ঢাকা, শুক্রবার,২৮ এপ্রিল ২০১৭

দেশ মহাদেশ

আন্তর্জাতিক চাপে ইসরাইল

আলমগীর কবির

১২ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

টেলিভিশনে আন্তর্জাতিক সংবাদ আর ইসরাইলি বর্বরতার বর্ণনা নিয়মিত ঘটনা। ফিলিস্তিনিদের ওপর দেশটির নগ্ন হস্তক্ষেপের বৈশ্বিক সমালোচনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি দখলকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে একচ্ছত্রভাবে। তবে গত ২৩ ডিসেম্বরের পর কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছে ইসরাইল। কারণ ওই দিন জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপন বন্ধের রায় দেয়। নিরাপত্তা পরিষদে বাধাহীনভাবে পাস হয় এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব। ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়া থেকে বিরত থাকায় নিরাপত্তা পরিষদ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারল।
কিন্তু ওই বিল পাসের পর ইসরাইলের চোখরাঙানি দেখে বিস্মিত হয়েছে বিশ্ব। যেসব দেশ জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি নির্মাণ বন্ধের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেÑ অর্থাৎ নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সেনেগাল ও ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রদূতকে জরুরি তলব করে শাসিয়েছে তেল আবিব। শুধু তা-ই নয়, ভেটো দেয়া থেকে বিরত থাকায় ইসরাইলে নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছেও সিদ্ধান্তে নীরব ভূমিকা পালনের কারণ জানতে চেয়েছে। এর দিন কয়েক পরে তেল আবিব থেকে নিউজিল্যান্ড রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সেনেগালে আর্থিক সহযোগিতা বন্ধ করে দিয়েছে। ইসরাইলকে শান্ত করতে নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘২০ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। মার্কিন ও ইসরাইলের সম্পর্কের এ টানাপড়েন থাকবে না। সম্পর্ক নতুন করে দৃঢ় ও ঘনিষ্ঠ হবে।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যে মার্কিন নীতিতে ইসরাইলের প্রভাব কতটা তা স্পষ্ট হয়। পাশাপাশি পুরো বিশ্ব পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরাইলির মাতব্বরির ইঙ্গিতও মেলে।
বিগত ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্ক মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। কংগ্রেসে কোনোরূপ প্রশ্ন ছাড়াই প্রতি বছর প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও আর্থিক সাহায্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরাইলে পৌঁছানোর অনুমোদন দেয়। এ ব্যাপারে উদারমনারাÑ যারা বিভিন্ন সময় মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং রণশীল, যারা বিদেশীদের সাহায্যের ব্যাপারে অনাগ্রহীÑ সবাই বিনা প্রশ্নে সম্মতি দিয়ে থাকেন। বস্তুত সব পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি মার্কিনিদের অকুণ্ঠ সমর্থনকে প্রশংসার চোখে দেখে। জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে অন্য রাষ্ট্রগুলো যখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের দায়ে কোনো প্রস্তাব উত্থাপন করে, তখন প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র একা তাদের পে অবস্থান নেয়।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পারস্য অঞ্চলের তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে হলে আমেরিকা একা পেরে উঠবে নাÑ এটা সে ভালোই বুঝতে পেরেছিল। ১৯৪৫ সালে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট আরব উপদ্বীপ সম্পর্কে বলে যে, ‘এটি কৌশলগত শক্তির একটি বিশ্বয়কর ভাণ্ডার এবং বিশ্বের ইতিহাসে সম্পদের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।’ মার্কিনিরা বুঝতে পারে, সমগ্র পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে এ অঞ্চলের তেলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী পরিকল্পনাবিদ জর্জ কেনান বলেন, ‘যদি আমেরিকা তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি ও জাপানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভেটো মতা বজায় রাখতে পারবে।’ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরে এ কারণে আমেরিকা এ অঞ্চলকে ঘিরে অসংখ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে।
তবে কূটনৈতিকভাবে ইসরাইল এখন অনেকটা কোণঠাসা। ওবামা প্রশাসনের শেষ মেয়াদে এসে ইসরাইলের স্বার্থবিরোধী ভূমিকা নেতানিয়াহুর সরকারকে যথেষ্ট বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেছে। ধারণা করা যায়, ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আরব দেশগুলো থেকে জাতীয়তাবাদী সরকার উৎখাতের পর যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান সময়ের বৃহৎ শক্তি রাশিয়া এবং ভবিষ্যৎ পরাশক্তি চীন আরব বিশ্বে তাদের প্রভাব বাড়াতে সম হয়েছে। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অনারব আঞ্চলিক শক্তি ইরান। অর্থাৎ বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ কারণে সিরিয়া সঙ্কট নিরসনে ভূমিকা পালনের েেত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা তার মতার মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি করতে পেরেছেন ইসরাইলের স্বার্থে চালিত পররাষ্ট্রনীতি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ দিকে, ফিলিস্তিন এলাকায় ইহুদিবসতি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যাপক সোচ্চার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ওবামা প্রশাসনও এখন বিষয়টিকে ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। এটি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট নিরসনে মার্কিন পরিকল্পনার পরিপন্থী বলে মনে করছে ওবামা প্রশাসন।
একে মতা ত্যাগের আগে ওবামা প্রশাসনের ইসরাইলের প্রতি চপেটাঘাত বলা যেতে পারে। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরাইল সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি একতরফা। এখানে নীতিনৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইন সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। অসংখ্যবার জাতিসঙ্ঘে আরব দেশগুলোর ইসরাইলি আগ্রাসন ও ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর হত্যা, নির্যাতন, উচ্ছেদ, ভূমি দখল, অবরোধ ও তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে আনীত প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সব মার্কিন প্রশাসন ইসরাইলের পে অবস্থান নিয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়েছে। এ দিকে, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি নির্মাণ চলমান থাকায় দ্বিরাষ্ট্র সমাধান এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া হুমকির মুখে রয়েছে। কেরি আরো বলেছেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবাধে ইহুদি বসতি নির্মাণ বন্ধ করতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাবে ভেটো না দেয়ার কারণ হলোÑ ইসরাইলের হাতে অধিকৃত ভূখণ্ডে যথেষ্ট বসতি নির্মাণের লাইসেন্স তুলে দিতে চায়নি ওবামা প্রশাসন। এতে বুঝাযায় ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে না। বরং বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণে প্রভাবিত করে মাত্র। বেশ কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একই নীতি গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু ইসরাইলের কারণে আমেরিকা তার নীতি থেকে সরে আসেনা। সে কারনেই প্রথম বারের মতো ইসরাইল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রবল চাপের মুখে পড়ল। যেখানে অনেক পশ্চিমা দেশের সমর্থন আছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার পর ইসরাইল হয়তো এই চাপ কাটিয়ে উঠতে পারবে।
কিন্তু ইসরাইলের বসতি বানানো যে অবৈধ এবং ফিলিস্তিনের দাবি যে নায্য তা আরেকবার আন্তর্জাতিক মহল থেকে স্বীকৃতি পেল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫