সংগ্রাম করেই টিকে আছেন কমলেশ বিশ্বাস

এস আর শানু খান

বয়স তখন ৭-৮ বছর হবে। কমলেশ পাড়ার অন্যসব ছেলেদের মতো স্কুলে যায়। স্কুলমাঠে দৌড়াদৌড়ি করে খেলা করে। পাড়ার শিশুদের সাথে। লেখাপড়ায় সে খুব ভালো ছিল। হঠাৎ একদিন সুস্থ সবল শিশু কমলেশের ওপর চেপে বসল নিয়তির কষাঘাত। রাতে আকস্মিকভাবে ডান পাশে ব্যথা, জ্বালাযন্ত্রণা শুরু হলো। সারা রাত একটুও ঘুমাতে পারল না। সকালে স্থানীয় এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান কমলেশের বাবা। ডাক্তার জানালেন, ক্যালসিয়ামের সমস্যার কারণে। কমলেশের ডান পা বাম পা থেকে অনেক চিকন হয়ে গেছে। যা কমলেশের বাবা-মা বুঝতে পারেননি। ডাক্তার বলার পর চোখে পড়ল সবার। কমলেশের পায়ের যন্ত্রণা দিনে দিনে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল।
কয়েক দিনের মাথায় তার ডান পা একদম অবশ হয়ে পড়ল। গ্রামের জানাশোনা সব লোক পরামর্শ দিলেন ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে। তার বাবা লেখাপড়া জানেন না। সংসারে অভাব অটনের নিত্য পদচারণা বিরাজমান। তার পরও ধারদেনা করে পাসপোর্ট ভিসা করে কমলেশকে নিয়ে বাবা ছুটে গেলেন ভারতে কল্যাণী হাসপাতালে। ওখানে কাটল ছয় মাস।
কিন্তুপায়ের কোনো পরিবর্তন হয় না। ডাক্তার বলেন, কমলেশের ডান পা কেটে ফেলতে হবে। ছয় মাস এটা ওটা বলে ঠেকিয়ে রেখে অবশেষে যখন বলেন, পা কেটে ফেলতে হবে, তখন কমলেশের বাবা বলেন, পা কাটার কথা তো দেশের ডাক্তাররাও বলেছিলেন। আর পা-ই যদি কাটব তাহলে এত কষ্ট করে বিদেশইবা এলাম কেন? আর আপনারা এত দিনইবা মিথ্যা আশা দিয়ে আটকিয়ে রাখলেন কেন? কমলেশের বাবা বললেন, আমার ছেলে মরে যাবে তবু পা কাটব না। বাড়ি ফিরে আসেন। কমলেশের পা তখনো পুরা অবশ। অবশ থাকার কারণেই জ্বালাযন্ত্রণা টের পেত না কমলেশ। ছয় মাসের ব্যবধানে শিক্ষাজীবনে এক অনাসক্তি নেমে এলো। তা ছাড়া লোকজনের এটা ওটা কথা শুনে বাবা-মা একেক দিন এ ডাক্তার সে ডাক্তারের কাছে যেতে যেতে ছাত্রজীবনের ইতি ঘটে।
কমলেশের বয়স বাড়ে। বয়সের সাথে সাথে শরীরের অন্যসব অঙ্গপতঙ্গ বাড়লেও বাড়ে না ডান পা। এভাবে আস্তে আস্তে সে বড় হতে থাকে আর খাটো হতে থাকে তার ডান পা। পাড়ার বন্ধুরা যাদের সাথে কমলেশ স্কুলে যেত, তারা এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে ওঠে আর কমলেশের প্রতিবন্ধী হওয়ার প্রক্রিয়া ক্রমশ চলতে থাকে। অবশেষে বন্ধুরা যখন লেখাপড়া শেষ করে বড় বড় অফিসার হয় সে তখন পুরাপুরি প্রতিবন্ধীর দলে।
কমলেশের বয়স এখন ৩৩ বছর। দুই মেয়ের জনক।
দুই কন্যা আর স্ত্রীকে নিয়ে মোট চারজনের সংসার। প্রতিবন্ধী হয়েও কমলেশ বসে থাকতে পারেনি। সংসারের অভাব অনটন খুব কম বয়সেই নামিয়ে দিয়েছিল জীবিকা উপার্জনে। সাইকেল মেরামতের কাজে নেমে যায়। ১৭ বছর ধরে কমলেশ সাইকেল মেরামত কাজের সাথে জড়িত। প্রতিবন্ধী হয়েও কর্মজীবী নেই কমলেশ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.