ঢাকা, মঙ্গলবার,৩০ মে ২০১৭

রাজশাহী

পাবনা-সিরাজগঞ্জে একে একে বন্ধ হচ্ছে তাঁত কারখানা

শফিউল আযম, বেড়া (পাবনা) ও রফিক মোল্লা, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা 

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৪


প্রিন্ট

দেশে ও বিদেশে তাঁতবস্ত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের তাঁত মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র বিক্রিতে অব্যাহত লোকসানে মালিকরা তাঁত কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পবিার পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছেন।
তাঁত কারখানা মালিকরা বলছেন, এভাবে লোকসান অব্যাহত থাকলে তাঁত শিল্প এবং এ শিল্পের সাথে জড়িতরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশে রফতানি এবং দেশে চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁত বস্ত্রের বাজার দর প্রতিদিন নি¤œ মুখি হচ্ছে। সরকারিভাবে পদক্ষেপ না নেয়া হলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরো প্রকট আকার ধারন করবে। অনেকেই মত প্রকাশ কররেছেন, এখন সকল শ্রেণীপেশার নারীরা সালোয়ার কামিজ বেশী ব্যবহার করায় শাড়ীর ব্যবহার কমে গেছে। আর এতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
তাঁত কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে তাঁতবস্ত্রের ব্যবসায় মন্দা ভাব শুরু হয়। ২০১৪ সাল থেকে মন্দাভাব স্থায়ী রূপ নেয়। একই সঙ্গে তাঁতের উৎপাদিত শাড়ী লুঙ্গীর বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। উৎপাদিত পণ্য লোকসানে বিক্রি করে তাঁতিরা পুজি হারাতে থাকে। বিশেষ করে প্রান্তিক তাঁতিরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। ঋণ পরিশোধ ব্যর্থ হয়ে অনেকেই তাঁত বিক্রি করে কেউ পোষাক শিল্পে, কেউবা মাটি কাটা শ্রমিক আবার কেউ রিক্সা চালকের কাজ নিয়েছেন। কেউ কেউ পুঁজি হারিয়ে বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বর্তমানে পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঋণগ্রহিতরা তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। তাঁত বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই জ্বালানি হিসেবে তাঁতের কাঠ ও ভাঙ্গড়ীর দোকানে লোহা বিক্রয় করছেন।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পাবনার সাঁথিয়া ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর বেসিকসেন্টর সূত্রে জানা গেছে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ তাঁত সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত। জেলা দু’টির সাঁথিয়া, সুজানগর, বেড়া, চৌহালীর এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি, সিরাগঞ্জ সদর, উল্লাপাড়া উপজেলায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা দুই লাখ ৬০ হাজার এবং বিদ্যুত চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। এই তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ছয় লাখ পরিবারের ত্রিশ লাখ শিশু ও নারী পুরুষ। এছাড়া অনান্য ব্যবসা ও পেশার লোকজন তাঁতশিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাঁত শিল্পকে কেন্দ্র করে চৌহালীর এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি আতাইকুলা চারটি কাপড়ের হাট গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে এবং কাপড় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এনায়েতপুর ও শাহজাদপুর হাটে প্রতি সপ্তাহের চারদিন (দিনরাত মিলে) কাপড় বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাপড় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা এই হাটে এসে শাড়ী, লুঙ্গি ক্রয় করে থাকেন। প্রতিহাটে ভারতে শাড়ী ও লুঙ্গি রফতানি হয়ে থাকে। প্রতি হাটে ব্যাংক ও নগদসহ প্রায় দুই শতাধিক কোটি টাকার লেনদেন হতো। বর্তমানে কাপড় ক্রয়-বিক্রয়, রফতানী ও ব্যাংক লেনদেন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে খেলাপী ঋণের সংখ্যা বাড়ছে।
শাহজাদপুর বেসিক সেন্টারের আওতাভূক্ত কৈজুরী ইউনিয়নের জগতলা গ্রামের ৩নং ওয়ার্ড তাঁতী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তার ১৫টি তাঁত ছিলো। তাঁতবোর্ড থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল। প্রতিটি শাড়ী কাপড় উৎপাদনে খরচ হয় ৬০০ টাকা। বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা। সে কারণে বাধ্য হয়ে বর্তমানে পাঁচটি তাঁত চালু রেখেছে। এখন ঋণের কিস্তির টাকা দিতে পারছে না। তার গ্রামের মাসুদ রানা, তফিজ উদ্দিন, গফুর মিয়া, ইমান আলী, আলম মিয়া তাঁত বিক্রি করে দিয়ে এখন ঢাকায় পোষাক শিল্পে শ্রমিকের কাজ করছে, কেউ রিক্সা চালাচ্ছে। এনায়েতপুরের খোকশাবাড়ি গ্রামের মোসলেম উদ্দিন ও সালিম প্রাং তাঁতের ব্যবসায় মূলধন হারিয়ে এখন মাটি কাটা শ্রমিকের কাজ করছে।
শাহজাদপুর রূপপুর মহল্লাার নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন তাঁত মালিক জানান, পুঁজি হারিয়ে তাঁত বিক্রি করে দিয়ে রাতের আধারে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি। এলাকায় এক সময় প্রচুর দাপট ছিলো। অনেক দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করেছি। এখন নিঃস্ব হয়ে মানসন্মানের ভয়ে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছি। এনায়েতপুরের খুকনী গ্রামের মিল্টন কটেজ ইন্ড্রাষ্ট্রিজ এর স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন ভয়াবহ অবস্থা কোনদিন দেখিনি। কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরীর টাকাই জোগাড় হচ্ছেনা। গুদামে কয়েক কোটি টাকার কাপড় মজুদ হয়ে আছে। জমি বিক্রি করে বাংকের সুদের ১৬ লাখ টাকা দিয়েছি। মোট ৩০৪ টি তাঁতের মধ্যে মাত্র ৯৫টি তাঁত চালু রেখেছি।
রফতানিকারক মেসার্স রায় ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকার নিত্য নন্দ রায় বলেন, শুল্কমুক্ত হওয়ায় তিন বছর আগে ছয়টি রফতানীকারক প্রতিষ্ঠান এনায়েতপুর ও শাহজাদপুরের হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে চার লাখ পিচ শাড়ী ও লুঙ্গী ভারতে রফতানী করতো। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কাপড় রফতানী হতো। গত ৩ বছর ধরে ভারতের রাজ্য সরকার ছয় শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং ভারতে বাংলাদেশে ডলারের মূল্যমানে ব্যবধানের কারণে রফতানীর পরিমান অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমানে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া না হলে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারন করবে।
এনায়েতপুরে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ চেক ইন্ডাষ্ট্রিজের ম্যনেজার আব্দুল মান্নান মোল্লা ও তাঁত বস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িত প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুস ছামাদ খান বলেন, বর্তমানে সকল শ্রেণীর নারীরা শাড়ীর পরিবর্তে সালোয়ার, কামিজ ব্যবহার করছেন। যে কারণে শাড়ীর ব্যবহার কমছে। তাঁত ব্যাবসা মন্দা থাকার কারণে সকল ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা ভাবনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
এনায়েতপুরের একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপক জানান, গত তিন বছরের অনুপাতে বর্তমানে লেনদেন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। বেশিরভাগ তাঁতমালিকরা শুধু শাড়ী ও লুঙ্গি তৈরি করে থাকেন। অন্য কোন কাপড় তারা তৈরি করেন না। সে কারণে বাজার মন্দা হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদিত কাপড় কমমূল্যে, বাকিতে এবং চেকের মাধ্যমে বিক্রি করায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারছেন না। সে কারণে খেলাপী ঋনের সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশ তাঁতবস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হাসান বলেন, তাঁত শিল্পের প্রতি সরকারের কোন সু-নজর নেই। সারাদেশের প্রায় তিন কোটি লোক এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। অব্যাহত লোকসানের কারণে অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁতমালিক ও শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। প্রান্তিক তাঁতীরা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সবাইকে পথে বসতে হবে। স্থানীয় তাঁতবোর্ডের লিয়াজো কর্মকর্তা ওয়াজেদ আলী বলেন, বাজার ব্যবসার পরিবর্তন ও তাঁতের উপকরণ সহজলভ্য করতে হবে। তা না হলে তাঁত শিল্পে প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসবে না।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫