ঢাকা, সোমবার,২৪ এপ্রিল ২০১৭

স্বাস্থ্য

শীতের অসুখ বিসুখ

অধ্যাপক ডা: ইকবাল হাসান মাহমুদ

১০ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৮:৫২


প্রিন্ট

শীতের এই সময় আমরা লক্ষ্য করছি বাতাসে তীব্র দূষণ। কার্বন মনো-অক্সাইড, সিসা আর ভাসমান বস্তুকণায় বাতাস এখন ঠাসা। আর এই দূষিত বাতাস আমরা প্রতিটি শ্বাসের সাথে গ্রহণ করছি। এসব অপদার্থ আমাদের ফুসফুসের শ্বাসনালীতে গিয়ে অতিরিক্ত সংবদেনশীলতার সৃষ্টি করছে। ফলে দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শ্বাসকষ্ট। শ্বাসকষ্টের মধ্যে অ্যাজমা বা হাঁপানি প্রণিধানযোগ্য। হাঁপানি রোগীরা এখন থেকেই ভিড় জমাচ্ছে ডাক্তারের চেম্বারগুলোতে, যাতে শীতকে তারা সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারে। হাঁপানি রোগীদের জন্য শীতকালটা একটা দুঃসময়। কারণ সারা বছর বাক্সবন্দী করে রাখা শীতের কাপড়, শাল বের করা হয়। এসব কাপড়চোপড়ে এক বছর ধরে জন্ম এবং বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে খালি চোখে দেখা যায় না, এমন এক ধরনের কীট যার নাম ‘মাইট’। যদি সেই বাক্সবন্দী করা কাপড় গরম পানিতে না ধুয়ে এবং তীব্র রোদে না শুকানো হয় তাহলে সেসব মাইটে ভর্তি পোশাক পরার সাথে সাথে ওগুলো শ্বাসনালীতে ঢুকে নিদারুণ সংবেদনশীলতার সৃষ্টি করে, শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে অথবা নতুন করে হাঁপানি রোগের জন্ম দেয়। তাই এই মাইটের ব্যাপারে আমাদের ব্যাপক সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে। যাদের ঘরে কার্পেট আছে কিংবা যারা মাস্ক না পরেই পুরনো বইখাতা ঘাঁটেন সেখানেও কিন্তু মাইটের সর্বনাশা ছোবল আপনাকে আক্রান্ত করতে পারে।

খুব ভালো হয় যদি ঘরে কার্পেট না রাখেন। আর যদি রাখতেই হয় তাহলে কার্পেট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার না করে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করুন। ঘরে যদি হাঁপানি রোগী থাকে তবে ঘর ঝাড়ু না দিয়ে কাজের মেয়েকে বলুন ঘর মুছে ফেলতে। একটা কথা মনে রাখবেন, ঘরের ধুলা বাইরের ধুলা থেকে বেশি বিপজ্জনক। কারণ ঘরের ধুলায় মাইট থাকে আর বাইরের ধুলায় মাইট থাকতে পারে না রোদের উত্তাপে। এবার একটু ধূমপানের কিছু কথা লেখার লোভ সামলাতে পারছি না। গ্রামে কিন্তু এখন কুয়াশা পড়ছে। তার এই সময়টিতে অনেকের কাছে সিগারেট, বিড়ি কিংবা হুক্কায় দম না দিলে যেন তাদের কাছে অপূর্ণই থেকে যায় সব কিছু। কিন্তু তারা টের পাচ্ছে না যে ধূমপানের কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে ক্রনিক ব্রংকাইটিস আর ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা ধরনের মারণব্যাধি। আমার কাছে যখন কোনো ক্রনিক ব্রংকাইটিসের কিংবা ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী আসে তখন জিজ্ঞেস করি আপনি কি ধূমপান করতেন? শতকরা ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর আসে ‘হ্যাঁ’। আমি তারপর জিজ্ঞেস করি ধূমপান বন্ধ করতে আপনাকে কেউ না করেনি? তখন উত্তর আসে ‘হ্যাঁ করেছিল কিন্তু তা শুনিনি’। তারপর সত্যই মনে মনে বলি এখন ঠ্যালাটা বুঝেন। এই সময়টিতে শিশুরা মারাত্মক ধরনের শ্বাসনালীর প্রদাহে ভুগছে। একিউট ব্রংকিওলাইটন দেখা দিচ্ছে ছোট্ট শিশুদের মধ্যে, যার বেশির ভাগই ভাইরাস দিয়ে ঘটে থাকে। শিশুর যদি কাশি এবং শ্বাসকষ্টের সাথে জ্বর থাকে তাহলে দেরি না করে সত্বর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসেন। আমি ছোট্ট শিশু এবং অতি বৃদ্ধদের ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ, কারণ তাদের উভয়েরই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই শিথিল থাকে। রোগজীবাণু বিশেষ করে ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে জেতা খুব দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই দুই প্রান্তের রোগীদের দেরি না করেই চিকিৎসা শুরু করে দিতে হয়। শিশুদের শ্বাসকষ্ট ছাড়াও বড়দের জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা নিয়ে ভুগতে দেখা যায়। কারো কারো আবার সর্দি, কাশি, গলা ব্যথাও থাকে। এ ধরনের রোগীদের বেদনানাশক ওষুধ খুব সাবধানে দিতে হয়। কারণ এখনো ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপের সময় শেষ হয়ে যায়নি। ওষুধ শুরু করার আগে একটি ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে যে তার ডেঙ্গু হয়নি। এটা জানার জন্য রক্তের প্লেটিলেট বা অণুচক্রিকা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। প্লেটিলেট কাউন্ট যদি ঠিক থাকে তবে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট অথবা বেশি জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল সাপোজিটরি মলদ্বার দিয়ে ব্যবহার করতে হবে। রোগী নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। চিকিৎসক আপনার রোগ নির্ণয় করেই অ্যান্টিবায়োটিকের ধরন এবং মাত্রা ঠিক করবেন। তিনি যত দিন এবং যে মাত্রায় খেতে বলবেন আপনি ঠিক তত দিনই খাবেন। এ ছাড়া প্রচুর পানি পান করুন, পাকা পেঁপে, জাম্বুরা অথবা আনারস খাবেন। যেকোনো ভাইরাস জ্বরেও কিন্তু দেহের রোগপ্রতিরোধ শক্তি হ্রাস পায়। তাই জ্বর হলে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খাবেন। একটা কথা মনে রাখবেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই। তাই সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। সুস্থ সুন্দর পরিবেশে থাকুন। ধূমপান বর্জন করুন। এখনই ঘর থেকে কার্পেট সরিয়ে দিন। শাকসবজি বেশি করে খান। কারণ তাতে প্রচুর ভিটামিন থাকে। আর ভিটামিন আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়াতে সাহায্য করে। ঠাণ্ডা খাবার বর্জন করুন, এসব সতর্কতা এবং সাবধানতা গ্রহণ করলে শীতকালটি হয়ে উঠবে আপনার জন্য প্রশান্তির।

লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ইকবাল চেস্ট সেন্টার, ৮৫ মগবাজার, ওয়্যারলেস মোড়, ঢাকা।
ফোন : ০১৭৪৫-৯১৯৬৬৪ ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫