ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

আল্লাহ গাফুরুর রহিম

মুহম্মদ আলতাফ হোসেন

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:২৩


প্রিন্ট

মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সৃষ্টিকর্তা,মনিব,মালিক রিযিক দাতা। এক কথায় তিনি সমগ্র আসমান জমিনের মালিক ও পরিচালক এবং তার জ্ঞানের বাইরে কোন কিছুই সংঘটিত হয় না। তার কোন শরীক নেই, তিনি কাউকে জন্ম দেনও নাই, কারো থেকে জন্ম নেনও নাই। তার সমকক্ষ কেউ নেই, তিনি চিরঞ্জীব এবং চিরস্থায়ী।
আল্লাহ শব্দটি তাঁর জাতি বা সত্তাবাচক নাম। এ শব্দের কোন প্রতিশব্দ নেই। আল্লাহ নামের কোন লিঙ্গান্তর বা কোন বচন নেই। পৃথিবীর কোন ভাষায় এর অনুবাদ করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র সৃষ্টি জগতের অধিকর্তা মহান মহীয়ান আল্লাহ নিজেই তাঁর পরিচিতির জন্য এই নাম ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ বলতে যে শুধু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে বুঝায় এটাই সঠিক। কারণ কোনো কাফের মুশরিক, বেদ্বিন কেউই একথা বলে না যে আল্লাহ তাদের দেবতা। ভগবানকে আল্লাহ বলে না। আল্লাহ এমন এক সত্তা যার পরিচয় তাঁর রাসূল (সা:) মক্কায় কাফিরদেরকে দিয়েছিলেন। সূরা ইখলাসে, আয়াতুল কুরসি ও কালামে পাকের আরো অনেক জায়গায় আল্লাহ পাক নিজেই তাঁর পরিচয় তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলতে আমারা শুধু অদ্বিতীয় এক সত্তাকে বুঝি। যাকে দেখা যায় না। কিন্তু বিপদে ডাকলে তিনি সাড়া দেন। ঘোর বিপদে যখন পৃথিবীর কেউই সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না, তখন তিনি সাহায্য করেন। আল্লাহ পাকের শান বলে শেষ করা যাবে না, তবে পবিত্র কুরআনে তার ৯৯টি নাম রয়েছে। আসমান ও জমিনে সব কিছুই তাঁর অধীন। তিনি কখনো ঘুমান না, তন্দ্রা বা ঘুমও তাঁকে স্পর্শ করে না। আসমান ও জমিনের সবকিছু তার ক্ষমতার অধীন। কেউ ইচ্ছা করেও তাঁর ক্ষমতার বাইরে যেতে পারে না। এ সম্পর্কে সূরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছে : নিঃসন্দেহে আল্লাহ সকল ক্ষমতার মালিক’ (বাকারা-১৪৫)।
আল্লাহ যেহেতু সবকিছুর মালিক, অতএব সকল সৃষ্টি একমাত্র তাঁর হুকুম মতো চলবে। তাঁরই আনুগত্য করবে। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আল্লাহর আদেশ মেনে চলতে বাধ্য। আল্লাহ পাক বলেন : আসমান ও জমিনে যা কিছু আছেÑ ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সবই আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে’ (আলে ইমরান-৮৩)।
সকল নবী রাসূলের দাওয়াত ছিল : হে আমার জাতি, তোমরা একমাত্র আল্লারই ইবাদত (দাসত্ব) কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ (মাবুদ) নাই।
এই বিশাল পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, বৃক্ষলতা, মানব-দানব, পশু-পাখি, সাগর-পাহাড় সবকিছু যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আল্লাহতায়ালা। তিনি সর্বশক্তিমান অনন্ত মহিমায় অদ্বিতীয়। তিনিই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা ও পালনকারী। খাওয়া পরা,রোগ-শোক মৃত্যু কোনো কিছুই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। হায়াত ও মউতের মালিক তিনিই। রিজিকদাতা, আইন এবং বিধানদাতাও একমাত্র তিনি। আমাদের মনের কোণে যে কথা লুক্কায়িত থাকে তিনি তাও জানেন। আর তাঁর ক্ষমতায় বাধা দিতে বা প্রতিবাদ করতে পারে এমন শক্তিধর আর কেউ নেই। মহান আল্লাহতায়ালার মাঝে এইসব অসীম গুণাবলি বিদ্যমান এবং তিনি ছাড়া আর কেউই ইলাহা বা ইবাদতের যোগ্য নেই।
সৃষ্টি জগতের সকলকেই আল্লাহর উপর ঈমান আনতে হয়। মুসলমান হিসেবে আমাদের কর্তব্য মুখে স্বীকার করা এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা যে মহান সত্তা আল্লাহ নামে পরিচিত। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নাই। এই ঈমানের দাবি হলোÑ আর সব কিছুকে বর্জন করে কেবল তাঁরই প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় স্থাপন করা, তাকেই ভালোবাসা, তাঁকেই ভয় করা, তাঁরই কাছে প্রার্থনা করা, তাঁরই কাছে কামনা করা, সর্বাবস্থায় তাঁরই উপর ভরসা রাখা, সর্বদা মনে রাখা একদিন তাঁর নিকট সকলকে ফিরে যেতে হবে এবং ভালো বা মন্দ পরিণতি তাঁর ফয়সালার উপরই নির্ভরশীল। ঈমানদারগণ কিয়ামতের দিন এই মহান প্রভু আল্লাহতায়ালার দিদার লাভ করে ধন্য হবেন।
আল্লাহ এক তাঁর কোনো অভাব নেই। তিনি কাকেও জন্ম দেন নাই এবং তিনি কারো থেকে জন্ম নেন নাই। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। তিনি তন্দ্রা ও নিন্দ্রা গ্রহণ করেন না। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন।
পবিত্র কুরআন পাকে উল্লেখ করা হয়েছে : তিনিই একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি দৃশ্য-অদৃশ্য এবং উপস্থিত-অনুপস্থিত সব বিষয়েই পুরাপুরি জ্ঞান রাখেন, (সূরা হাশর-২২)। অন্যত্র বলা হয়েছে : তিনি সেই আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীন এবং এর মধ্যবর্তী স্থানের সব কিছুর সৃষ্টিকারী। তিনি আলিমুল গায়িব। তিনি সব জায়গায়ই বিরাজমান। তিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছুই দেখেন ও খবর রাখেন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছেÑ আল্লাহ সকল দৃশ্য-অদৃশ্য ও উপস্থিত অনুপস্থিত সকল বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞাত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই সব প্রাণীর রিজিকদাতা। কোন সৃষ্টিকেই তিনি রিজিক থেকে বঞ্চিত করেন না। সকল প্রাণী সৃষ্টির পূর্বেই তিনি তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সব প্রাণীকেই তিনি রিজিক দেন এবং প্রতিপালন করেন। কুরআন পাকে উল্লেখ আছ : এই দুনিয়াতে এমন কোনো বিচরণশীল জীব বা প্রাণী নেই যার খাদ্যের দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই সকল প্রাণীর খাদ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
মহান আল্লাহতায়ালা ক্ষমাশীল। তাঁর সৃষ্টি জীবের মাঝে কেউ অন্যায় বা ভুল করে যদি আবার তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। কেউ তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি ফিরিয়ে দেন না, তাই পবিত্র কুরআন মজিদে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ গাফুরুর রাহীম। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল’ (আলে ইমরান-৩১)।
যদি মহান আল্লাহ একক না হতেন তাহলে এ বিশ্ব পরিচালনায় গোলমাল দেখা দিত। একজন সূর্যকে পূর্ব দিক হতে উদিত হতে বলতেন, আর অন্যজন পশ্চিম দিক হতে উদিত হতে বলতেন। আল্লাহপাক যে একক এর বহু প্রমাণ দুনিয়াতে রয়েছে। যদি মানুষ চিন্তা করে তা হলে বুঝতে পারবে। পবিত্র কালামে পাকে বর্ণিত হয়েছ ঃ ‘আসমান ও যমীনে যদি এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ থাকতো তা হলে আসমান ও যমীন বিপর্যস্ত হয়ে যেতো’ (সূরা আম্বিয়া-২২)।
মহান আল্লাহতায়ালা এমনই এক সত্তা যার কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করে কেউই বিফল হয় না। মানুষের যা কিছু প্রয়োজন কেবল আল্লাহ পাকের নিকটই তা কামনা করা বা প্রার্থনা কর কর্তব্য। এটা একটা স্বাভাবিক নিয়ম যে সৃষ্টি তার স্রষ্টার কাছে তার প্রয়োজন পূরণের জন্য কামনা করবে। যিনি সৃষ্টি করেছেন কেবল তিনি পারেন তার বান্দার আশা আকাক্সক্ষা পূরণ করতে। এই জন্য পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমার কাছে প্রার্থনা করে তখন আমি তার প্রার্থনা কবুল করি’ (বাকারা-১৩৬)।
মূলত কোনো মানুষের পক্ষে মহান আল্লাহর পরিচয় দেয়া সম্ভব নয়। এ জন্য পবিত্র কুরআন মজিদের সুরা এখলাসে তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন। যুগ-যুগান্তর ধরে দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর স্বরূপ নির্ধারণ বা উদঘাটন করতে গিয়ে যেসব ভ্রান্ত ধারণা-বিশ্বাসের শিকার হয়েছে, এ সূরার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা সেসব ধারণা বিশ্বাসের মূল উৎপাটন করেছেন।
লেখক : প্রবন্ধকার, সাংবাদিক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫