ঢাকা, বুধবার,২৪ মে ২০১৭

ভ্রমণ

তেওতা জমিদার বাড়ি

মো: জাভেদ হাকিম

১৪ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৮:১৪


প্রিন্ট

হুট করেই একদিন রওনা দেই তেওতা জমিদার বাড়ি। আরিচা হাইওয়ে রোড ধরে গাড়ি চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ কেটে স্মৃতিসৌধ পেছনে ফেলে, গাড়ি চলছে ফাঁকা রাস্তায়, চালকের ইচ্ছেমতো গতিতে। নবীনগর থেকেই যেন সবুজে মোড়ানে মায়াবী পথের শুরু। ঢাকা জেলার শেষসীমা ধামরাইয়ের নির্মল বাতাসে, কাঁচা-পাকা ফসলের ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে আমরা এগিয়ে যাই কালের সাক্ষী পাচুর বাড়ির খোঁজে। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী যেতেই দেখি পথের পাশে এক চায়ের দোকানি গরুর দুধের চা বানাতে ব্যস্ত। অমনিই গাড়ি ব্রেক। গরুর দুধের চা বলে কথা। এই মামা বানাও কয়েক কাপ, সাথে দাও মালাই। দোকানির হাসিমাখা আপ্যায়ন আর কাপ-চামুচের টুংটাং শব্দ শেষে চায়ে দেই চুমুক। আহ! কী স্বাদ; এক্কেবারে খাঁটি দুধের চা। মনে থাকবে রে ছৈয়াল বহু দিন তোর চায়ের কথা। ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেই।
গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর বামে চলে যায় মানিকগঞ্জ শহর আর আমরা চলি সোজা পথে। শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাটের কাছাকাছি গিয়ে প্রমত্তা যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে উত্তর দিকে চলে যাই তেওতা গ্রামের দিকে। গ্রামে ঢুকতেই এক অন্যরকম ভালোলাগা ভর করে মনে। জরাজীর্ণ বাড়ির বিশাল আঙিনায় দাঁড়িয়ে হারিয়ে যাই জমিদারদের অতীত ইতিহাসে। পাশেই ঘাটলা বাঁধা পুকুর, মাঝে নজরুল-প্রমীলা সড়ক। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭০০ শতকে নির্মিত এ বাড়িটি। আমরা বাড়ির ভেতর-বাহির ঘুরে ঘুরে দেখি। দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পুরাকীর্তি স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম নিদর্শন। বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা পাঁচুর উত্তরাধিকার জমিদার শ্যামশংকর রায় বাড়ির আঙিনায় পূজা উৎসবের জন্য নবরতœ মঠটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই তেওতা গ্রাম কবি নজরুল ইসলামের আগমনের জন্যও বেশ পরিচিত। জাতীয় কবি এখানে বেশ কয়েকবার এসেছিলেন। তবে প্রথমেই জেনে নেই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা পাঁচুর গল্প।

পাঁচুর ভালো নাম পঞ্চানন সেন। জনশ্রুতি রয়েছে পিতৃহারা পাঁচুর মা বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে নিয়ে দিনানিপাত করতেন। মা আদর করে পঞ্চাননকে পাঁচু বলে ডাকতেন। একদিন ছেলে মাছ খাওয়ার বায়না ধরে। মমতাময়ী মা ছেলের আবদার রাখতে গিয়ে জেলের কাছ থেকে দুই পয়সা বাকিতে মাছ ক্রয় করেন। কথা ছিল দুপুরের মধ্যে দুই পয়সা পরিশোধ করবেন। কিন্তু পয়সা জোগাড় হলো না। দুপুরে জেলে এসে হাজির। বকেয়া পরিশোধ করতে না পারার কারণে কঠিন হৃদয়ের জেলে রান্না করা মাছই নিয়ে গেল। ক্ষোভে দুঃখে বাল্য বয়সের পাঁচু যমুনার ওপার গোয়ালন্দ গিয়ে এক বড় ব্যবসায়ীর গদিতে কাজে লেগে যায়। এরপর কর্মঠ পঞ্চানন সেন নিজ দক্ষতায় বড় তামাক ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। গড়ে তোলেন দিনাজপুরে জমিদারি। এর পর নিজ জন্মভূমি তেওতা ফিরে গ্রামে এসে মায়ের নামে অনেক জমি কেনেন। প্রতিষ্ঠা করেন তেওতা গ্রামের প্রথম জমিদারি। জমিদারি বিস্তৃত ছিল ঢাকা জেলা, ফরিদপুর ও পাবনা জেলার অনেকাংশ জুড়ে। পরবর্তী জমিদার শ্যামশংকর ও হেম শংকর নামক দুই ভাইয়ের বসতিও ছিল এই বাড়িটি। মূল ভবনে মোট ৫৫টি ঘর রয়েছে। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে একেবারে বাড়ির ছাদে গিয়ে ওঠে। ভবনের অবস্থা এতটাই শোচনীয়, যেকোনো সময় তা ধসে পড়তে পারে। এরকম একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার এমন করুণ দশা দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এই বাড়ির জমিদার কিরণ শংকর রায়ের আমন্ত্রণে কবি এখানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। প্রণয় সূত্রে এই গ্রামের মেয়ে প্রমীলার সাথে সংসার বেঁধেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার একবার কবির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করলে তিনি এই তেওতা গ্রামেই আত্মগোপন করেন। নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলামের গবেষণায় জানা যায়, কবি এই তেওতা গ্রামের জমিদারের পুকুর পাড়ে ‘লিচু চোর’ কবিতাসহ আরো অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। জমিদার বাড়ির গানের আসরে প্রমীলাকে উদ্দেশ করে ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’ কালজয়ী এই গানটিও গেঁথে ছিলেন। তেওতা গ্রামের মানুষগুলোর কাছে কবি বেশ প্রিয় ছিলেন। তেওতার বংশপরম্পরায় জমিদারেরা বেশ প্রজাহিতৈষী ও বিভিন্ন সমাজ গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদান রেখেছেন। নিজ কর্মচারীদের প্রতিও ছিল তাদের উদার মানসিকতা। ইতিহাসের উজ্জ্বল সাক্ষী এই তেওতা জমিদার বাড়ি নব প্রজন্মদের জন্য সংস্কার ও সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
তাহলে বন্ধুরা আর দেরি কেন? দিনে দিনে ঘুরে আসুন যমুনার কোলে নজরুল স্মৃতিবিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়ি থেকে। কথা দিচ্ছি- সব মিলিয়ে অসাধারণ কিছু ভালো লাগার মুহূর্তের সুখস্মৃতি নিয়েই ঘরে ফিরবেন।
যোগাযোগ : নিজস্ব বা ভাড়া করা গাড়িতে গেলে সুবিধা বেশি। যখন ইচ্ছে তখন গাড়ি থামিয়ে যেকোনো কিছুর আনন্দ শেয়ার করা যাবে। এ ছাড়া গাবতলী (মিরপুর) আন্তঃজেলা বাসটার্মিনাল থেকে যাত্রীসেবা, বিআরটিসি, পদ্মালাইনসহ বিভিন্ন পরিবহনে আরিচা ঘাট। ভাড়া ৬০-৮০ টাকা। আরিচা ঘাট থেকে অটো বা রিকশায় যাওয়া যাবে পাঁচু নির্মিত তেওতা জমিদার বাড়ি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫