ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগ জামাত

ফয়সল আহমদ জালালী

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১৯


প্রিন্ট

হে রাসুল! তোমার প্রতি পালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা তুমি (অন্যের কাছে) পৌঁছে দাও। (সুরা : মায়িদা, আয়াত: ৬৭) বর্তমান তাবলীগ জামাতের প্রেরণা এ হতে হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। যারা দাওয়াতি কাজ করেন তাদের সবার কাছেই এই আয়াত দলিাল হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া রাসুল (সা:) তাঁর উম্মতের প্রতি দাওয়াতি কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমরা একটি আয়াত হলেও আমার পক্ষহতে পৌঁছে দাও। বিদায় হজ্বের সময় রাসুলুল্লাহ্ সা. উম্মতের প্রতি অনেকগুলো দিক নির্শেনা দিয়েছিলেন। মানুষের জান, মাল ও মান-মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে ছিলেন। এ নির্দেশনাগুলো সর্বকালের মানুষের কাছে যাতে সমানভাবে গুরুত্ব বহ হয় সেজন্য তিনি সেগুলো অপরাপর মানুষের কাছে তাবলীগ বা প্রচার করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে যে উপস্থিত রয়েছে, সে যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছিয়ে দেয়। (ইমাম বুখারী, আস-সহীহ্, হাদীস নং-১৭৩৯)। ইসলামের পথে কিভাবে মুসলিমগণ পরিচালিত হবে, তাদের ঈমান-আমল কিরূপে সুদৃঢ় ও সুন্দর হবে, রাসুলের আদর্শে কি ভাবে মানুষ আদর্শবান হবে, অন্যায়ের পথ পরিহার করে ন্যায়ের পথে ফিরে আসবে ইত্যাদির চর্চা করা হয় তাবলীগ জামাতে। সালাত অর্থ হল দু’আ। সালাতের মাঝে শুধুই দু’আ রয়েছে, একথার দাবি করা যাবেনা। হ্যাঁ, কিছু কিছু স্থানে দু’আ রয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে তাবলীগ জামাতে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের সাথে প্রচার ও পৌছিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে।
মানুষ কে আল্লাহর পথে আহবান জানানোর এ পথটি উদ্ভাবন করেছিলেন অনারব একজন নিবেদিত প্রান আল্লাহর বান্দা- হযরতজী আল্লামা ইলিয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। আরবের উলামায়ে কিরাম ও সেখানকার মুসলিমগন প্রথম দিকে দাওয়াতী এ পন্থার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। সেখানকার অনেক উলাময়ে কিরামের সাথে আমি মতবিনিময় করেছি। আগে তাদের কে এব্যাপারে যতটুকু সর্তক অভিমত প্রকাশ করতে দেখেছি এখন তার লেশমাত্রও নেই।
দিল্লির নিজাম উদ্দীন হতে তাবলীগ জামাতের সূচনা হয়। এখানে রয়েছে প্রসিদ্ধ একটি মাজার। বিখ্যাত সূফী সাধক নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রাহ.) এর কবরস্থান। এ উপমহাদেশের সাধারন কিছু মানুষ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় মাজার সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ে। আরবের উলামায়ে কিরাম মাজার কেন্দ্রিক কাজকর্ম কে ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। সেখানকার উলামায়ে কিরামের এক সময় সন্দেহ ছিল তাবলীগ জামাত মাজার আশ্রিত কোন দল হতে পারে। বর্তমানে বিষয়টি তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আল্লামা ইলিয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সহ তাবলীগের শীর্ষ মুরব্বীদের কেউই কবর বা মাজার ওয়ালাদের কেউ ছিলেন না বা নয়।
অনেকে মনে করেন ইসলামের মূল ভিত্তি হল ৫টি। তাবলীগ জামাত এগুলোর কোনটিকে বহাল রেখে আর কোনটিকে বাদ দিয়ে ছয় উসুলের অবতারনা করেছে। কোথায় ইসলামের ভিত্তি আর কোথায় তাবলীগ জামাতের উসূল। তাবলীগ জামাত মনে করে মোটা মোটি এ ছয়টি কাজ করতে পারলে ইসলামের পথে চলা সহজ । ছয় উসূল ভিত্তিক রচিত ফাজাইলে আমাল কে নেসাব হিসেবে মনে করা হয় না। এছাড়া একদম সহজ-সরল মুসলিমগণের জন্য এ ছয়টি উসূল অত্যন্ত উপকারী। তাদের ঈমান আমল গঠনে তা অত্যন্ত সহায়ক। এক নজরে উসূল গুলো হল ঃ কালেমা, নামাজ, ইলম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমীন, তাসহীহে নিয়ত ও তাবলীগ। কালিমা বলতে বুঝায় ঈমান-আকীদা সম্পর্কীত সকল মেহনত, নামায হল দ্বীন-ইসলামের স্তম্ভ, ইলম না থাকলে কোন ইবাদতই বিশুদ্ধ ভাবে আদায় করা সম্ভব হয় না, নিয়ত সহীহ না হলে কোন আমলই আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না, ইকরামুল মুসলিমীন মানুষকে আদব-কায়দা শেখায়, বড়দের সম্মান ও ছোটদের আদর করার প্রতি উদ্ধুদ্ধ করে সেবার মানসিকতা জাগ্রত করে। এগুলো মেনে চললে একজন মানুষ আমলাদার মুসলিম হতে বাধ্য।
সাধারণভাবে সমাদৃত কোন সংস্থাকে পরামর্শ দেওয়া আমার মত নাখান্দার জন্য বেয়াদবী ছাড়া কিছু নয়। তবে বিভিন্নজন হতে যা শুনা যায় তার ভিত্তিতে কিছু পরামর্শ। তাওহীদের আলোচনাও শিরক মুক্ত ঈমান গঠনের উপর তাবলীগ জামাতকে আরো জোর দিতে হবে। বিদআত সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সালাতেরও বয়ানের পর রাসুলুল্লাহ সা. কোন কোন দু‘আ পড়তেন আর আমরা কি করছি, এরূপ অন্যান্য কিছুর ক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরন করা চাই। আল-কুরআনুল কারীমের পঠন-পাঠন, আর তার মর্ম অনুধাবন তৎসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা পর্যালোচনা বৃদ্ধি করতে হবে। বিভিন্ন পরিভাষার ব্যবহারে সচেতন থাকতে হবে। এখন তাবলীগ আর আঞ্চলিক কোন সংস্থা নয়। সর্বত্র তা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলামী পরিভাষাগুলো ব্যবহার করলে বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহার করলেও সমস্যা হয় না। যেমন- ফারসী শব্দ-গাশত, পায়দাল, শবগুজারী, রাহবার, খোদা, পয়গাম্বর, ইত্যাদি শব্দ চয়নে সংস্কার আনতে হবে। ইলমী গবেষনায় একদল যোগ্য আলিমকে নিয়েজিত করতে হবে। তাদের মাধ্যমে সঠিক বিষয় উদঘাটন করতে হবে। রুসুম-রিওয়াজ যা ইসলামের মাঝে ইসলামের নামে অনুপ্রবেশ করছে তা বর্জন করেতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি যেগুলোকে সবাই মেনে নিয়েছেন, সে গুলোকে বাস্তবতার আলোকে ব্যবহারে নিয়ে আসতে হবে। সারা দুনিয়ায় আযান ও সালাতে কিরাত মাইকে পাঠ করা হচ্ছে তাই ইজতিমার মত জনসমুদ্রে আযান ও কিরাত শোনার ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। তাবলীগ, আমর বিল মারুফ ও নাহী আনিল মুনকার সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসগুলো বয়ানের সময় উপস্থাপন করতে হবে। অন্যবিষয়ক আয়াত ও হাদীসগুলোকে যথাস্থানে রাখা চাই। অনেকের মতে এতে তাহরীফ বা অদল বদল আবশ্যক হয়ে পড়ে। যা ইসলামে অতি নিন্দনীয় কাজ। সময়ের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সে মুতাবিক দাওয়াতের পন্থা নির্নয় করলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি এর দ্বারা আরো বেশি উপকৃত হবে। আম্বিয়া আ. ও অন্যান্য দা‘ঈগণ মানুষের পরিবেশ ও সময়ের চাহিদা বুঝে দাওয়াতের পন্থা নির্ণয় করে দাওয়াত দিতেন। একই পন্থা সব স্থানে চালাতে হবে, এমনটি পরিহার করা উচিত। মহিলা অঙ্গনে দাওয়াতের কাজ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে যেসকল মহিলা বিভিন্ন কল-কারখানা ও অফিস আদালতে কাজ করে তাদের কে হিজাব ধারী শিক্ষিত মহিলাদের কে দিয়ে মন্দকাজ হতে বিরত রাখার উদ্যোগ নিলে নারী সমাজ ব্যাপকহারে উপকৃত হবে।
দাওয়াতি কাজের উদ্যোগ আয়োজন আরও বেগবান হোক আল্লাহর দ্বীন দুনিয়ায় কায়েম হোক এই কামনাই করি। আল্লাহ সব দা’ঈকে কবুল করুন
লেখক : গবেষক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫