ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বরিশাল

সৌন্দর্যে ঘেরা সোনালী দ্বীপ সোনারচর-জাহাজমারা

এম সোহেল রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১১:৫১


প্রিন্ট

চারদিকে সমুদ্রের জলরাশি। সবুজ ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সৈকতের তটরেখায় লাল কাঁকড়াদের ছুটোছুটি। শেষ বিকেলে দিগন্ত রেখায় সূর্যাস্তের দৃশ্য। সকাল-দুপুর-বিকেল পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা দ্বীপ। নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়েছে চারপাশে। চিকচিক বালিতে যেন ভোরের কোমল সূর্য আলো ছড়ায়। সৌন্দর্য ঘেরা এই জায়গাটির নাম ‘সোনারচর’। এটির অবস্থান পটুয়াখালী জেলা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে। এরপাশেই রয়েছে সৌন্দর্য নিয়ে জেগে থাকা মৌডুবির ‘জাহাজমারা’ নামের আরেকটি দ্বীপ। এছাড়াও এ উপজেলায় আরো বেশ কয়েকটি নয়নাভিরাম দ্বীপ রয়েছে ।
সোনারচরে সোনা নেই ঠিকই, কিন্তু আছে সোনার রঙে রাঙিত বালি। সূর্যের রশ্মি যখন বালির ওপর পড়ে তখন দূর থেকে মনে হয়, সত্যি সত্যিই সোনারচরের আবির্ভাব হয়েছে এখানে। সোনারচরে রয়েছে বিশাল বনভূমি। বন বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, সুন্দরবনের পরেই আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুবিশাল সমুদ্র সৈকত।
এলাকাবাসীর কাছে সোনারচর নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রতীক। সাগরে যখন জোয়ারের জল উথলে ওঠে তখন চাদের আলোয় অন্য এক সৌন্দর্যে রূপ নেয় এই সোনারচর। প্রতিনিয়তই তীরে আছড়ে পড়ছে ছোট-বড় ঢেউ। ঝুরঝুরে বালি গলে পড়ছে লোনা জলে। সবুজ ঘন অরণ্যের নিবিড়তা ছেয়ে আছে চারপাশজুড়ে। মৃদু মৃদু বাতাস আর ঢেউয়ের তালে এই চরের ছোট-ছোট বাঁওড়ে অথবা খালে চলে জেলেদের নৌকাগুলো। বিভিন্ন ধরনের জাল ফেলে মাছ ধরছে জেলেরা। সাগর থেকে আসা খালগুলোতে মাকড়সার মতো অসংখ্য ঠেলা জাল দিয়ে ঠেলছে শিশুরাও।
বনাঞ্চলের কাছাকাছি গেলে হয়তো সহজেই চোখ পড়বে বুনো মোষ, হরিণ, শুকর, বানর, মেছো বাঘসহ আরও সব বন্য প্রাণীর ওপর। এসব দেখতে হলে প্রভাতেই বেরিয়ে পড়তে হবে নৌকা নিয়ে। সৈকতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যাবে সূর্যাস্ত কিংবা সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য। চোখে পড়বে নানা ডানা ঝাপটানো নাম না জানা অতিথি পাখির দল। তাদের কিচিরমিচির শব্দে সন্ধ্যার পরিবেশটুকু উপভোগ করা যাবে নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে। শীত মৌসুমে এলেই পরিযায়ী ওইসব পাখিগুলো সাইবেরীয়, উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান, ইরান, চীন, তীব্বত, ইরাক, মালয়েশিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসে। আবার শীত মৌসুম শেষ হলেই নিজ দেশে ফিরে যায়।
দেশের মানচিত্রটি সামনে ধরলে দেখা যাবে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থান করছে সাগরকন্যা হিসেবে খ্যাত পটুয়াখালী। সেখান থেকে দ্বীপরাজ্য রাঙ্গাবালী হয়ে আপনাকে জলযানে পৌঁছাতে হবে সোনারচরে। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে ২ কিলোমিটার পথ পেড়িয়ে গহিনখালী লঞ্চঘাট। সেখান থেকে লঞ্চযোগে প্রায় একঘন্টার নৌপথ পাড়ি দিয়ে চরমোন্তাজ ইউনিয়ন। চরমোন্তাজ থেকে ট্রলার যোগে প্রায় আরো একঘন্টার পথ পেড়িয়ে দেখা মেলে সোনারচরের।
সোনারচর ছাড়াও রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবি সংলগ্ন এলাকায় ‘জাহাজমারা’ নামের একটি দ্বীপের অবস্থান। পর্যটন মৌসুমে কিছু ট্রলার পর্যটকদের নিয়ে জাহাজমারায় যাতায়াত করে। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা থেকে কিংবা রাঙ্গাবালী থেকে এসব স্থানে ট্রলারে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে পর্যটকেরা এসব স্থানে আসেন কিছুটা প্রশান্তির খোঁজে।
অথচ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসব স্থানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হতে পারে, আর সরকারও আয় করতে পারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
তবে এখন পর্যন্ত এখানে লোকবসতি গড়ে ওঠেনি। আছে নিবিড় সবুজের সমারোহ। সৈকতে অগণিত লাল কাঁকড়ার ঝাঁক। সরকার এটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে ঘোষণা না করলেও পর্যটকরা আসছে এখানে আসছেন। ধ্বংস করছেন দ্বীপের সৌন্দর্য। পর্যটন কেন্দ্র করে দ্বীপের নির্দিষ্ট স্থানে পর্যটকদের ভ্রমণের সুযোগ করে দিলে বাঁচবে পরিবেশ। দ্বীপে রয়েছে সবুজের মনোরম সমারোহ। ১৯৭৪-৭৫ ও ২০০৭-০৮ সালে বন বিভাগ দুই দফায় এই দ্বীপে বনায়ন করে। ৫০০ একর বিস্তীর্ণ বনভূমিতে রয়েছে কেওড়া, ছইলা, গেওয়া, বাবলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।
রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে সড়ক পথে ২ কিলোমিটার গিয়ে খালগোড়া খেয়া পার হয়ে চরগঙ্গা হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পেড়িয়ে জাহাজমারা দ্বীপ। এছাড়া নৌপথেও যাওয়া যেতে পারে। সদর থেকে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ভাড়া করে যেতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় তিন ঘন্টা।
সোনাচর-জাহাজমারা দ্বীপকে আরো পর্যটনমুখী করতে আগে দরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন। প্রথমেই যে কাজটি করা দরকার তা হলো কুয়াকাটা থেকে সেনারচর-জাহাজমারা পর্যন্ত সি-ট্রাকের ব্যবস্থা। একইভাবে রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকেও সি-ট্রাকের ব্যবস্থা করা দরকার। এই পথগুলোতে সি-ট্রাক চলাচল করলে পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধা বাড়বে। পাশাপাশি নিয়মিত সি-ট্রাক চালু হলে এইসব এলাকার লাখো মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অভাবনীয় সূচনা হবে। এজন্য সোনারচর -জাহাজমারায় পন্টুন স্থাপন করা জরুরি। একইসঙ্গে হোটেল-মোটেলসহ রেস্ট হাউস তৈরি করলে পর্যটকদের এসব দ্বীপে আসার আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসতে পারে।
সোনারচর-জাহাজমারা ছাড়াও রাঙ্গাবালী উপজেলায় চরতুফানিয়া, রুপারচর, চরহেয়ারসহ আরো বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় দ্বীপ রয়েছে এখানে। তাই এসব দ্বীপে পর্যটকদের আগমন বাড়াতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। এছাড়া পর্যটকদের অবস্থানের জন্য হোটেল-মোটেল নির্মাণ করা জরুরি। এসব হলে রাঙ্গাবালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার অমূল পরিবর্তন ঘটবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫