ঢাকা, সোমবার,২৬ জুন ২০১৭

প্রথম পাতা

রোগী ভাগিয়ে কিনিকে নিলেই কমিশন

পঙ্গু হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য ; জড়িত হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী

শহিদুল ইসলাম রাজী

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বাগেরহাটের ছোট্ট ছেলে জাকির হোসেন। গাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙেছে তার। মায়ের সাথে গতকাল গ্রামের বাড়ি থেকে চিকিৎসার জন্য এসেছিল রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল)। ডাক্তার দেখানোর জন্য যথারীতি বহির্বিভাগের কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল মায়ের সাথে। দাঁড়ানোর একটু পরই বাধে বিপত্তি। দুইজন লোক এসেই জাকিরের মায়ের হাত থেকে টিকিটটি নিয়ে বলেন, চলেন বাইরের কিনিক থেকে একটি এক্সরে করে আনতে হবে। এতে বাদসাধে মা-ছেলে দ্’ুজনই। অনেকটা টেনেহিঁচড়ে বহির্বিভাগ থেকে তাদের বাইরে নিয়ে আসে দালালেরা। শুধু জাকিরই নয়, এ রকম অসংখ্য রোগীকে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়াতে হয়, হয়রানির শিকার হতে হয়। শুধু কি তাই, দালালেরা উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ভুঁইফোড় কিনিকে নিয়ে চিকিৎসার নামে অনেক সময় রোগীর অঙ্গহানির ঘটনাও ঘটিয়েছে। ওই হাসপাতালের প্রত্যেক জায়গাতেই চলছে দালালের আধিপত্য। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে কেবিন, ওয়ার্ড, প্যাথলজি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটারসহ বহির্বিভাগ পর্যন্ত দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। টাকা ছাড়া কোনো রোগী এদের কাছ থেকে ন্যূনতম সেবাও পাচ্ছেন না। দালালদের কাছে ডাক্তারেরা পর্যন্ত অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। এ ছাড়া উন্নত চিকিৎসার কথা বলে প্রাইভেট কিনিকে বাগিয়ে নেয়ার কমিশন তো রয়েছেই। ফলে দালালদের দৌরাত্ম্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)। আর এসব দালালের বস পঙ্গু হাসপাতালের কিছু অসাধু চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
গতকাল পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে এ দালালচক্রের ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। পরে তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। রোগীদের হয়রানি ও অন্য কিনিকে ভাগিয়ে নেয়ার দায়ে তাদের এ দণ্ড দেয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে হুমায়ুন কবির ও মাহফুজা আক্তার নামে পঙ্গু হাসপাতালের দু’জন কর্মচারীও রয়েছেন। দালালেরা হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে কিনিকে নিয়ে গেলে দুই হাজার টাকা করে কমিশন পান বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।
তিনি বলেন, বাগেরহাট থেকে আসা শিশু রোগীকে স্থানীয় মুন্নি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেয়ার জন্য ওই কিনিকে এক দালাল ও পঙ্গু হাসপাতালের এক কর্মচারী তাদের এক্সরে করে আনতে বলে। এ সময় রোগীর মা বলেন, ডাক্তার দেখানোর আগে কেন এক্সরে করব। ডাক্তার দেখার পরই তার পরামর্শমতো কাজ করার কথা বলেন রোগীর স্বজন। একপর্যায়ে ওই দালালেরা তাদের বহির্বিভাগের লাইন থেকে বাইরে নিয়ে আসে। বিষয়টি র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের চোখে পড়ে।
র‌্যাব-২এর উপপরিচালক মেজর মোহাম্মদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র পঙ্গু হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসা নিতে বাধা দিত। অনেক সময় রোগীদের প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি কিনিকে ভর্তি করাত। সেখানে চিকিৎসার নামে এসব রোগীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। বুধবার অভিযানে রোগীদের ভাগিয়ে নেয়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়ে। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে এই চক্রের তৎপরতা বেশি থাকে। একজন রোগীকে ভাগিয়ে বেসরকারি কিনিকে ভর্তি করালে দুই হাজার টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের পরীা-নিরীা করাতে পারলে আরো ২০০ টাকা দালালকে দেয়া হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, আটকের পর দালালেরা অপরাধ স্বীকার করায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ২৪ জনের মধ্যে ছয়জন স্থানীয় সততা কিনিকের, দু’জন মক্কা কিনিকের ও একজন মুন্নি ডায়াগনস্টিকের বেতনভুক্ত কর্মচারী। ২৪ জনের মধ্যে মিরাজ হোসেনকে চার মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পঙ্গু হাসপাতালের কর্মচারী হুমায়ুন ও দালাল গোলাম মোস্তফা, আলম, আহসান হাবীব, আমির হোসেন, দুলাল, জহির, মমিন মিয়া, রবিউল ইসলাম, রিনা বেগমকে তিন মাসের এবং মঞ্জু মাহমুদ, জসিম, সজীব সরকার, আবুল কালাম আজাদ, মালেকা বেগমকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। আলাউদ্দিন, রাশেদ, সুমন, ফিরোজ আহমেদ, গোলাপী বেগম ও সাহিদা বেগমকে এক মাসের এবং পঙ্গু হাসপাতালের অপর কর্মচারী মাহফুজাসহ পারভীনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
তিনি আরো জানান, দালালচক্র পঙ্গু হাসপাতালে আসা রোগীদের কম টাকায় চিকিৎসা করার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের এজেন্টভুক্ত কিনিকে নিয়ে যায়। রোগী ভাগিয়ে নিয়ে দালালচক্র কিনিকের মালিকদের কাছ থেকে কমিশনে টাকা নেয়। ওইসব কিনিকে নি¤œমানের চিকিৎসা এবং বিপুল চিকিৎসা খরচের কারণে রোগীরা তিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক রোগীর অঙ্গহানির ঘটনাও ঘটে।
পঙ্গু হাসপাতালে হয়রানি নিয়ে কাজল নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, এই হাসপাতালে কিছু চিকিৎসক ইচ্ছে করে রোগী দেখেন না, ভালো কেয়ার নেন না। তারা চান তাদের ব্যক্তিগত কিনিকগুলোয় রোগীরা চিকিৎসা নিক। রোগী মারা গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন রোগীরা এখানে অবহেলায় পড়ে থাকেন। ডাক্তারদের টার্গেট থাকে কিভাবে দালালের মাধ্যমে রোগীকে নিজ কিনিকে নিয়ে যাওয়া যায়। দালালদের সিন্ডিকেট পরিচালনাও করেন হাসপাতালের ডাক্তারেরা।
অন্য এক রোগীর স্বজন রফিক জানান, অনেক সময় বহির্বিভাগের চিকিৎসকেরা একটা পরীক্ষা লিখে ডায়াগনস্টিকের নাম বলে দেন এবং ওখান থেকে করাতে বলেন। ফলে চিকিৎসকের তুষ্টির জন্য তার বলে দেয়া কিনিকে যেতে হয়। সেখানে গেলে তারা বলেন, বসতে হবে। ডাক্তার নেই। আরো কয়েকজন রোগী হলে ডাক্তারকে ফোন করলেই তিনি চলে আসবেন।
বিষয়টি স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঙ্গু হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালে যে দালাল রয়েছে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। আর এসব দালালের বস হলেন আমাদের ডাক্তারেরা, যাদের নিজস্ব কিনিক রয়েছে। যারা কিনিকগুলোয় গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে রোগীদের তারা নিরুৎসাহিত করেন। একই সাথে তারা নিজের কিনিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তখন বাকি কাজটি করেন দালালেরা।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫