ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ মার্চ ২০১৭

গল্প

অপেক্ষা

রেজাউল করিম খোকন

১৯ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:২৪


প্রিন্ট

ঘুম ভেঙেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। কিন্তু তারপরও বিছানায় শুয়ে আছে সুরভি। বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করছে না একদম। ভীষণ ক্লান্তি আর অবসন্নতা ভর করে আছে শরীরজুড়ে। মানসিকভাবেও যেন শক্তি পাচ্ছে না। এক ধরনের বিষাদময় অনুভূতি গ্রাস করেছে তাকে। কিছুক্ষণ আগে একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে সুরভির। এটা ভালো স্বপ্ন, না খারাপ স্বপ্ন। শুয়ে শুয়ে ভাবছে সে। বলা যায়, স্বপ্নটা তাকে আছন্ন করে রেখেছে। লোকে বলে, ভোরের দিকে দেখা স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। তাহলে কি সে আবারো ...। নাহ, আর ভাবতে পারে না সুরভি। পাশের বিছানায় মেয়ে দু’টি ঘুমাচ্ছে। ওর পাশে কাত হয়ে শুয়ে শরিফ। সেও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার হালকা নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
বড় মেয়ে সাদিয়ার আজ স্কুল নেই। তা না হলে এতক্ষণে ওর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। যদিও গত কয়েক দিন ধরে সকালে কাজকর্মের ধকলটা ভালো লাগছে না। শরীরটা আর সায় দিচ্ছে না আগের মতো। খুব দুর্বল লাগে আজকাল। ইচ্ছে করে শুধু শুয়ে থাকত।
প্রেগন্যান্সির এ সময়টাতে প্রত্যেক মায়েরই এমন লাগে। এর আগে দুই মেয়ের মা হয়েছে সুরভি। তখনো দেখেছে, অনুভব করেছে প্রেগন্যান্সির নানা পর্যায়। কিন্তু এবার যেন অন্যরকম মনে হচ্ছে। আগের দু’বারের চেয়ে এবার শরীরটা অনেক বেশি খারাপ লাগে। এর মধ্যে নানা উপসর্গ ভাবিয়ে তুলেছে তাকে। নিয়মিত চেকআপ চলছে। ডাক্তার বলেছে, বেশি বয়সে মা হতে গেলে একটু আধটু সমস্যা তো হবেই। এর মধ্যে চেকআপে সুরভির ডায়াবেটিস ধরা পরেছে, প্রেসারও বাড়তির দিকে। হাত ও পায়ে পানি এসে ফুলে গেছে খানিকটা। শরীরটাও অনেক ভারী মনে হচ্ছে। ডাক্তার সাবধানে চলাফেরা করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
শরিফ ওর বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। যদিও ওর আরো তিন বোন আছে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। অনেক বড় ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র ছেলে হিসেবে শরিফকে একাই সব দেখতে হচ্ছে। যদি তার আরো ভাই থাকত তাহলে এতটা চাপ পড়ত না তার ওপর। গার্মেন্টস, ইন্ডাস্ট্রি, এক্সপোর্ট- ইমপোর্টের ব্যবসা, পাওয়ার প্লান্টÑ এত ব্যবসা-বাণিজ্য শরিফ একা একা সামলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে। ওর বাবা বুড়ো হয়েছেন, তার পরেও ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ান মাঝে মধ্যে। কিন্তু সব সময়ে তো পারে না। শরিফের উত্তরাধিকার হিসাবে এত ব্যবসা-বাণিজ্য, ইন্ডাস্ট্রি, গোটা সাম্রাজ্যকে দেখাশোনা করবে, এ জন্য ছেলে সন্তান দরকার।
কয়েকটা না হোক, অন্তত একটা ছেলে সন্তান হলে শরিফের অবর্তমানে সবকিছুর দায়িত্ব নিতে পারবে উত্তরাধিকারী হিসেবে।
সুরভির শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদের একই কথা। যেভাবেই হোক একটা ছেলের মা হতে হবে তাকে। পরপর দু’টি মেয়ে হওয়ায় সুরভিকে অনেক খোটা শুনতে হয়েছে। শাশুড়ি তো সুযোগ পেলেই নানা কথা শোনায়।
সুরভি বুঝে গেছে, শ্বশুর-শাশুড়ির অন্য চিন্তা-ভাবনাটা কি? তারা পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষা করতে উত্তরাধিকারী হিসেবে যে করেই হোক শরিফের একটি ছেলে চায়। তা না হলে প্রয়োজনে ছেলের জন্য আরেকটা বউ আনতে দ্বিধা করবে না। শরিফদের অর্থবিত্তের বৈভবের অভাব নেই। এখনো অনেক মেয়ে চোখবুঁজে রাজি হয়ে যাবে শরিফের দ্বিতীয় বউ হতে। যদি শেষ পর্যন্ত তাই হয়, কী হবে সুরভির ? নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে সে।
আচ্ছা, সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে এর ওপর তো সুরভির কিংবা শরিফ কারোই হাত নেই। এটা তো নির্ধারণ করেন সৃষ্টিকর্তা, তার ইচ্ছাতেই সন্তান ছেলে কিংবা মেয়ে হয়। এখানে সন্তানের বাবা-মায়ের কিছুই করার নেই। নিজেকে নানাভাবে প্রবোদ দিতে চেষ্টা করে সুরভি। এতদিন গ্রামের কিংবা শহরের বস্তির অনেক মহিলাকে দেখেছে। ছেলে সন্তান জন্ম দিতে না পারায় স্বামী তাদের ত্যাগ করেছে কিংবা ছেলে সন্তানের আশায় স্বামী আবার বিয়ে করেছে। সুরভি তো সেরকম পরিবারের মেয়ে নয়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া শিক্ষিত সংস্কৃতিমনা আধুনিক মনস্ক পরিবারের মেয়ে। শরিফদের পরিবারও শিক্ষিত, ধনাঢ্য, প্রভাবশালী। অভিজাত এলাকায় তাদের বসবাস। তেমন একটি পরিবারের বউ হলেও এখন নিয়তির দোষে সুরভির অবস্থান গ্রামের অশিক্ষিত, বিত্তবৈভবহীন সাধারণ এক গৃহবধূর মতোই। ছেলে সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সুরভি তাদের মতো এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছে। অথচ বাইরে থেকে তাকে দেখে সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। সবাই জানে বড় লোকের বউ দারুণ সুখে আছে সে।
শরিফ কিছুক্ষণ আগে অফিসে চলে গেছে। পাশের লিভিং রুমে বসে মেয়ে দু’টি টিভিতে কার্টুন দেখছে। ডোরেমন কার্টুন সিরিজ ওদের ভীষণ প্রিয়। ডোরেমন দেখার সময় ওরা খাওয়াদাওয়ার কথা ভুলে যায়। সাদিয়া নাদিয়ার সাথে বসে সুরভিও কার্টুন দেখছিল। হঠাৎ সেখানে ওর শাশুড়ি এসে ধমকে ওঠেন।
‘কি গো, সাদিয়ার মা, তোমার কি আক্কেল বুদ্ধি লোপ পেয়েছে?’ এই সময় পেটে সন্তান নিয়ে টিভিতে কার্টুন দেখতে বসেছ? সন্তানের চেহারাও তো কার্টুনের মতো হবে, তখন সেই সন্তান নিয়ে মুখ দেখাবে কী করে?’
শাশুড়ির কথায় মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়। সেখানে একমুহূর্তও বসে থাকতে পারে না। নিজের বেডরুমে চলে আসে। ভীষণ কান্না পায় সুরভির। এ সময় তাকে সহানুভূতি জানাতে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না, মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেয় না। নিজেকে চরম দুর্ভাগ্যের শিকার পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় একজন মেয়ে মানুষ মনে হয়।
শরিফকে নিজের মনের কথাগুলো বলতে চেয়েছে সুরভি অনেকবার। কিন্তু সুরভির কোনো কথাই শুনতে রাজি নয় মানুষটা। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, সেই মানুষটা বিয়ের পর ধীরে ধীরে বদলে গেছে। এখন শরিফকে অন্য একটা মানুষ মনে হয়। অনেক কাছের সেই প্রিয় মানুষটা এখন অনেক দূরের মানুষ হয়ে গেছে। সুরভির একান্ত দুঃখ বেদনাগুলো এখন আর স্পর্শ করে না তাকে।
ছেলের মা হতে না পারলে শরিফের পরিবারে তার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, শরিফের সাথে দাম্পত্য সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটবে, যদি তার আবারো মেয়ে হয় তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হয় কে জানে?
সেই থেকে কয়েকটি মাস পেরিয়ে গেছে। প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্তে কিভাবে কাটছে সেটা একমাত্র উপলব্ধি করছে সুরভি নিজে। প্রেগন্যান্সির এই পর্যায়টা বেশ কষ্টের। সেই সময়গুলোতে যখন একজন মায়ের দুশ্চিন্তাম্ক্তু হালকা ঝরঝরে ভাব নিয়ে থাকা প্রয়োজন অনাগত সন্তানের মঙ্গলের জন্য, সেই সময়ে অনাগত সন্তানের কথা ভেবে একটা শঙ্কাভাব চেপে আছে মনে। অপেক্ষার প্রহরগুলো যেখানে মধুর একটা অনুভূতিতে জড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভয় আর আতঙ্কের দুঃসহ সময় পার করছে সে।
নিজের অসহায় অবস্থা ভেবে বুকচিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সুরভির।
গ্রামের সাধারণ এক গরিব অসহায় গৃহবধূ, যে স্বামীর সংসারে নানা নির্যাতন আর বঞ্চনার শিকার হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে তার সাথে কোনো পার্থক্য নেই সুরভির। এই শহরে ভদ্র শিক্ষিত ধনাঢ্য অভিজাত পরিবারের বউ হয়েও সে একই অবস্থানে রয়েছে। চরম অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাকে গ্রাস করতে থাকে ক্রমেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫