ঢাকা, রবিবার,২৬ মার্চ ২০১৭

প্রথম পাতা

৬৮ কারাগারে আটক ৭৫ হাজার বন্দী নানা সমস্যায় ভুগছেন

শীতবস্ত্র, খাওয়া ও চিকিৎসা সঙ্কট ; কারা ক্যান্টিন নিয়ে বাণিজ্য

মনির হোসেন

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, বরিশাল ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের ৬৮ কারাগারে বর্তমানে ৭৫ হাজারের বেশি বন্দী রয়েছে। যা ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। এর মধ্যে বিচারাধীন বন্দীর সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। অথচ কারাগারগুলোর ধারণ ক্ষমতা ৩৬ হাজার ৬১৪ জন। অন্য দিকে বন্দীরা কারাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় খাদ্য, শীতবস্ত্র ও চিকিৎসাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না বলেও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া কেরানীগঞ্জের নতুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুরের একমাত্র মহিলা কারাগারসহ দেশের বেশির ভাগ কারাগারে আটক বন্দীর অনেকের দিন কাটছে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে। বেশি কষ্ট হচ্ছে তাদের থাকা ও খাওয়াতে। বন্দীর সাথে স্বজনরা দেখা সাক্ষাৎ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জামিনে মুক্তি পাওয়া বন্দীদের কারাগারের গেটে হয়রানি হতে হচ্ছে। গুরুতর এসব অনিয়ম নিরসনে অদ্যাবধি কারা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে জামিনে মুক্ত বন্দীদের নিতে আসা স্বজনরা আর্থিকসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময় কারাগারে ‘সঠিক চিকিৎসার’ অভাবে বন্দী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এসব মৃত্যুর ঘটনার কোনো কোনোটিতে কারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ করেন স্বজনরা। এসব অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিটি কারাগারের ভেতরে ও বাইরে গড়ে ওঠা কারা ক্যান্টিন ঘিরে কারারক্ষীদের উপরি বাণিজ্য জমজমাট আকার ধারণ করেছে। কারা ক্যান্টিনের আধিপত্য নিয়ে ঘটছে মারামারির ঘটনাও।
কারা অধিদফতরের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সব কারাগারে ৭৫ হাজার ২৩৮ জন বন্দী আছে। এরমধ্যে বিচারাধীন পুরুষ বন্দী ৫৪ হাজার ৯৯৯ জন, মহিলা বন্দী ২ হাজার ১৮৩ জন। অপর দিকে সাজাপ্রাপ্ত পুরুষ বন্দী ১৭ হাজার ৫২১ জন, মহিলা সাজাপ্রাপ্ত বন্দী ৫৩৫ জন। যদিও কারাগারের ধারণ ক্ষমতা ৩৬ হাজার ৬১৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৩৪ হাজার ৯৪০ জন আর মহিলা ১ হাজার ৬৭৪ জন। বর্তমান বন্দীর তুলনায় ধারণক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বলে কারা অধিদফতরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
গতকাল কেরানীগঞ্জে নতুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্বশীল সূত্র নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, গত সপ্তাহে কারাগারের বাইরে গড়ে ওঠা কারা ক্যান্টিনে আসাদ নামে এক কারারক্ষী ধারালো অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করেন হাদীস নামে আরেক কারারক্ষীকে। এ ঘটনাটি কারাগার এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ক্যান্টিনের আশপাশে অপেক্ষায় থাকা বন্দীর স্বজনরা তখন দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। পরে কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবিরসহ অন্যদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়। এ ব্যাপারে জানতে গতকাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নেছার আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, কারা ক্যান্টিনের নিয়ন্ত্রণ ও সিগারেট কেনাকে কেন্দ্র করেই মারামারির সূত্রপাত। একই চিত্র কারা অভ্যন্তরের। সেখানকার ক্যান্টিন থেকেও বন্দীরা কোনো পণ্যই কম দামে কিনতে পারেন না। বাইরে একপিস টাইগার ড্রিংকস ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও ভেতরে বন্দীদের কাছে সেটি দ্বিগুণ দামে অর্থাৎ ৫০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। আর প্রতিটি সিগারেটই বাজার মূল্যে থেকে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। সবজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি করে। অনিয়মের বিষয়গুলো কারা কর্মকর্তারা জানার পরও জড়িত কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। উল্টো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিবাদী কারারক্ষীদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে বদলি করা হচ্ছে। একইভাবে মেহেরপুর কারাগারের অনিয়ম নিয়ে সম্প্রতি ২২ জন কারারক্ষী প্রতিবাদ করলে কয়েকজনকে ওই কারাগার থেকে বদলি করে অন্য কারাগারে পাঠানো হয়।
গতকাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক লিটন নামে এক বন্দীর স্বজন নয়া দিগন্তকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমনতিই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। নতুন কারাগারটি খোলামেলা হওয়ায় অনেকেই ঠাণ্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কিন্তু বন্দীদের অনেকেই শীত নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় কম্বল পাচ্ছেন না। এ কারণে তাদের রাতে ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছে। লিটন তার বাসা থেকে দ্রুত শীতের কাপড় পাঠাতে স্বজনকে অনুরোধ করেন। ওই বন্দীর স্বজন অভিযোগ করেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে খাবারে। গ্যাস না থাকায় লাড়কির চুলোয় রান্না করতে হচ্ছে। এতে সময়মতো অনেকেই খাবার খেতে পারছেন না। সেই সাথে যেসব বন্দী ঠাণ্ডাসহ নানা রোগে আক্রান্ত তারা কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই যে এসব সমস্যা তা নয়, এই সমস্যা এখন বিরাজ করছে দেশের বেশির ভাগ কারাগারেই।
নারায়ণগঞ্জ কারাগারে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায়, বন্দীর স্বজনদের কাছ থেকে কিছু কারারক্ষী টাকা নিয়ে সাক্ষাৎ করাচ্ছেন। ভেতরে খাবারের মান খুব একটা ভালো না বলে ভুক্তভোগী বন্দী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেন। তবে কারাগারে সবাই আরামে থাকতে পারছেন বলে জানান স্বজনরা। একই চিত্র কাশিমপুরের অপর কারাগারগুলোতে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫