ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

আগডুম বাগডুম

আফ্রিকার বাবুইয়ের বাবুয়ানা

রফিকুল আমীন খান

২১ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

রজনীকান্ত সেনের স্বাধীনতার সুখ কবিতাটি মনে আছে নিশ্চয়ই! ‘বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,/কুঁড়েঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই,/আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে/তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।/ বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তায়?/কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।/পাকা হোক, তবু ভাই, পরেরও বাসা, / নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচাঘর, খাসা।’
বাবুই পাখিদের বাবুয়ানা, বুঝলে তো! কত বড়াই নিজের বাসা নিয়ে? তবে কোনো সন্দেহ নেই, বড়াই ওরা করতে পারে। কারণ আসলেই ওরা বাসা তৈরিতে দারুণ পটু। সুঁতোয় আঁকাবাঁকা প্যাঁচে কাপড় বুনে তাঁতি যেমন সবার বাহবা কুড়ান, বাবুই পাখিরাও তেমনি খড়-কুটো দিয়ে নিখুঁত বাসা বানিয়ে দুনিয়াজুড়ে ওয়েবার বার্ড বা তাঁতিপাখি হিসেবে নিজেকে চিনিয়ে নিয়েছে।
তামাম দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত ১১৭ জাতের বাবুইপাখির সন্ধান পেয়েছেন পাখিবিদেরা। এর মধ্যে মাত্র তিন প্রকারের বাস আমাদের দেশে।
সব নিয়ে বলার সময় কই! এ আলোচনা শুধু আফ্রিকার বাবুইদের নিয়ে। আফ্রিকান এ বাবুই পাখিদের আচরণেও বাবুয়ানা চরিত্রটাই বেশি দেখা যায়। বড়ই বিচিত্র এদের চরিত্র। দাম্ভিকতায় পা মাটিতে পড়ে না যেন!
তবে এত দাম্ভিকতা যে এদেরই সাজে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ দুনিয়াতে এরাই একমাত্র পাখি, যারা সবচেয়ে বড় বাসা বানায়। কি, চোখ চড়কগাছ? হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওদের একেকটি বাসার ওজন কম করে হলেও দুই হাজার পাউন্ড। পাখিবিষয়ক জার্নাল ‘পিএলওএস ওয়ান’-এর ১৬ মার্চ ২০১৬ প্রকাশিত সংখ্যায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদের বাস আফ্রিকার নামিবিয়ায়। বিশালাকার এই বাসা নিয়ে পাখিবিদ ও বিজ্ঞানীদের ঘুম হারাম অবস্থা। চলছে বিভিন্ন গবেষণা। তবে শুধু আকারেই নয়, বাসা বানানোর কৌশলও দুনিয়ার তাবৎ অন্য বাবুই পাখিদের তুলনায় আলাদা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এরা নিজেরা বাসা বানায় না, বানিয়ে নেয়।
ছলে বলে কৌশলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পাখিদের বাসা বানানোর কাজে খাটায়। নিজে শুধু বাসার প্রকৌশলগত দিকে নজর দেয়। ঠিক যেমনটি আমাদের বাসাবাড়ি তৈরির সময় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারেরা করেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ জানো তো, বন্ধুরা! বাসা তৈরির সময় যাদের তোমরা ইট-বালু-সিমেন্ট নিয়ে হুড়োহুড়ি করে ছুটতে দেখো তারা নয়, বাড়ি বানানোর আসল কারিগর কিন্তু ওই সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা। বাড়ি বানানোর সময় এদের একটু ভুলে নেমে আসতে পারে রানা প্লাজার মতো মহাবিপর্যয়।
তাই আফ্রিকান বাবুইপাখিরা নিজেরা বাসা বানায় না ভেবে ওদের অলস ভেবে ভুল বুঝো না। ওদের গুরুত্ব আমাদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের মতোই। বুঝতেই পারছ, দুুই হাজার পাউন্ডের ওই বিশালাকার বাসা বানাতে ছোট্ট বাবুই পাখিকে কী পরিমাণে মাথা ঘামাতে হয়?
নকশা থেকে শুরু করে বাসা বানানো শেষ অবধি পুরো কাজই এদের তদারকিতেই শেষ হয়। কাজে ফাঁকি মারলে শ্রমিক পাখিদের আর রক্ষা নেই। ওদের ওপর চড়াও হতেও পিছপা হয় না বাবুই পাখি। বড় কিছু করতে হলে প্রয়োজনে এক-আধটু কঠোর হতেই হয় এই আর কি! তবে গবেষকেরা এদের এ আচরণকে কঠোরতা বলতে নারাজ। এটাকে চালাকি বা ক্ষিপ্রতা বলতে পছন্দ করেন।
বাসা তৈরির সময় ওদের এ বিচিত্র আচরণ নিয়ে চলছে বিভিন্ন গবেষণা। এ পর্যন্ত গবেষণায় যেটুকু বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন তা হলো, বাসা তৈরির সময় ওরা শ্রমিক পাখিদের চাপে রাখার কৌশল রপ্ত করেছে। আর কাজ শেষ হলে ওদের (শ্রমিকদের) তাড়িয়েও দিচ্ছে। আবার কখনো ফিরে এলে এবার কিন্তু কাছে টেনে নিতে ভুলে না ওরা। আগেরবার ভুল করেছে এই ভেবেই হয়তো ওদের এ পরিবর্তন।
২০১৪ সালে নামিবিয়ার ব্রিঙ্ক রিসার্চ সাইটে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির গবেষকেরা আফ্রিকান বাবুদের ওই সব বাবুয়ানা চরিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের ওই পর্যবেক্ষণই প্রকাশ করা হয় জার্নাল পিএলওএস ওয়ানে।
বুঝতে পারছ এত বিশালাকার বাসা একা থাকার জন্য তৈরি করে না আফ্রিকান বাবুই পাখিরা। দল বেঁধে বাস করে। এ কারণে বাসা বানানোর সময় সবাই মিলে কাজ করে। যাতে সবারই ভালো হয় এমন বাসাই বানায় ওরা। তেমনটাই জানিয়েছেন গবেষক গ্যাভিন লেইটেন।
তবে ক্ষিপ্রতাই ওদের এত বিশাল বানাতে প্রলুব্ধ করে বলে জানিয়েছেন নিউ ইয়র্কের ওই পাখিবিদ। তিনি নিউ ইয়র্কের কর্নেল ল্যাবরেটরি অব অর্নিথোলজির পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। গবেষণাকালে তিনি প্রায় সব বাবুই পাখির মাঝেই ক্ষিপ্রতা দেখতে পান। ‘এ গুণটাই ওদের এত বড় বাসা বানাতে সহায়তা করে থাকতে পারে’ বলে জানান তিনি।
এবার তোমাদের মাথায় একটা প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, এত বড় বাসা গাছের ডালে থাকে কী করে? সোজা উত্তর, গাছ ও বাসা দুটোই বেশ মজবুত হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। গাছের কথা বাদ দেই, বাসার কথাই বলি। বাসা কতটা মজবুত তার বর্ণনা জার্নালে দিয়েছেন গ্যাভিন লেইটেন।
তার বর্ণনা মতে, একেকটি বাসা অন্তত এক টন ওজনের ঝাঁকুনি সহ্য করতে পারে। আর বাসার আকার ২০ ফুট (৬ মিটার) পর্যন্ত হতে পারে। এতে অসংখ্য চেম্বার বা প্রকোষ্ঠ থাকে, যেগুলোর একেকটিতে বাবুই পাখিদের একেকটি পরিবার থাকে। সেখানেও ওরা ডিম পাড়ে ও বাচ্চা ফোটায়। তবে মা-বাবা একই গোত্রের না হলে বেশি দিন এক সাথে থাকা ওদের পক্ষে কষ্টকর হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ নিজেদের মাঝে বোঝাপড়াটা ঠিকমতো হয়ে ওঠে না আর কি। তখন ওরা বেশি সুখের আশায় স্বজাতের সাথে বাসা বাঁধতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। ঠিক যেমনটি আমাদের সমাজে মা-বাবার মাঝে মনের মিল না হলে যা হয়। বিয়ের বেশি দিন যেতে না যেতেই সংসারে মনোমালিন্য ও এক সময় বিচ্ছেদ।
আমাদের সাথে ওদের কত মিল, তাই না? হতেই হবে। কারণ ওরাও তো আমাদের মতো সামাজিক জীব। ওদের এ আচরণকে এককথায় ‘খুবই চমৎকার’ বলে মন্তব্য করেছেন ওদের ওপর গবেষণায় ব্যস্ত আরেক গবেষক যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের পাখিবিদ রিনে ভ্যান ডিক।
তার কাছে বাসা বানানোর সময় আফ্রিকান বাবুই পাখিদের ওই ক্ষিপ্র আচরণকে ‘খুবই বিরল’ ঘটনা বলেও মনে হয়েছে। বাসা বানানোর সময় অন্তত ৫০ শতাংশ পাখি এ আচরণ করে থাকে। আবার তাদের বেশির ভাগই পুরুষ পাখি। বাসা বানানোর কাজে অনীহা যাদের, তাদের শায়েস্তা করা প্রয়োজন মনে করে ওসব পুরুষ পাখি।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫