ঢাকা, সোমবার,২৪ জুলাই ২০১৭

আগডুম বাগডুম

শীতের লাল সোয়েটার

নুরুল ইসলাম বাবুল

২১ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আজ শহর থেকে সোহানের আব্বু একটা সোয়েটার কিনে এনেছেন। তুলতুলে নরম। টুকটুকে লাল। সামনে দুটি খরগোশের ছবি। পেছনে একটি বিড়ালছানা নাচছে। এই সুন্দর শীতের সোয়েটারটা সোহানের জন্যই এনেছেন বাবা। দেখে খুব খুশি হলো সোহান। দাদাকে দেখাল। দাদীকে দেখাল। ছোট কাকুর কাছে গিয়ে তো হইচই শুরু করে দিলো।
গতবার শীতেও এ রকম ঘটনা ঘটেছিল বাড়িতে। তখন সোহানের ছোট খালা শহর থেকে এসেছিলেন। খুব একটা আসেন না ছোট খালা। যখন আসেন বাড়ির সবার জন্য পোশাক কিনে আনেন। গতবার এনেছিলেন শীতের গরম কাপড়। সবার জন্যই সুন্দর সুন্দর পোশাক এনেছিলেন। কিন্তু সোহানের কথা ওরটাই ছিল বেশি সুন্দর। কারণ সেটি ছিল লাল সোয়েটার।
গতবারের সেই খুশির কথা মনে আছে বাবার। ছেলের জন্য তাই লাল সোয়েটার কিনেছেন তিনি। এ নিয়ে দু’টি লাল সোয়েটার হলো সোহানের। খুশিতে নাচতে শুরু করল সোহান। ওর হাসিতে সারা বাড়ি আনন্দে ভরে উঠল। বাবা হাসলেন। দাদা-দাদী হাসলেন। মা সোয়েটারটা সোহানের গায়ে পরাতে পরাতে হেসে ফেললেন।
নতুন সোয়েটার গায়ে জড়িয়েই ভোঁ-দৌড় দিলো সোহান। এক দৌড়ে চলে গেল তপুদের বাড়ি। তপু ক্লাস থ্রিতে পড়ে। সোহানের সহপাঠী। ক্লাসের ফার্স্টবয় তপু। সোহান সেকেন্ড। দুইজন খুব ভালো বন্ধু। একসাথে স্কুলে যায়। প্রথম বেঞ্চে একসাথে বসে। স্কুল ছুটি হলে একসাথে বাড়ি ফেরে। বিকেলে এক সাথে খেলার মাঠে যায়। ঘুড়ি ওড়ায়। আবার সন্ধ্যার আগেই বাড়ি গিয়ে পড়তে বসে।
সোহান তপুকে পেল না। বারান্দায় বসে ছিল ওর দাদী। দাদীর কাছে জানতে পারল ও মাঠে গেছে। গরু-ছাগলের জন্য ঘাস কেটে তবেই বাড়ি ফিরবে।
তপুর বাবা কৃষি কাজ করে। গরু-ছাগল পালন করে। তপু ছুটির দিনগুলোতে বাবার সাথে কাজ করে। কখনো গরু-ছাগল মাঠে নিয়ে যায়। কখনো ঘাস কেটে আনে। জমি চাষ করতে, ধান লাগাতেও বাবাকে সাহায্য করে। সোহানের বাবা চাকরি করে। দাদার অনেক জমিজমা। অনেক গরু-মহিষ। বাড়িতে বেশ কয়েকজন লোক কাজ করে। তারাই ওসব দেখাশোনা করে।
সোহান হাঁটতে হাঁটতে মাঠের দিকে চলে গেল। তপু তখনো ঘাস কাটছিল। ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে গেল সোহান। পেছন থেকে তপুর চোখ ধরে ফেলল। তপু পেছনে হাত দিয়ে ওর গা ছুঁয়ে বলে ফেলল, সোহান। চোখ ছেড়ে দিয়ে সোহান সামনে দাঁড়াল। তারপর গায়ের সোয়েটার দেখিয়ে বলল, দেখ দেখ, এটি আজ আব্বু কিনে এনেছেন।
তপু তাকিয়ে থেকে দেখতে লাগল। কিছু বলছে না দেখে সোহান আবার বলল, কিরে সুন্দর না?
তপু মন খারাপ করে বলল, খুব সুন্দর। সোহান আরো বেশি খুশি হলো।
তপু বলল, আমারও লাল সোয়েটার খুব পছন্দ।
সোহান বলল, তোর আব্বাকে বলিস, কিনে দেবে। আমরা এক রকম সোয়েটার পরে স্কুলে যাবো।
তপু আস্তে আস্তে বলল, নারে কিনে দেবে না। গতবার তোর খালা যখন তোকে সোয়েটার দিলো, তখন আব্বুকে বলেছিলাম। প্রথমে কিনে দিতে চাইল। পনে বলল টাকা নেই।
তপু আরো বলল, জানিস সোহান, আমার মায়ের খুব অসুখ। বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। কাল রাতে আব্বু বললেন, গরুটা বেচে দিতে হবে। নইলে মাকে ডাক্তার দেখানো হবে না। আমাদের একটাই গরু। ওটার দুধ বেচেই বাবা হাটবাজার করেন। এবারো আমার লাল সোয়েটার কেনা হবে না। কথাগুলো বলতে বলতে তপুর চোখ জলে ভরে গেল।
তপুর কথায় খুব মন খারাপ হলো সোহানের। তপুকে রেখেই এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলো। কাউকে কিছু না বলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল। মা অনেক বলল তবু রাতে কিছুই খেল না সোহান।
শুধু ঘুমানোর আগে মায়ের কাছে তপুর কথাগুলো বলে ফোঁপাতে লাগল। মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখল বাবা আগেই অফিস থেকে এসেছেন। মা সোহানকে খেতে দিয়ে বললেন, খাওয়ার পর তপুকে ডেকে নিয়ে এসো। তোমার বাবা ওর জন্য একটা লাল সোয়েটার কিনে এনেছেন। সোহান মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মা দেখল, ছেলের চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫