ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

চীনা স্বপ্ন : এক অঞ্চল এক পথ

সৈয়দ আবদাল আহমদ

২৪ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:২২


আবদাল আহমদ

আবদাল আহমদ

প্রিন্ট

চীন এখন বিশাল এক স্বপ্ন নিয়ে বিভোর। এটি হচ্ছে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ অর্থাৎ এক অঞ্চল এক পথ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। এতে আছে চীনের সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অন্তত ৭০টি দেশের জলে ও স্থলে সংযোগ স্থাপনের (কানেকটিভিটি) পরিকল্পনা। আছে এসব অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ, সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বাড়ানোর উন্নয়ন পরিকল্পনা। স্থলভিত্তিক সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট এবং সমুদ্রগামী মেরিটাইম সিল্ক রোড এই উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত। চীনাদের বিশ্বাস তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে নতুন করে চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান ঘটবে।
ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডকে সংক্ষেপে ‘ওবর’ অথবা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ ইনিশিয়েটিভও বলা হয়। এর মাধ্যমে চীন তার উন্নয়নের সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের উন্নয়নের যোগসূত্র রচনা করতে চাইছে। এটাকে চীন সম্মিলিত উন্নয়নের ‘চীনা স্বপ্ন’ বলে বর্ণনা করছে।
বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের ‘থিংক ট্যাংক ও মিডিয়া প্রতিনিধিদলে’র সদস্য হিসেবে সম্প্রতি বেইজিং, সাংহাই ও কুনমিং সফরে গিয়ে চীনের এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ হয়। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে চীন সরকার এই সফরের আয়োজন করে। সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপিকা সেলিনা মহসীনের নেতৃত্বে এতে কয়েকজন সাবেক রাষ্ট্রদূত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আইনজ্ঞ, উদ্যোক্তা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। সফরকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়ান ডিপার্টমেন্ট, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশন, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল, সাংহাই অ্যাকাডেমি অব সোস্যাল সায়েন্স, সাংহাই ফরেন প্রপাগান্ডা অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে বিষয়টির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
সেখানে লক্ষ করা গেছে, চীনাদের কাছে এখন একমাত্র অগ্রাধিকার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’। এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইটি) নামে চীনের নেতৃত্বে ১০ হাজার কোটি ডলারের মূলধনে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ ছাড়া চীন চার হাজার কোটি ডলারের সিল্ক রোড তহবিল গঠন করেছে। চীন এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়েছে। প্রকল্পটির ব্যাপারে চীনের সাথে ৪৪টি দেশের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রকল্পের সাথে জড়িত দেশগুলোকে আগ্রহী করে তোলার জন্য ইতোমধ্যে ২০টিরও বেশি দেশ সফর করেছেন।
ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নামের এই নতুন চীনা স্বপ্নের জন্মদাতা তিনিই। ২০১৩ সালের অক্টোবরে পৃথিবীর সামনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার এই ভিশনারি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। যা চীনের সাথে বাইরের দুনিয়ার সম্পর্ক পুননির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বিশ্বের একটি আলোচিত বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) এবং ট্রান্স আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ (টিটিআইপি) চুক্তির বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে।

প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিনিয়োগ
প্রাচীন সিল্ক রোডকে ভিত্তি করেই নতুন এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ প্রকল্পে জড়িত ৭০টি দেশে চার-আট লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হতে পারে। এতে তিনটি বেল্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে নর্থ বেল্ট মধ্য এশিয়া থেকে রাশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। সেন্ট্রাল বেল্ট মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিম এশিয়া হয়ে পারস্য উপসাগর এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত যাবে। আর সাউথ বেল্ট চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
অন্য দিকে মেরিটাইম সিল্ক রোডের মাধ্যমে যুক্ত করা হবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো এবং উত্তর আফ্রিকা। এটি দক্ষিণ চীন সাগর, দক্ষিণ প্রশান্ত সাগর এবং ভারত মহাসাগরকে এক বেল্টে নিয়ে আসবে। এ প্রকল্পে অর্থায়ন করার জন্য প্রতিষ্ঠিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের বৃহত্তম মালিকানা থাকবে চীনের হাতে। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশসহ ৫৭টি দেশ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এটি কার্যক্রম শুরু করেছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ এর সদস্য না হলেও কানাডা গত সেপ্টেম্বরে এর সদস্য হয়েছে। এ ছাড়া ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি ও ফিলিপাইনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোও এর সদস্য। বছরে ১০০০-১৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে ব্যাংকটির।
তবে ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের আগেই এ অঞ্চলের অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। কাজাখস্তানে তেল পাইপলাইন তৈরি করেছে চীন। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে চীনে তেল সরবরাহের জন্য আরো একটি পাইপলাইন বানিয়েছে চীন। এ অঞ্চলে সড়ক, সেতু ও টানেল নির্মাণ করছে চীনা কোম্পানিগুলো।

প্রকল্পে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য
ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের অংশ হিসেবে চীন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যেমন গুরুত্ব দিচ্ছে, তেমনি গুরুত্ব দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যকেও। চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নীতিতে ইরান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে চীনের এ প্রকল্প হতে হলে ইরানের পাশাপাশি মিসর ও ইসরাইলও চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে চীন মিসরে সাড়ে ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। ইরানের সাথেও চীন ছয় হাজার কোটি ডলারে বাণিজ্যচুক্তি করেছে। চীন সফলভাবেই মিসর, ইরান ও ইসরাইলকে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে ঢোকাতে পেরেছে।
এ দিকে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমারের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর। তেমনি চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মিয়ানমার- চারটি দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গড়ে তোলা বিসিআইএম করিডোরের আওতায় চীন ও ভারতের মধ্যে প্রথমবারের মতো এক্সপ্রেসওয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে যুক্ত করবে।
এ করিডোরের মাধ্যমে চারটি দেশের পণ্য ও জ্বালানির বাজার সুবিধা আরো সম্প্রসারিত হবে। এতে অশুল্ক বাধা কমবে, বাণিজ্য সুবিধা এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। এই করিডোর ১৬ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংযুক্ত করবে যেখানে বাস করছেন প্রায় ৪৪ কোটি মানুষ। বিসিআইএম করিডোরের ধারণাটি বহু আগে বাংলাদেশেরই দেয়া। ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ নামে চীনের কুনমিং এ অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতার এই ধারণাটি প্রথম দেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। এ জন্য তাকে বিসিআইএমের স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয়।
এই করিডোর সড়ক, রেল, নৌ ও বিমানপথে চীনের কুনমিং, ভারতের কলকাতা, বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের মান্দালয়কে যুক্ত করবে। বিসিআইএম করিডোর বাস্তবায়ন নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও ভারতের বিচ্ছিন্ন পূর্বাঞ্চলীয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো চীন ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় এখন ভারতও এই প্রকল্প নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) বাস্তবায়ন দ্রুত হচ্ছে। চীন এ লক্ষ্যে পাকিস্তানে প্রায় ৫০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এই রুটের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির। এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।
সিপিইসি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানে সাত লাখ লোকের সরাসরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে বলে আশা করছে পাকিস্তান সরকার। এতে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে ২-২.৫ শতাংশ হারে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে চীনের জিনজিয়াংয়ের সাথে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর যুক্ত হবে। পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরের মধ্যে মহাসড়ক নির্মাণ করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়। পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে আরো ১০,৪০০ মেগাওয়াট। ইতোমধ্যেই এই প্রকল্প আংশিক চালু হয়েছে। ডিসেম্বরের শুরুতেই ৫০০ টন পণ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো চীনের কুনমিং বন্দর থেকে একটি ট্রেন করাচির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

ভারত যে কারণে উদ্বিগ্ন
চীনের উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্প নিয়ে নয়াদিল্লির শাসকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এর কারণ প্রধানত তিনটি। প্রথমত, এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। দ্বিতীয়ত, ভারতের চির বৈরী পাকিস্তানে এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হবে এবং তৃতীয়ত, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি বাড়বে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের বন্দর উন্নয়নে চীন বিপুল বিনিয়োগ করবে। ইতোমধ্যে চীনের ১.৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তায় শ্রীলঙ্কার পোর্ট সিটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ভারতের আশঙ্কা এই প্রকল্পের অজুহাতে চীনা সাবমেরিন পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে অবস্থান করবে এবং চীন পারস্য উপসাগরে নজরদারি করবে। এই জলরাশি ব্যবহার করে বিশ্বের পরিবহন জাহাজের বেশির ভাগই ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে যাতায়াত করে। তবে ভারতের আশঙ্কা প্রশমনের কাজ করছে চীন। চীনারা সাধারণত সূক্ষ্ম কূটনীতির পথে চলে। মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে গ্যাস পাইপলাইন চীনের ইউনানে নিয়ে যাওয়া নিয়ে জটিলতা হয়েছিল। ভারত এ ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করলে চীন ভারতকে অংশীদার করে দেন। তেমনি শ্রীলঙ্কায় চীনের বড় বিনিয়োগ নিয়েও ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। চীন এখন এ প্রকল্পের সাথে ভারতকে জড়িত করে উদ্বেগের অবসান ঘটিয়েছে। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ও সিপিইসির ক্ষেত্রেও চীন একই নীতি অনুসরণ করতে পারে।

চীনকে জাগিয়ে তুলছেন শি জিনপিং
চীন সম্পর্কে এক সময় ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উক্তি ছিলÑ ‘চীন ঘুমন্ত পরাশক্তি’। কিন্তু নেপোলিয়নের ঘুমন্ত চীন এখন আর নেই। চীন জেগে উঠেছে এবং বিশ্বায়নকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে। আর ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড স্বপ্নের মাধ্যমে চীনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এখন সর্বাধিক আলোচিত নেতা। তাকে মাও সেতুং ও দেং শিয়াওপিংয়ের মতো প্রভাবশালী নেতা মনে করা হয়। দলে ও সরকারে তার একটি অনন্য অবস্থান তৈরি হয়েছে। তিনি চীন কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি এবং সে দেশের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সভাপতি। ৬৩ বছর বয়সী এই নেতা ২০১২ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। একটি অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী চীনের নেতারা ৬৮ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শি জিনপিংয়ের প্রথম মেয়াদ চলতি বছর শেষ হবে। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকবেন এটাই আশা করা যায়।
বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো সুদর্শন ও সুকেশধারী প্রেসিডেন্ট জিনপিংকে গত অক্টোবর মাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এক সম্মেলনে কোর লিডার বা মর্মস্থল নেতা ঘোষণা করা হয়। তার আগে মাও সেতুং ও দেং শিয়াওপিং এ উপাধি পেয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কোনো নেতাই বিরল এ সম্মানে ভূষিত হননি। এ ঘোষণার অর্থ হলো চীনের ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা তার আনুগত্য নিঃশর্তভাবে মেনে নিয়েছেন। জিনপিং যেভাবে চীনের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরেছেন তা অনেককেই বিস্মিত করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে স্বচ্ছ ভাবমর্যাদার অধিকারী জিনপিং ক্ষমতাসীন দলের বহু নেতা এবং ক্ষমতাধর সেনাকর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায়ে দণ্ড দিয়েছেন। প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ব্যাপারে তাকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে বিশ্বাসী বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে দক্ষতার জন্য তাকে অভিহিত করা হয় ‘ট্রাবলশুটার’ হিসেবে। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ও এক কন্যাসন্তানের জনক জিনপিং। তার বাবা মাও সেতুংয়ের সাথে লংমার্চের নেতা ছিলেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে মাও স্যুট গায়ে জড়িয়ে তিনি চীনের ভিক্টোরি ডেতে মিলিটারি প্যারেড পরিদর্শন করেন।
ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নীতি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার পর ২০১৪ সালের ১৫ মে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শি জিনপিং চীনের বন্ধুদের উদ্দেশে একটি ভাষণ দেন, এতে ১১৫টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেয়। তিনি বলেন, ‘চীন এই শতাব্দীর মাঝামাঝিতে একটি আধুনিক সমাজবাদী দেশে পরিণত হবে; যা বিত্তশালী, ক্ষমতাবান, গণতান্ত্রিক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগুয়ান দেশ হিসেবে চীনের জাতীয় নবায়নের স্বপ্ন সার্থক করবে। চীনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন পৃথিবীতে একটি বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে।’ ভাষণে তিনি আরো বলেন, শত শত নদী বরণ করেই সাগর বিশাল আকার ধারণ করে। চীন নিজেকে বহির্বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করবে, পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং সিল্ক রোড অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীর সমুদ্রগামী সিল্ক রোডের উন্নয়ন করবে। যাতে দেশগুলো তাদের উন্নয়ন সম্ভাবনা ভাগ করে নিতে পারে। অধিকতর উন্মুক্ততা নিয়ে চীন সাংস্কৃতিকভাব বিনিময় করবে, যাতে বিশ্ব সভ্যতা পারস্পরিক শিক্ষালাভের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়।’ তার এই চিন্তাধারার প্রতিফলনই ঘটেছে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উন্নয়ন কৌশলে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এর মাধ্যমে চীন বিশ্ব মঞ্চে বৃহত্তর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ চীনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে আসছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর এবং দুই দেশের নেতৃবৃন্দের আলোচনা ও সিদ্ধান্তে এ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ সুস্পষ্টভাবে বলেছে, চীনের উত্থাপিত এক অঞ্চল এক পথ কৌশল দুই দেশের সামনে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও অভিন্ন কল্যাণ লাভের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ঢাকায় চীনের প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে বলেছেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক অঞ্চল এক পথ কৌশল বাস্তবায়নে চীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমরা বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের কাঠামোয় দুই পক্ষের বাস্তব সহযোগিতা জোরদার করব যাতে দুই দেশের জনগণ সত্যিকার অর্থেই উপকৃত হয়।’ চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক প্রথম দফায় যেসব প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে, এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে। চীন বাংলাদেশকে ২৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তা প্রদানেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নিয়ে সমালোচনা
চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নিয়ে সমালোচনাও আছে। বলা হয়, চীন এই উদ্যোগের মাধ্যমে তার অর্থনীতির জন্য সর্ববৃহৎ ট্রেড প্রকল্প করতে যাচ্ছে। এতে চীনা পণ্যের মান বাড়বে কিন্তু পণ্যমূল্য কমই থাকবে। এ ক্ষেত্রে অনেক দেশ তার পণ্য নিয়ে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। ওপেন ইনফরমেশন চীনের মিলিটারি ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করবে এবং প্রত্যেকটি সাগর অঞ্চলে চাইনিজ আর্মি ট্রুপস ইজি এক্সেস পাবে। চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন বিশ্বে প্রথম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ এ সমালোচনা মানতে নারাজ। তাদের মতে যেকোনো দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন করতে হলে অবকাঠামোর উন্নতি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীন দেশগুলোকে সহায়তা করছে। এটাই চীনের নীতি। এতে উভয়ই লাভবান হচ্ছে। 

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫