ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

ট্রাম্পের এশিয়ানীতি

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প

সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প

আমেরিকান গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিতÑ যা অনেক দিন ধরেই কার্যকর। এই তিনটি হচ্ছে : উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং তা থেকে সৃষ্ট সমৃদ্ধি; জাপান, অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত দৃঢ় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিত্রতা; এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ। আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এগুলোর কোনোটিকে পরোয়া করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার বিজয়ে এশিয়ায় আমেরিকান শক্তি ও মর্যাদায় বিরাট আঘাত বিবেচিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই নানা শঙ্কা জাগছে। বিশ্বজুড়েই তা আছে। কিন্তু এশিয়ায় এই ঢেউ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
বাণিজ্য দিয়ে শুরু করা যাক। কয়েক বছর ধরেই ওবামা প্রশাসন সবার জন্য সমান সুযোগ-সংবলিত, স্বচ্ছ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে ১২ জাতি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপকে (টিপিপি) এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। দেশে এটা সহজে গ্রহণযোগ্য হবে না মনে হলেও ধারণা করা হচ্ছিল, রিপাবলিকান প্রাধান্যপূর্ণ কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত এটা পাস করে দেবে। কিন্তু তা আর শেষ পর্যন্ত হলো না। আইনপ্রণেতারা জাতীয় মনোভাবের প্রতি স্পর্শকাতর এবং ট্রাম্পের ভোটাররা আর যার জন্যই ভোট দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত এশিয়ার সাথে ওই বাণিজ্য চুক্তির জন্য নয়। ফলে ওবামার একটি অর্জন (!) বড় রকমের ধাক্কা খেলো।
ট্রাম্পকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার সম্ভাব্য চীননীতি। সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ ভাগ কঠিন কর আরোপের কথা ভাবছেন। এ ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভবত আমেরিকাই হবে এর বৃহত্তম শিকার। আর তা এশিয়ায় বিস্তৃত উৎপাদন নেটওয়ার্ক দিয়ে ধেয়ে চাকরি শেষ করে দেবে, আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানবে।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের মধ্যে থাকা একমাত্র অর্থনীতিবিদ (বাকিরা আসলে ব্যবসায়ী) পিটার ন্যাভ্যারোর মতে, আমেরিকার উৎপাদন খাতে ধস সৃষ্টির জন্য দায়ী চীন। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাকে তিনি মনে করেন বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। মূল ধারার জনমতে এসব দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আলোচিত। তবে যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনে ন্যাভ্যারো বিশেষ গুরুত্ব পাবেন, তাই তার মনোভাবকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেবেন, চীনের সাথে বারাক ওবামার করা জলবায়ু সমঝোতা, যেটাকে সাইনো-আমেরিকান সম্পর্কের গুটিকয়েক উজ্জ্বল বিন্দুর অন্যতম মনে করা হয়, বাতিল করে দেবেন।
চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থান গ্রহণের আরেকটি প্রমাণ হলো তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে তার ফোনালাপ। দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে আসছিল। ট্রাম্প সম্ভবত সেটা মেনে চলবেন না। কিন্তু চীন সেটা সহজে মেনে নেবে না। ফলে সঙ্ঘাতের আরেকটি ক্ষেত্র শুরু হতে যাচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রাণবন্ত মহাদেশ হিসেবে এশিয়ার প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিতে বারাক ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ধারণা বিকশিত করে তুলেছিলেন। এটাও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তার জয়ে এশিয়ায় আমেরিকার মিত্ররা বেশ অস্বস্তিতে পড়বে। বারাক ওবামা চেয়েছিলেন চীনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে সংযত করতে। তা না হলে এই দেশটি দূরপাল্লার পরমাণু বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হতে পারে। হিলারি কিনটন সেটা বুঝতেন। আর তা-ই জয় নিশ্চিত মনে করে তিনি এশিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করে ফেলেছিলেন।
ট্রাম্প কিন্তু এসব কিছুই বোঝেন না। বোঝার দরকার আছে বলেও মনে করেন না। এসব ব্যাপারে কে তাকে পরামর্শ দেবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনী প্রচারকাজের সময় তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার আশ্বাসে বসে না থেকে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজ নিজ প্রতিরক্ষা খাত জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন। এতে করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে শুরু করবে। ট্রাম্প তার ঘোষণামতো ভারতকে সহায়তা করতে থাকলে চীন বসে থাকবে না। তারা ইতোমধ্যে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন পাকিস্তানকে এগিয়ে নেবে বলে জানিয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র বিকাশে অনেক ধরনের সহায়তা দেবে। জাপানকে যদি নিজের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়, তার মানে আবার তারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ হওয়ার ঝুঁকি নেবে। উত্তর কোরিয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে দক্ষিণ কোরিয়া বিপুল অস্ত্র বানাবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বসে থাকবে না। ফলে এশিয়ার প্রায় পুরোটাই রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
তার এসব কথার সূত্র ধরে বলা যায়, তিনি এশিয়ার সাথে তেমনভাবে সম্পৃক্ত থাকবেন না। আর সেটাই যদি হয়, তবে তা হবে চীনের জন্য মহাসুযোগ। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, চীন হলো উদীয়মান শক্তি, আর আমেরিকার অবস্থা ভাটার দিকে।
ট্রাম্পের জয় আসলে আমেরিকার দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য সম্ভবত চীনের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাবে। আমরা এখন কেবল তাকে অবাধে তার কাজ করার সুযোগ দিয়ে তিনি কত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে পারি।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫