ঢাকা, সোমবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

আত্মসমালোচনা করতেই হবে

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

১০ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ২০:১৭


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

প্রিন্ট

আগের কথার জের
গত বুধবার ৪ জানুয়ারি ২০১৭, আমি কলাম লিখতে পারিনি অনিবার্য কারণবশত। তার আগের বুধবার, অর্থাৎ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে আমার কলামে আমি আত্মসমালোচনার প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছিলাম। আজকেও আত্মসমালোচনা প্রসঙ্গে পুনরায় কিছু কথা বলতে চাই; পুনরাবৃত্তি হলেও আশা করি সেটি ক্ষতির কারণ হবে না। তবে আজকের কলামের অংশ হিসেবে দু’টি কাজ সুনির্দিষ্টভাবে করব। প্রথম কাজটি হলো, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখের কলামে কী বলেছিলাম সেই কথাগুলো পাঠকের মনে বা স্মৃতিতে জাগ্রত করার জন্য, ওই দিনের কলামের প্রথম দুই অনুচ্ছেদ এখানে উদ্ধৃত করব। দ্বিতীয় কাজটি হলো, পবিত্র কুরআন ও হাদিসে আত্মসমালোচনা প্রসঙ্গে কী বলা আছে সেটি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করব। অতঃপর সাধারণ আলোচনা।

২৮ ডিসেম্বরের প্রথম অনুচ্ছেদ : আত্মসমালোচনা করা উপকারী কাজ
২০১৬ সালের শেষ বুধবার ২৮ ডিসেম্বর পাঠক এই কলাম পড়ছেন। কলামের শুরুতেই আমি একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করুন আপনি সমুদ্রের তীরে ভেজা বালুর ওপর দিয়ে হাঁটছেন। আপনি মনস্থির করলেন, আপনি সোজা হাঁটবেন এবং এক ইঞ্চিও এদিক-ওদিকে পা ফেলবেন না। অতএব দশ-বিশ কদম হাঁটার পর পেছনের দিকে তাকিয়ে নিজের পদচিহ্ন দেখার কাজটি উপকারী হতেই পারে। এটাকে আমরা বলতে পারি নিজের কর্মের পর্যালোচনা। আরেকটি উদাহরণ দেই। আমরা অনেকেই পরীক্ষার জন্য দারুণ প্রস্তুতি নিই, কিন্তু পরীক্ষার হলে প্রবেশের পর দেখা যায় প্রশ্নগুলো অনুমানের সাথে মেলেনি। অথবা পরীক্ষার খাতায় ভালো লিখলাম বলে মনে হলো, কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, ফল ভালো হয়নি। তাহলে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে কেন ভালো হলো না? এরূপ চিন্তা করাকে বলা যায় আত্মসমালোচনা। অর্থাৎ নিজের অতীত বা সাম্প্রতিক অতীতের কর্মকাণ্ডকে বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিতে দেখার কাজটি প্রয়োজনীয় কাজ; যেই নামেই ডাকি না কেন।

২৮ ডিসেম্বরের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ : আত্মসমালোচনা করতে গেলে সীমাবদ্ধতাও আছে
২০১৬ সাল চলে গেল এবং ২০১৭ সাল এসে গেল। ২০১৬ সাল কেমন গেল বা ২০১৭ সাল কেমন হতে পারে- এ নিয়ে আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে বাংলাদেশে যেহেতু নির্মোহ আলোচনাকে খুব কম লোকই সম্মান করে, তাই সাহসের সাথে নির্মোহ আলোচনা বা সমালোচনা করা খুব ব্যতিক্রমী একটি কাজ। আমি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মী। অতএব আমি যদি এই দলের হয়ে আত্মসমালোচনা করি, তাহলে এটি আমার এখতিয়ারভুক্ত কাজ বলে ধরে নেয়া হবে। কিন্তু আমি যদি অন্য একটি রাজনৈতিক দলের (আত্ম)সমালোচনা করি, তাহলে সেটি আমার এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ বলে গণ্য হবে। রাজনৈতিক দলটি যদি বন্ধুপ্রতিম হয় এবং আমার করা সমালোচনাটিকে অপ্রিয় মনে করেন, তাহলে বন্ধুটিই প্রশ্নের ও হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা আছে। অতএব আজকে ২৮ ডিসেম্বর তারিখে আমার প্রথম সামষ্টিক আত্মসমালোচনা হলো, আমরা পারস্পরিক সমালোচনার পরিবেশ বা আবহ সৃষ্টি করতে পারিনি; অন্তত আমি নিজের ওপর আস্থা পাই না কোনো বন্ধুর সমালোচনা করতে।

জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে পবিত্র হাদিস
বোখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফ থেকে, ইন্টারনেটে উদ্ধৃত করা একটি হাদিস; যার বাংলা অনুবাদ এরূপ : ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই যার যার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হবে। দেশের শাসক একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাকে তার দেশবাসীর প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ সংসারের দায়িত্বশীল, এই দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী-স্বামীর সংসারে সন্তানাদি দেখাশোনার জন্য দায়িত্বশীল। তাকে তার ওই দায়িত্বের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। জেনে রাখো, তোমরা সবাই যার যার জায়গায় দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই এ জন্য জবাবদিহি করতে হবে।’

পবিত্র কুরআন প্রসঙ্গে
পবিত্র কুরআন হচ্ছে, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রেরিত বাণীর সমষ্টিগত রূপ। ওই বাণীর মধ্যে আছে : সৃষ্টির বিবরণ, প্রকৃতির বিবরণ, মানুষের বিভিন্ন প্রকার কর্মকাণ্ডের তাৎপর্য, চরিত্র গঠন, আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তি, উপদেশ, আদেশ, পরামর্শ, উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য, মানবজাতির কোনো কোনো অংশের ইতিহাসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ, বৈজ্ঞানিক তথ্য, চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য, ঘটনার ও মানব চরিত্রের উদাহরণ, উদ্ধৃতি ও উদাহরণের ব্যাখ্যা ইত্যাদি প্রসঙ্গ। তবে আজকের কলামটি যেহেতু আত্মসমালোচনা প্রসঙ্গে, সেহেতু আমি এই কলামে পবিত্র কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো থেকেই দু-চারটি মাত্র উদ্ধৃত করব; যেখানে প্রয়োজন মন্তব্যসহ। পবিত্র কুরআনে ১১৪টি সূরা বা অধ্যায় আছে। সূরার নাম এবং আয়াতের নম্বর উল্লেখ করেছি, যাতে কোনো পাঠক ইচ্ছা করলে অধিকতর অধ্যয়ন করতে পারেন। প্রথমে পবিত্র কুরআনের বাক্যটি বাংলা উচ্চারণে লিখছি, অতঃপর নিকটতম অর্থ লিখছি। আমার হাতের কাছে কুরআনের অনেকগুলো অনুবাদ বই বা উচ্চারণসহ অনুবাদ বই বা তাফসির গ্রন্থ (যেখানে আরবি ছাপা, বাংলা উচ্চারণ, বাংলায় অর্থ ও বাংলায় ব্যাখ্যা সবই আছে) মজুদ আছে। বাংলা উচ্চারণে লিখতে গিয়ে কোন মনীষীর শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করব সেটি একটি প্রশ্ন হলেও আমি ওটা নিয়ে গবেষণায় যাচ্ছি না বা আপনারাও মেহেরবানি করে যাবেন না; ভুলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

গিবত প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত
৪৯ নম্বর সূরা : সূরা আল হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াত। ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাজি না আমানুজতানিবু কাসিরাম মিনাজ জোয়ান্নি, ইন্না বাদ্বোয়াজ জোয়ান্নি ইসমু ওয়ালা তাজাসসাসু ওয়ালা ইয়াগতাব বাদ্বুকুম বাদ্বোয়া; আইয়ুহিব্বু আহাদুকুম আইঁ ইয়াকুলা লাহমা আখিহি মাইতান ফাকারিহতুমুহ্; ওয়াত্তাকুল্লাহ; ইন্নাল্লাহা তাওয়াবুর রাহিম।’ অর্থ : হে ঈমানদারগণ; তোমরা বহুবিধ অনুমান থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান পাপ হয়ে যায় এবং দোষ তালাশ করো না আর একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ এ কথা পছন্দ করবে যে, সে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে? বস্তুত এটা তোমাদের কাছে পছন্দনীয় হবে না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ খুব তাওবা কবুলকারী, দয়ালু।

গিবত পরিহার করতে হলে কী করণীয়
গিবত যেন করতে না হয়, তার জন্য বিকল্প পন্থা উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। সেই পন্থার নাম উন্মুক্ত সমালোচনা। উন্মুক্ত সমালোচনা দুই প্রকার। প্রথম হলো প্রকাশ্য স্থানে, সবার সামনে এবং জনগণের জন্য প্রকাশিতব্য সমালোচনা। দ্বিতীয় হলো সীমাবদ্ধ স্থানে, সীমিত পরিসরে, সীমিত আলোচকের দ্বারা এবং সীমিতভাবে প্রকাশিতব্য সমালোচনা। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কারণে ওপরের দু’টি বিকল্প পন্থার বাইরেও বন্দোবস্ত বিদ্যমান। মাল্টিপল টেলিফোন কল বা কনফারেন্স টেলিফোন কল, মাল্টিপল ই-মেইল, পাল্টিপল স্কাইপ কনফারেন্স, ফেসবুক লাইভ, টকশো লাইভ ইত্যাদি সমালোচনার অন্যতম পন্থা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এ পন্থাগুলো বা বিকল্পগুলো যদি হাতের নাগালে না থাকে, তাহলেই মানুষ গিবতের আশ্রয় নেয়। গিবত যত খারাপ কাজই হোক এবং আমার পক্ষ থেকে কথাটি বলা অপ্রিয় হলেও বলতেই হচ্ছে, গিবত বাংলাদেশের সমাজে অতি কমন বা সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য। এর জন্য অতীত ও বর্তমানের মুরব্বিরা দায়ী। আমরাও দায়ী। কিন্তু এই বদ অভ্যাস থেকে বের হওয়ার একটিই মাত্র রাস্তা এবং সেটি হলো সমালোচনার ব্যবস্থা রাখা। সমালোচনা দ্বিপক্ষীয় হয়। সমালোচনাকারী পক্ষ এবং সমালোচনা মোকাবেলাকারী পক্ষ। যারা সমালোচনা মোকাবেলা করবেন, তারা তাদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই আত্মসমালোচনা করলে নিজেদের জন্য ভালো। অর্থাৎ প্রথমে নিজের সমালোচনা নিজে করা তথা আত্মসমালোচনা করা, অতঃপর সমালোচনার মাহফিলে যাওয়া এবং সমালোচনা মোকাবেলা করা।

পবিত্র কুরআনের অন্যান্য আয়াত : প্রসঙ্গ আত্মসমালোচনা
৪৩ নম্বর সূরা : সূরা আয যুখরুফের ৪৪ নম্বর আয়াত। ‘ওয়া ইন্না লাযিকরুল লাকা ওয়া লিকাউমিক, ওয়া সাউফা তুসআলুন।’ অর্থ : ‘এবং নিশ্চয়ই তা হচ্ছে আপনার জন্য এবং আপনার সম্প্রদায়ের জন্য; আর অবিলম্বে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।’ ৮৮ নম্বর সূরা : সূরা আল গাশিয়াহর ২৫-২৬ নম্বর আয়াত। ‘ইন্না ইলাইনা ইয়াবাহুম; সুম্মা ইন্না আলাইনা হিসাবাহুম।’ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আমার প্রতি তাদের প্রত্যাবর্তন হবে, অতঃপর নিশ্চয় আমারই দিকে তাদের হিসাব রয়েছে।’

একটি অতি পরিচিত আয়াতের তাৎপর্য
আমরা সাধারণ মুসলমানেরা সম্মিলিত নামাজে বা একা একা নামাজে, দু-তিনটি মুনাজাত ঘন ঘন সম্পন্ন করি। তার মধ্যে একটি মুনাজাত এরূপ। সপ্তম সূরা, সূরা আ’রাফের ২৩ নম্বর আয়াত। ‘রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতার হামনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন।’ অর্থ : ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের নফসের ওপর জুলুম করেছি, তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো, আমাদের প্রতি করুণা না করো তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির গ্রন্থগুলোতে বিস্তারিত বক্তব্য আছে। আমরা এখানে, এই অনুচ্ছেদে অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। আদম আ: ও হাওয়া আ: বেহেশতে ছিলেন। তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোর মধ্যে অন্যতম নিষেধাজ্ঞা ছিল, একটি সুনির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল না খাওয়া। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় বা শয়তানের ষড়যন্ত্রে উভয়েই সেই নিষেধাজ্ঞার কথা ভুলে যান বা অবহেলা করেন, তথা ভুলটি করেন। তারা নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেন। তারা বিপদে পড়েন। তারা বেহেশত থেকে পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হন। তারা যুগের পর যুগ কষ্ট করেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সাবধান বাণীর কথা মনে করে তারা এ বাক্যটি উচ্চারণ করতেন তথা এই শব্দমালায় প্রার্থনা করতেন।

মুনাজাতটির সাথে আত্মসমালোচনার সম্পর্ক
এখানে (৭:২৩) স্বীকারোক্তি আছে যে, তারা নিজেদের নফসের ওপরে নিজেরাই জুলুম করেছেন। তারা বলেননি, নিজেদের শরীরের ওপর নিজেরা জুলুম করেছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান হচ্ছে চিন্তার জগৎ, অর্থাৎ নফস বা আত্মা। সেই নফস বা আত্মার ওপর অযাচিতভাবে ভুল চিন্তা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই তারা স্বীকার করছেন। মনীষীদের মতে, এটি আত্মসমালোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনার সম্মিলিত প্রকাশভঙ্গি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন উদাহরণের মাধ্যমে, নিজেদের ভুলভ্রান্তির কথা স্বীকার করে নিতে। অতঃপর ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চাইতে এবং ক্ষমা না পেলে কী পরিণতি হতে পারে সেটিও নিবেদন করতে।

আত্মসমালোচনা এবং পরে উপকারের প্রার্থনা
পবিত্র কুরআনের অন্য একটি আয়াত উদ্ধৃত করছি। ৩৯ নম্বর সূরা, সূরা জুমার ৫৩ নম্বর আয়াত। ‘কুল ইয়া ইবাদিয়াল্লাজিনা আশরাফু আলা আনফুসিহিম লা-তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহ; ইন্নাল্লাহা ইয়াগফিরুজ জুনুবা জামিয়া; ইন্নাহু হুয়াল গাফুরুর রাহিম।’ অর্থ : ‘বলে দিনÑ হে আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ তারা আল্লাহর রহমতপ্রাপ্তি থেকে নিরাশ হইয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করবেন, তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ এ আয়াতটি প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে যথেষ্ট আছে। কিন্তু আমরা সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে এখানে উল্লেখ করছি। পবিত্র হাদিস গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, সূরা জুমারের এ আয়াতটি বিশ্বের মানুষের জন্য সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। মানুষ ভুল করবে এবং বিপদগ্রস্ত থাকবে, এটি স্বাভাবিক ধরে নিয়েই মানুষ আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলতে থাকবে- এটিকে ধরে নিয়েই মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি এই বক্তব্য রেখেছেন।

উপকারপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে মন্তব্য
ওপরের অনুচ্ছেদে উদ্ধৃত আয়াতটির আলোচনার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করছি। আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, আমি সাহায্য কেন চাচ্ছি। বিদ্যমান অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য, অতীতের উন্নত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য, প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যকে ডিঙ্গানোর জন্য, নিজের জাগতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য, নিজের আখেরাতের শাস্তি কমানোর জন্য, নাকি অন্য কিছু? যেটিই করি, সবার আগে আমার নিজেকে নিজে বিশ্লেষণ করতে হবে যে, কোন জায়গায় বাধাগুলো আছে, কোন জায়গায় ভুলভ্রান্তি আছে বা জীবনের ঘটনাপঞ্জিতে কোন জায়গায় এমন কিছু আছে; যার প্রভাবে অন্য অনেক ইতিবাচক বিষয় চাপা পড়ে যাচ্ছে। যেহেতু মহান আল্লাহ তায়ালাই সাহায্য করার সর্বোত্তম অধিকারী, তাই তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্ন থাকে, সেই সাহায্য পাবো কি পাবো না, তথা সেই দয়া পাবো কি পাবো না, তথা আল্লাহর অধিকতর রহমত আমার বা আমাদের ওপর বর্ষিত হবে কি হবে না। এ বিষয়টিকেই খোলাসা করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলে দিচ্ছেন, কুরআন পাঠক তথা ঈমানদার ব্যক্তি যেন অবশ্যই আল্লাহর রহমত প্রসঙ্গে নিরাশ না হন বা হতাশ না হন। কুরআন পাঠক ব্যক্তি কারা? খুচরা ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, রাজনৈতিক নেতা, মসজিদের মোয়াজ্জিন ও ইমাম, অফিসের বড় সাহেব, অফিসের পিয়ন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অনলাইন ব্লগার, রিকশাচালক, গৃহিণী, গৃহকর্মী, অফিস সহকর্মী, বিমানের পাইলট, সামরিক বাহিনীর বড় অফিসার, পুলিশের কনস্টেবল সবাই কুরআন পাঠক হতে পারেন তথা ঈমানদার ব্যক্তি হতে পারেন। তাহলে যারাই কুরআন পাঠক হচ্ছেন এবং ঈমানদার ব্যক্তি হচ্ছেন, তাদের সবার জন্যই পবিত্র কুরআনের এ বাক্যটি প্রযোজ্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ : উত্তর আফ্রিকা (১৯৪১-৪৩)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে, উত্তর আফ্রিকায় জার্মান বাহিনী প্রায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনী তথা অ্যালাইড ফোর্সেস বা মিত্রশক্তি জার্মান বাহিনীর অগ্রগতির মুখে খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছিল। এ রকম পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ইজিপট বা মিসরের পশ্চিম সীমান্তে উপস্থিত হয়ে পড়ে, তখন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার একজন কনিষ্ঠ লেফটেন্যান্ট জেনারেলকে দায়িত্ব দিয়ে উত্তর আফ্রিকা পাঠান; তার নাম মন্টগোমারি। ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ফিল্ড মার্শাল মন্টগোমারি অব আল-আলামিন হিসেবে। তবে আমরা বলছি বিখ্যাত হওয়ার আগের কথা, বিখ্যাত হওয়ার শুরুর কথা। তিনি প্রথমেই ব্রিটিশ বাহিনীর আত্মসমালোচনা করেছেন। আত্মসমালোচনার একটি অংশ ব্রিটিশ সরকারকে গোপনীয়ভাবে জানিয়েছেন। আত্মসমালোচনার আরেকটি অংশ অধীনস্থ অফিসার এবং সৈনিকদের জানিয়েছেন। আত্মসমালোচনার মর্মবস্তু নিজের কর্মজীবনে প্রয়োগ করেছেন। ব্রিটিশ বাহিনী, জার্মানদের হাত থেকে উত্তর আফ্রিকা পুনরায় উদ্ধার করেছিল গৌরবের সাথে।

পাকিস্তানের দুইজন প্রধানমন্ত্রী
পাকিস্তানের দুইজন প্রধানমন্ত্রীর নাম, এই কলামের প্রায় পাঠকই জানবেন। একজনের নাম বেনজির ভুট্টো, যিনি বর্তমানে মরহুম। অপরজনের নাম নওয়াজ শরিফ, যিনি এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন। বিস্তারিত ঘটনাপঞ্জিতে না গিয়েও এটুকু বলা যায়। বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। লোকে বলে, সামরিক আমলা, বেসামরিক আমলা এবং রাজনৈতিক বিরোধী শিবিরের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। অতঃপর নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় আসেন। তিনিও কিছু দিন পর অনুরূপ ষড়যন্ত্রের কারণে ক্ষমতাচ্যুত হন। উভয়েই রাজনৈতিক পদ্ধতিতে নিজের তথা নিজেদের আত্মসমালোচনা করেন। উভয়েই পরবর্তীকালে আরো একবার করে ক্ষমতায় আসেন।

ভারতের ইন্দিরা গান্ধী
১৯৬২ সালের যুদ্ধে তথা সীমিত পর্যায়ের সীমান্ত যুদ্ধে, ভারত চীনের কাছে পরাজিত হয়। ভারতের গৌরব ম্রিয়মাণ হয়। অনেক কারণের মধ্যে এরূপ একটি কারণ দায়ী ছিল প্রধানমন্ত্রী নেহরুর নীরব মৃত্যুর জন্য। একটু ট্রানজিট সময় পার হয়। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার প্রয়োজনে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতের গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্যও কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, ১৯৭০ সালের শেষে এবং ১৯৭১ সালের শুরুতে তার সামনে, পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি এনে দেয়। এক দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির মনে স্বাধীনতা অর্জনের অগ্নিশপথ এবং অপর দিকে ভারতের গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় রাজনৈতিক নেতার মনে তীব্র আকাক্সক্ষা। ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে তথা বাংলাদেশের মাটিতে সাফল্য পায়। নিজ শাসন মেয়াদের একপর্যায়ে ১৯৭০-এর দশকে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতে ইমার্জেন্সি জারি করেছিলেন। ইমার্জেন্সি জারি থাকা অবস্থায় তার নিজের দল এবং অতি ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক আচরণে সীমালঙ্ঘন করেছিলেন। নিকটতম নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর দল পরাজিত হয়। ইন্দিরা গান্ধী রাজনৈতিক পদ্ধতিতে নিজের তথা নিজেদের আত্মসমালোচনা করেন। তিনি পুনরায় নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন; যদিও পরবর্তীকালে আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশের দুইজন প্রধানমন্ত্রী
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। আন্দোলন-পরবর্তী নির্বাচনে যেকোনো একজনই মাত্র প্রধানমন্ত্রী হবেন, এটি সবাই জানত। হয়েছিলেন বেগম জিয়া। শেখ হাসিনা নিজের তথা নিজেদের আত্মসমালোচনা করলেন। তার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করলেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেন; বেগম জিয়া বিরোধী দলে গেলেন। বেগম জিয়া নিজের ও নিজেদের আত্মসমালোচনা করলেন এবং ২০০১ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী হলেন। ২০০৬ সালের শেষাংশে রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিযোগিতা হলো; জনগণের রাজনৈতিক নেতারা হেরে গেলেন। শেখ হাসিনা নিজের এবং নিজেদের আত্মসমালোচনা করলেন; এর ওপর ভিত্তি করে কৌশল নির্ধারণ করলেন। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনা জয়ী হলেন।
এই কলামের উপসংহার
ভুল করা মানুষের স্বভাবজাত। ভুল করলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর মানুষ চিন্তা করেÑ কেন ক্ষতি হলো। চিন্তার কারণে আবিষ্কৃত হয় কী কী ভুল ছিল। ভুলগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারে, আধা সামষ্টিক হতে পারে, সমষ্টিগত হতে পারে, সাংবিধানিক হতে পারে, রাজনৈতিক হতে পারে, চিন্তায় হতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে হতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় হতে পারে, সিদ্ধান্ত জানানোর প্রক্রিয়ায় হতে পারে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এস্টিমেট করতে ভুল হতে পারে ইত্যাদি। এরূপ ভুল ব্যবসায়ী করেন, ছাত্র করেন, শিক্ষক করেন, সামরিক কর্নেল করেন, ম্যাজিস্ট্রেট করেন, থানার ওসি করেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি করেন, রাজনৈতিক নেতা করেন তথা প্রায় সবাই করেন। অতএব, আত্মসমালোচনা করে সামনের দিকে বের হওয়াই সব পেশাজীবীর জন্য বাধ্যতামূলক কাজ। সুধী পাঠক, আশা করি নিজে বিবেচনা করবেন। আর যদি আপনি পাঠক না হন, তাহলে বলব- এটি আমার দুর্ভাগ্য।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ই-মেইল : mgsmibrahim@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১৬৭/২-ই, ইনার সার্কুলার রোড, ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ৭১৯১০১৭-৯, ৭১৯৩৩৮৩-৪

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫