুলনীয় হাজারী গুড়ের পরিধি এখন বিশ্বে সমাদৃত। ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথকেও এ গুড় উপহার দেয়া হয়েছিল। এমনকি বিশ্বের কমপক্ষে ২০টি দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এ গুড়ের স্বাদ নিতে মুখিয়ে থাকেন। করেন ভূয়সী প্রশংসা। তাই হাজারী গুড় পরিণত হয়ে ওঠে রীতিমতো একটা শিল্পে। ইতিহাস খ্যাত হাজারী গুড়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য- দু’হাতে গুঁড়ো করে ফুঁ দিলে তা ছাতুর মতো বাতাসে উড়ে যায়। এ ঐতিহ্য দু-একদিনের নয়; প্রায় দেড় শ’ বছরের।
খেজুর গাছের দুই-তৃতীয়াংশই রয়েছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায়। সেখানে প্রতি একরে ১৫টি খেজুর গাছ দেখা যায়। গুণে মানে, স্বাদে গন্ধে এই হাজারী গুড়ের বিস্তর সুনাম রয়েছে। এই হাজারী গুড় নিয়ে রয়েছে নানা উপকথা। এ অঞ্চলের পথে-প্রান্তরে রয়েছে সারি সারি খেজুর গাছ। আর এ খেজুর গাছ এ অঞ্চলের অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার একটি মাধ্যম। শীতে খেজুর গাছের রস দিয়ে তৈরি করা হয় হাজারী গুড়। তিন পুরুষ ধরে গুড় উৎপাদন করে আসা গাছি আজমত আলী হাজারী (৬৫) জানান, আগের দিন বিকেলে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে (সূর্য ওঠার আগে) রস সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে ছেঁকে মাটির তৈরি (জালা) পাত্রে চুলায় (বাইনে) জ্বালিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় হাজারী গুড়। এই পদ্ধতি এখন আর হাজারী পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রায় গাছিদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। এই গুড় দেখতে যেমনি সুন্দর খেতেও তেমনি সুস্বাদু। মিষ্টি ও টল টলে রস ছাড়া হাজারী গুড় হয় না। প্রতি কেজি গুড় ৬০০ টাকা থেকে হাজার টাকা পর্যন্তও বিক্রি হয় বলে তিনি জানান।
কালোই গ্রামের গাছি করিম মিয়া জানান, বাজারে এক ধরনের হাজারী সুদৃশ্য গুড় পাওয়া গেলেও মৌলিকভাবে তার ব্যবধান রয়েছে। নানা প্রতিকূলতায় মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজারী খেজুরের গুড় প্রায় বিলীন হতে চলেছে। প্রতি বছর হাজার হাজার গাছ কেটে ইটভাটায় লাকড়ি হিসেবে পুড়িয়ে এই গুড় শিল্পকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে এই শিল্পকে রক্ষা করা জরুরি বলে জানান এই এলাকার গুড় শিল্পীরা।
এ হাজারী গুড় নিয়ে রয়েছে নানা উপকথা। হাজারী কোনো বংশগত নাম নয়। এটা ব্যক্তিবিশেষের নাম। প্রায় দেড় শ’ বছর আগে ঝিটকা অঞ্চলের হাজারী প্রামাণিক নামে একজন গাছি ছিলেন। যিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করতেন। হঠাৎ একদিন বিকেলে খেজুর গাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে গাছ থেকে নামামাত্রই একজন দরবেশ তার কাছে রস খেতে চায়। তখন ওই গাছি দরবেশকে বলেছিলেন, সবেমাত্র গাছে হাঁড়ি বসানো হয়েছে। এ অল্প সময়ে বড়জোর ১০-১৫ ফোঁটা রস হাঁড়িতে পড়েছে। তবুও দরবেশ তাকে গাছে উঠে হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার আকুতি জানায়। দরবেশের রস খাওয়ার ইচ্ছায় গাছি সত্যি সত্যি খেজুর গাছে উঠেই হতবাক হয়ে যান। গাছি দেখতে পান, সারা রাত ধরে রস পড়তে থাকলে যে পরিমাণ হওয়ার কথা ছিল মাত্র কয়েক মিনিটে পুরো হাঁড়ি রসে ভরে গেছে। গাছি হাঁড়ি ভরপুর রস নিয়ে নিচে নেমে দরবেশকে রস খাওয়ান এবং পা জড়িয়ে ধরেন। গাছিকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে দরবেশ বললেন, কাল থেকে তুই যে গুড় তৈরি করবি তা সবাই খাবে এবং তোর গুড়ের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে। তোর সাত পুরুষ এ গুড়ের সুনাম ধরে রাখবে বলেই দরবেশ দ্রুত চলে যান। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওই দরবেশকে পাওয়া যায়নি। ওই দিন থেকেই হাজারী প্রামাণিকের নামেই এ গুড়ের ‘হাজারী’ নামকরণ করা হয়।
আবার প্রবীণ অনেকেরই মতে, গাছের রস থেকে বিশেষ কৌশলে সুগন্ধময় স্বাদ সফেদ এ গুড়ের উদ্ভাবন করেছিলেন হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন হাজারী। প্রকৃত হাজারী গুড় তৈরির গোপন কৌশল একমাত্র তার পরিবারের সদস্যদের মাঝেই রয়ে গেছে। আজো এ গুড় নিয়ে মানিকগঞ্জবাসীর অহঙ্কারের কমতি নেই। তার নামেই এই গুড়ের নামকরণ করা হয়েছে ‘হাজারী গুড়’।
যেভাবে তৈরি হয় হাজারী গুড়
স্থানীয় গাছিরা দুপুরের পর থেকে খেজুর গাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে দেয়। সারা রাত ওই হাঁড়িতে রস পড়ার পর ভোর রাতে আবার গাছ থেকে হাঁড়ি নামানো হয়। এরপর গাছি পরিবারের মহিলারা মাটির চুলায় ভোর থেকে রস জ্বাল দিয়ে ঘন করে। রসের ঘনত্ব বেড়ে গেলে একটি মাটির হাঁড়িতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘুটে ঘুটে তৈরি করা হয় সাদা রঙের হাজারি গুড়। বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ গুড় উৎপাদনের নির্ভযোগ্য সময়। আগের দিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে (সূর্য ওঠার আগে) গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির তৈরি জালা অথবা টিনের তৈরি তাফালে (পাত্র) বাইনে (চুলা) জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়কুটো, নাড়া ও কাঁশবন। এ গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু।
ঝিটকা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো: হালিম মোল্লা জানান, শীত মওসুমে খেজুর গাছ এ অঞ্চলে একটি শিল্পে পরিণত হয়। বিশেষ করে হাজারী গুড়ের বদৌলতে এখানে অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব বিরাজ করে। রস থেকে গুড় উৎপাদন ও ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দিতে পেশাদার গাছি, কুমার, কামার, জ্বালানি ব্যবসায়ী, পরিবহনের শ্রমিক, ট্রাক মালিক- চালক, ভ্যানচালক, আড়তদারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সংযুক্ত রয়েছে। পৌষের মাঝামাঝি থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই এই হাজারী গুড় দেশ-বিদেশে চলে যায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫