ঢাকা, বুধবার,১৮ জানুয়ারি ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

দৃষ্টিপাত : রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা কতটা আন্তরিক?

সোহেল আহমদ

১১ জানুয়ারি ২০১৭,বুধবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শীতের এক সকালে আশপাশের কয়েক মসজিদের মাইক থেকে শুনতে পেলাম, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাহায্যের আহ্বান। স্থানীয় আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষের উদ্যোগে মিয়ানমার থেকে আগত এ নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতার জন্য তাদের এ উদ্যোগ। বাজারের দুই প্রান্তে মাইক লাগিয়ে সাহায্যের আবেদনের পরে অর্থের পাশাপাশি এলাকার সর্বস্তরের পুরুষ-মহিলা মসজিদে মসজিদে শীতবস্ত্র পাঠাতে লাগলেন। অভাবনীয় সাড়া পড়ে গেল চতুর্দিকে। কর্মস্থলেও শুনলাম এসব নিয়ে কয়েকজনের আলাপচারিতা। ‘পরের জন্য করলে কিছু-নিজের জন্য করা হয়। আল্লাহ তায়ালার কাছে এর যায় পাওয়া তার বিনিময়’ এমন মূলমন্ত্রের শিক্ষা ও নজির এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। মিয়ানমারের আরাকান থেকে নিরীহ-নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য এ দেশের মানুষ স্বভাবতই সহানুভূতিশীল। গায়ে পড়ে এসে ঝগড়া বাধালে ছেড়ে কথা কয় না। এ দেশের জন্মের পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্ণ হয়ে গেল। ধনী-দরিদ্রের শ্রেণী বিন্যাসের পাশাপাশি আরো নানা উপ-শ্রেণীতে সমাজের মানুষ আজ বিভক্ত। নিরীহ লোকদের শোষণ করে ধনিক শ্রেণী হয়েছে আরো ধনী আর দরিদ্ররা হয়েছে আরো দরিদ্র। দরিদ্ররা ধনিকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় ঠিকই; কিন্তু তাদের পছন্দ করে না; পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেক সময় কিছু করতে বা বলতে না পারলেও সময়মতো তারা ঠিকই জবাব দেয়। রোহিঙ্গা মুসলমানদের সহযোগিতার বেলায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, দিনের পর দিন তাদের ত্যাগের সম্মিলিত প্রয়াস রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য পাঠানো যে সাহায্য, তা নাফনদীর আশপাশে বস্তাবন্দী অবস্থায় পড়ে ছিল। প্রচণ্ড শীতেও নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের গায়ে তাদের দেয়া শীতের কাপড় বিলাতে বিলম্ব ঘটে। উপজেলা সদরের মসজিদে বহুদিন সাহায্যসামগ্রী পড়ে ছিল শুধু সুনির্দিষ্ট গাইডের অভাব আর সরকারের কড়াকড়িতে।
এ দেশে অকাজে ভূরি ভূরি নেতা মিললেও স্পর্শকাতর বিষয় হলে সরকারদলীয় নেতাসহ বড় পদধারীরাও সটকে পড়েন। উচিত কাজ হলো, দায়িত্ব নিয়ে উদ্যোগী হওয়ার। আবেগ আর ত্যাগের ফসল দুই ট্রাক শীতের কাপড় শীতে কাতর মানুষকে কাছে সময়মতো পৌঁছে দেয়ার বদলে পড়ে থাকল দিনের পর দিন। অবশেষে কোনো এক মাধ্যমে সাহায্যগুলো নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হলো। ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে কয়েকজন ট্রাকবোঝাই বস্ত্র আর প্রায় লাখ দুয়েক টাকা নিয়ে বের হলেন। কিন্তু আশা অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নিরাশায় পরিণত হলো। ইমাম সাহেবের জবানিতে জানতে পারলাম, রাস্তায় রাস্তায় বাধা আর বিজিবির তল্লাশিতে তারা নাজেহাল। হাটহাজারী মাদরাসাসহ সেখানকার প্রত্যেক মাদরাসা মাঠে কাপড়ের স্তূপের মধ্যে তাদের কাপড়ও স্থান পেল। কবে তাদের এই সাহায্যটুকু প্রকৃত দাবিদার মানুষজনের কাছে পৌঁছবে তার নিশ্চয়তা তারা পাননি। ২০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। যেসব এলাকায় তারা আশ্রয় নিয়েছে সেখানে নিশ্চয়ই স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা আছেন। আছেন সংসদ সদস্যসহ আরো দায়িত্বশীল ব্যক্তি। প্রয়োজন রোহিঙ্গাদের ওই জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা করে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া। মানবতার ক্রন্দনে সাধারণ মানুষ যারা কেঁদেছেন তাদের মহতী উদ্যোগ কখনোই বিফল হতে দেয়া যায় না। সরাসরি মানুষকে যেতে দিতে যদি সমস্যা থাকে তাহলে সরকারের কোনো বাহিনীর মাধ্যমে সে কাজটুকু করা যেতে পারে। কেন ইমাম সাহেবকে চুপিসারে বা ছদ্মবেশে রোহিঙ্গাদের হাতে অর্থ পৌঁছে দিতে হবে? সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, যত দ্রুত পারা যায় যাবতীয় নিয়ম মেনে অসহায় মানুষদের হাতে সাহায্যটুকু পৌঁছে দেয়া। হজরত মুহাম্মদ সা:- এর বাণী হলোÑ ‘আল মুসলিমু আখুল মুসলিমু’ অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমান একে অন্যের ভাই। বিশ্ববিবেক রোহিঙ্গাদের বেলায় দায়সারা ভাব দেখাচ্ছে।

লেখক : শিক্ষক, জৈন্তাপুর বিয়াম ডা: কুদরত উল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১৬৭/২-ই, ইনার সার্কুলার রোড, ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ৭১৯১০১৭-৯, ৭১৯৩৩৮৩-৪

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫