ঢাকা, শুক্রবার,২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

রাজশাহী

চলনবিলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি 

শফিউল আযম, বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা

১১ জানুয়ারি ২০১৭,বুধবার, ১৪:১৭


প্রিন্ট

দেশের মৎস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিলের নদী বিল জলাশয় ও প্লা¬বন ভূমিতে চলছে দেশি মাছ ধরা ও মাছ শুকানোর ভরা মওসুম। রাজশাহী বিশ্বাবদ্যায় ফিসারি বিভাগের সাহায্যে চলনবিল পাড়ে প্রায় ২৭৫টি চাতালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত উন্নতমানের শুঁটকি মাছ তৈরি করা হচ্ছে। চলনবিলের মিঠাপানির শুঁটকি মাছের কদর এখন দেশে বিদেশে। শুঁটকি মাছ রফতানি হচ্ছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ২৫টি দেশে।
একটা সময় ছিল যখন চলনবিলের মাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলত। মাছ বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয় এ অঞ্চলের মানুষ। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে প্রথম ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেল পথ নির্মিত হয়। তখন চলনবিলের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ওই সময় ট্রেনে করে মাছ যেত কলকাতায়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মান করা হয়। ২০০২ সালে চলনবিলের বুক চিরে নির্মান করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বনপাড়া-হাটিকুমরুল-যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক। চলনবিলে মোট প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খাল রয়েছে। শুস্ক মওসুমে চলনবিলে এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বেঁচে আছে ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৮৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সারা বছর পানি থাকে। বর্ষার পানি সরে গেলে বিল-নদী-খাড়ীগুলো শুকিয়ে জেগে ওঠে দিগন্ত বিস্তৃর্ণ সমতল ভূমি। সেখানে রসুন, সরষে, ধান, শাক সবজিসহ নানা প্রকার ফসলের আবাদ হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারি বিভাগের মাধ্যমে উন্নত এবং স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরির ওপর গবেষনা চলছে। হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি ইনহ্যাজম্যান্ট প্রজেক্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুঁটকি মাছের ওপর গবেষনা শুরু করেছে। গুরুদাসপুরের সাবগাড়ী গ্রামের নান্নু হোসেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, কই, মাগুর, শিং, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচিবাইম, বোয়াল, ফলি, কাতল, লওলা, শোল, গজারসহ নানা জাতের মাছ শুকিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত এবং উন্নত মানের শুঁটকি তৈরি করছেন। সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নতমানের শুঁটকি তৈরির জন্য তাকে সাহযোগীতা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারি ডিপার্টমেন্ট। উন্নতমানের শুঁটকি তৈরির জন্য তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়,, চলতি মওসুমে চলনবিলে প্রায় ৬০ কোটি টাকা মূল্যের ২০০ থেকে ২১০ মেট্রিক টন শুঁটকি মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি চাতাল থেকে পছন্দের শুটকি মাছ কিনে নিয়ে যায়। শুঁটকি মাছের মান ভেদে তারা ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে বাছাই করা হয়।‘এ’ গ্রেডের (ভাল মানের) শুঁটকি মাছ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ২৫টি দেশে রফতানি করা হচ্ছে। সাধারনত এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে চলনবিলের মিঠাপানির শুঁটকি মাছের কদর রয়েছে। তাছাড়া ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ দেশের ভেতরে দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও চট্রগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে চলনবিলের শুঁটকি মাছ। সৈয়দপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী এখলাছ মিয়া জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের মান ভালো। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলনবিলের শুঁটকি মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
চলনবিলের বনপাড়া-হাটিকুমড়–ল-যমুনা সেতু সংযোগ সড়কের পাশে মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত তারাশের বিখ্যাত মহিষলূটিতে রয়েছে শুঁটকি মাছের আরত। মহিষলুটির বাজারের শুঁটকি মাছের আরতদার নান্নু মিয়া জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে তারা শুঁটকি মাছ তৈরি করে আসছে। ২০১৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। আগে সনাতন পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা হতো। এতে মাছের উপর মাছি ধুলা বালি পড়ত। কাঁচামাছ ভালোভাবে পরিস্কার করা হতো না। এখন শুঁটকির জন্য মাছ কেনার পর তা ভালো করে পানিতে পরিস্কার করা হয়। পরে মাছে লবণ মেখে চাটাইয়ে রোদে শুকাতে দেয়া হয়। চাটাইয়ের ওপরে ও চারপাশে নেট জাল দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়, যাতে মাছি ধুলা বালি মাছে পড়তে না পারে। আবার মাঝে মধ্যে নেটজাল দিয়ে খাঁচা তৈরি করে সেখানে বোয়াল, শোল, গজার, রুই, লওলা, কাতল, টাকি মাছ শুকানো হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শুকানো শুঁটকি মাছের গুণগত মান ভালো এবং দামও বেশি পাওয়া যায়। নান্নু মিয়ার আরত থেকে প্রতি সপ্তাহে ১৫-২০ মন শুঁটকি মাছ সৈয়দুর আরতে পাঠানো হয়। সেখানে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য মাছের ভাল দাম পাওয়া যায় না।
নাটোর জেলার মাধনগর গ্রামের ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান, জাকিরুল ইসলাম, জাহিদুল হক ও খায়রুল বাসার জানান, তারাশের মহিষলুটি মাছের আরতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। আরত থেকে মাছ কিনে তা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানাই। এখানে ৪ থেকে ৫ মাস শুঁটকি বানানো যায়। জাহিদুল জানান, তার আরত থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ মন শুঁটকি সৈয়দপুর, রংপুর ও নীলফামারীতে পাঠানো হয়। অন্য বছরের তুলনায় এবার শুটকির বাজার দর কিছুটা ভাল। কাঁচামাছের দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় লাভের পরিমান কম হচ্ছে। সৈয়দপুর শুঁটকির আরতে প্রতি কেজি পুঁটি মাছের শুঁটকি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারি বিভাগের শিক্ষক ড. ফৌজিয়া এদিব ফ্লোরা জানান, বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের শুঁটকি মাছের চাহিদা রয়েছে। হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি ইনহ্যাজম্যান্ট প্রকল্পটি শুঁটকি মাছের গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষে শুঁটকি তৈরিকারকদের দক্ষ করে গড়ে তোলার কাজ করছে। আগে সনাতন পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা হতো। যা গুণগত দিক দিয়ে তেমন উন্নত নয়। প্রকল্পটি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুঁটকি ও দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণসহ কারিগরি দিক দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের শিক্ষক ড, আবজাল হুসাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নতমানের শুঁটকি তৈরির জন্য গবেষণা চলছে। তিনি ওই প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এ প্রতিনিধিকে বলেন, বিদেশে শুঁটকি মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অন্য দেশে বাস করেও অনেক বাঙালি শুঁটকি মাছ খুব পছন্দ করেন। ভারতে বাংলাদেশের শুঁটকি মাছের চাহিদা সবচে বেশি। সেখানে বাংলাদেশ থেকে শুঁটকি যাওয়ার পর তারা ওই শুঁটকি দিয়ে চেপা শুঁটকি তৈরি করে অভিজাত ও উন্নতমানের বিভিন্ন হোটেলে সরবরাহ করে। মধ্যপ্রাচ্যের লোকজনও শুঁটকি মাছ পছন্দ করেন। স্থানীয় লোকজন জানান, দিনভর শুঁটকি শুকানো, বাছাই করা এবং বস্তায় প্যাকেট কাজে মহিলা ও পুরুষ এক সাথে কাজ করছে। চলনবিলে শুঁটকি তৈরির চাতাল ও আড়ত গড়ে ওঠায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫