ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ মার্চ ২০১৭

বিবিধ

জমে উঠেছে সোনারগাঁওয়ের লোক কারুশিল্প মেলা

হাসান মাহমুদ রিপন, সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ)

২৭ জানুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ১৫:৫৮


প্রিন্ট

জমে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। আজ শুক্রবার ছুটির দিনে হাজারো ক্রেতা দর্শনার্থীদের ঢল নামে মেলা চত্বর এলাকা।

সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বর জুড়ে বসেছে মাসব্যাপী এ মেলা। আজ আগত দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীড় ছিল মেলা প্রাঙ্গণে। বিদেশী পর্যটকরাও মেলায় আসছে। যেন উৎসব আর আমেজে মেতে উঠেছে ফাউন্ডেশন ও এর আশপাশ এলাকা।

গ্রামের প্রতি নাড়ির চিরন্তন টান আর ভালবাসার আকর্ষণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দলবদ্ধভাবে ভীড় করছে এ মেলায়। শিক্ষাসফর, বনভোজন, আনন্দভ্রমণ, ঘুরে আসি, পিকনিক ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যানারে দল বেঁধে হাজার হাজার মানুষ আসছেন মেলায়। এক কথায় সোনারগাঁওয়ে লোক কারুশিল্প মেলা প্রাঙ্গণ এখন পুরোপুরি মুখরিত।

বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্যকে লালন, পরিস্ফুটন এবং চলমান জীবনধারায় সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে এ মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা শুরু হয়েছে। মেলা উপলক্ষে পুরো ফাউন্ডেশন চত্বর এক ভিন্ন সাজে সাজানো হয়েছে। লাল-নীল বাতি দিয়ে মালার মতো করে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে জাদুঘরের ভবনগুলোর ইটের তৈরি শরীরে। ফাউন্ডেশনের মূল আঙ্গিনায় থেকে মেলার দিকে ধাবিত রঙিন পতাকায় শোভিত রাস্তার ধারে বিভিন্ন গ্রামীন শে¬াক, নীতিকথা সংবলিত প্ল্যাকার্ড, ফেষ্টুন, লোকজীবনের চিত্রকলার ম্যুরাল সাজানো হয়েছে। মেলার প্রবেশ ধারে ফাউন্ডেশনের প্রধান ফটক দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান কেের্পারেশন কোম্পানীর নির্মিত বড় সর্দার বাড়িটি এক বছর মেলাকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। আগত দর্শনার্থীরা সবাই এভবনের পাশে একটু দাড়িয়ে অবলোকন করতে দেখা যাচ্ছে। কেউবা আবার ছবি তুলতে ব্যস্ত দেখা গেছে। মেলার অন্যতম আরেক আকর্ষণ যেন সামনে একটি গ্রাম। গ্রাম বাংলার ব্যবহৃত বাশেঁর সব কারুপন্য আপনাকে যেন স্বাগত জানাচ্ছে।

আজ শুক্রবার মেলা এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে মেলা চত্বরে দর্শনার্থীর উপচে পড়া ঢল। সোনারগাঁওয়ে ভ্রমণে বা পিকনিকে এসে অনেকে মেলাকে বাড়তি পাওনা হিসেবে কথা বলছেন অনেকেই।

ময়মনসিংহ থেকে শিক্ষাসফরে আসা একটি কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, এখানে শিক্ষাসফরে এসে সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন রাজধানীর ইতিহাস ঐতিহ্যে দেখার সঙ্গে বাড়তি পাওয়া হিসেবে কারুশিল্প মেলাটি উপভোগ করলাম।

নরসিংদী থেকে আগত দর্শনার্থী, পরেশ, সাজু, আশরাফ জনি, জিনিয়া, বিথী, ব্যপ্তি, আজাদ, রওশন আরা, জিতু, নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে আসা তানজিম, রাফিদ, রাহা, জাহান, মাহফুজা, এ্যানি, মৌরি, অমিত,তমালসহ একদল তরুন তরুনী সোনারগাঁওয়ে পিকনিকে এলে তাদের সঙ্গে দেখা হয় মেলা চত্বরে। তারা জানান, একুশে বই মেলা, ঢাকার বাণিজ্য মেলাসহ ইত্যাদি মেলার মতো সোনারগাঁওয়ের লোক ও কারুশিল্প মেলা দেশের একমাত্র লোকজ মেলা। এখানে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া লোক ও কারুশিল্পকে আরো পুঙ্খানুরুপে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। তা দেখে নতুন প্রজন্মরা আরো বেশি করে জানতে পারবে। মেলা চত্বরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে লালনের একতারা। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা একতারা কিনে হাতে নিয়ে বেজে চলছে একতারা সুর।

এবছর মেলায় প্রথম গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম ‘মৃৎশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন’ শিরোনামে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এতে সোনারগাঁওসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৮ জনের মৃৎশিল্প স্থান পেয়েছে।

মেলার বিশেষ আকর্ষণ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনী দেশের প্রথিতযশা কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে ‘কর্মময় কারুশিল্পী’ প্রদর্শনী। এটি মেলার মূল চত্বরের মাঠের মাঝে অবস্থান। এ প্রদর্শনীতে ২৭টি স্টলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ৫৪ কারুশিল্পী দেশের হারানো ঐতিহ্যকে আবার নতুন করে আবিস্কার করছে।

প্রদর্শনীর গ্যালারীগুলো কারুশিল্পীরা তাদের স্বহস্তে তৈরি করছে, নওগাঁ ও মাগুরার শোলাশিল্প, সোনারগাঁওয়ের জামদানি, রাজশাহির শখের হাড়ি ও মুখোশ, চট্টগ্রামের তালপাতার হাতপাখা, সোনারগাঁওয়ের এক কাঠের চিত্রিত হাতি ঘোড়া পুতুল ও কাঠের কারশিল্প, নকশিকাঁথা বেতের কারুশিল্প, ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশের কারুশিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি, পাটজাত ও বুনন শিল্প, কুমিল্লার তামা-কাঁসা পিতলের কারুশিল্প, মুন্সিগঞ্জের শীতল পাটি, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটাশিল্প, সিলেট ও রাঙামাটির ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগের মাটির কারুশিল্প ইত্যাদি। দর্শনার্থীরা অবাক হয়ে দেখেছেন কারুশিল্পীদের নিপুণ কর্মযজ্ঞ। কেউ কেউ লোভ সামলাতে না পেরে কেনাকাটা করছেন শখের চিত্রিত হাড়ি, শোলা শিল্প, কাঠের সামগ্রী, শতরঞ্জি, নকশী কাঁথাসহ বিভিন্ন কারুপন্য সামগ্রী।

এক স্টলে বসে নকশিকাঁথায় সুইয়ের ছোঁয়া দিচ্ছিলেন পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী হোসনে আরা। তিনি বললেন, মেলা মূলত জমে উঠেছে। এখন বিক্রি হচ্ছে মোটামুটি। ঢাকা থেকে এসে অনেকেই অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন পছন্দের নকশার কাঁথা।

মেলায় আগত রাজশাহীর শখের হাড়িতে আল্পনা আঁকছিলেন সুশান্ত পাল। বিলুপ্তপ্রায় এ হাড়ির ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আগেকার দিনে অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক দ্রব্য ছিল না। গ্রামের লোকজন তাদের মুড়ি, চিড়া, খই ইত্যাদি এ শখের হাড়িতে ভরে শিকায় তুলে রাখতো। এছাড়াও গাঁয়ে হলুদ, বিয়ে ও গীত গাওয়া অনুষ্ঠানে এ হাড়ি ব্যবহৃত হতো। মিস্টি পাঠানোর জন্য নতুন বেয়ান বেয়াইনদের এ শখের হাড়ি ছিল প্রথম পছন্দ।

সরকারিভাবে পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনারগাঁওয়ের দারুশিল্পী আব্দুল আউয়াল মোল্লা প্রতিবারের মতো এবছরও মেলায় তার তৈরি কাঠের পণ্যসামগ্রী নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছেন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে অনেক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ কাল ধরে তিনি এ পেশার সাথে জড়িত এমনটি জানিয়ে বললেন, কাঠ দিয়ে তৈজষপত্রসহ বিভিন্ন শো পীস তৈরী করে এগুলি নামকরা শোরুমে সরবরাহ করেন। মেলায় বিকিকিনি হচ্ছে মোটামুটি। 

এককথায় বলতে গেলে দারুণ এক আয়োজন বসেছে সোনারগাঁওয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে। দুই দশকের পথ ধরে এবারও বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে মেলা। মেলা দেখে আর কারুপণ্য কিনে ক্লান্ত শরীরে বিকেলে বসে শুনছেন ময়ূরাকৃতির সোনারতরী মঞ্চ থেকে ভেসে আসা লালন, হাসন, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর ভাটিয়ালি গান। কেউ কেউ আবহমান বাংলার গ্রাম্য শালিশ, দাদি নাতির গল্প বলা, ঢেঁকিতে ধানভানা, নকশী পিঠা তৈরি,পালকিতে বর কনে, পন্ডিত মশাইয়ের পাঠশালা ইত্যাদি জীবন্ত প্রদর্শনী ও হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সব খেলাধুলা দেখছে। সোনারগাঁও বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা এতে অংশগ্রহন করছে। মেলা বরাবরেই নাগরদেলা, বিমান চড়কি রয়েছেই।

মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কবি রবীন্দ্র গোপ জানান, লোক কারুশিল্পের প্রসারের জন্য প্রতি বছরের মত আকর্ষণীয় বিভিন্ন খেলা, গান, প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছাড়াও এবারের উৎসবে গ্রাম বাংলার আর্থসামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে বৈচিত্রময় ভাবে। তিনি বলেন, এবারের মেলা অন্যান্যবারের চেয়ে খুব ভাল জমেছে। ছুটির দিনগুলোতে বহু দর্শনার্থীর সমাগম হয়।

মেলায় কর্মরত কারুশিল্পীর কারুপণ্য উৎপাদন প্রদর্শনীর ২৭টি স্টলসহ সর্বমোট ১৯৩ টি স্টল স্থান পেয়েছে। মেলা চলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫