ঢাকা, মঙ্গলবার,২৮ মার্চ ২০১৭

স্বাস্থ্য

বার্ধক্যে মানসিক স্বাস্থ্য

তাজওয়ার তাহমীদ

১০ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৭:৫৬ | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৮:৪৩


প্রিন্ট

যৌবনের শেষে আসে বার্ধক্য। যৌবনের উচ্ছলতা, চঞ্চলতা, অস্থিরতা, আর অপরিপক্বতা পরিপূর্ণ হয় পরিপক্বতায়, যখন মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হয়। বার্ধক্য মানুষের পরিপক্ব বয়স। মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় বার্ধক্যে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, Old is gold. বাংলায় বলা হয়, যৌবনের বুদ্ধি গলায়, বার্ধক্যের বুদ্ধি সম্মানিত।
কৈশরের উচ্ছলতা, যৌবনের কর্মচঞ্চলতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-দীক্ষা, বিবাহিত সুখী জীবন, সম্মানজনক জীবিকা, সন্তানদের সুশিক্ষা, পরিবারের সম্মানজনক জীবিকা, সন্তানদের সুশিক্ষা, পরিবারের পরিচর্যা, সামাজিক কর্মধারা, ধর্মীয় জীবনধারা ইত্যাদির সমন্বয়ে একজন সার্থকভাবে বয়স্ক মানুষ হয়ে উঠতে পারেন। এই বয়স্ক পরিণত মানুষটিই সংসারের এবং সমাজের অভিভাবক। তিনি সমাজ সংসারকে বিশ্লেষণ করেন তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে। যে সমাজে বিজ্ঞ অভিভাবক থাকে সে সমাজ সহসা কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয় না।
আমাদের সমাজে পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিরাই বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯-৩৫ বছর বয়সটি যৌবনের পরিচায়ক। ৩৫-৬৫ বছর মাঝ বয়স হিসেবে পরিচিত। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়স বার্ধক্য হিসেবে চিহ্নিত। বয়সের কালক্রমে মানুষের শরীরেও ঘটে নানা পরিবর্তন।
সমাজের অনেক নামকরা ব্যক্তিও এভাবেই তাদের যৌবনের জানান দেন বিয়ে করার মধ্য দিয়ে। সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে বুড়ো মানুষের যুবতী বিয়ে করার খবর পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়ে থাকে। বুড়ো বয়সে অনেক কবি-সাহিত্যিক তাদের আধুনিকতম কবিতাটি প্রকাশ করে থাকেন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান কবি আল মাহমুদ তাই এখনো আধুনিক কবি। তাই বয়স মানুষকে বৃদ্ধ বানালেও মন তার যৌবনকে ধরে রাখতে পারে। আর যার মনে থাকে যৌবনের বসন্ত তাকে কেউ বুড়ো বলে অবহেলা করতে পারে না।
তার পরও সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিরা বিষণ্নতায় ভোগেন। ডিপ্রেশন এবং পার্কিনসনস ডিজিজ তাদের কাবু করে ফেলে। সহজ-সরল বিষয়গুলোও তারা ভুলে যান। পরিবারে সমাজে এজন্য বুড়োদের অনেক অবহেলা করেন। তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তির ব্যক্তিও বয়স হলে অনেক কিছু ভুলে যান। এটা তাদের দোষ নয়। এটাই তাদের বয়সের পরিচয়। এ বয়সে নানা দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে। যেমন- কোনো চাকরিজীবী যখন অবসরে যান, তখন তার মনে আর্থিক সমস্যার বিষয়টি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি পেনশন, কিংবা কর্মসূত্রে পেনশন অথবা লগ্নি থেকে আয়, এমনকি বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েও মনের মধ্যে বাসা বাঁধে বার্ধক্যচিন্তা। বার্ধক্যজনিত অবক্ষয় বা ংবহরষব ফবমবহবৎধঃরড়হ যতটা ঘটে শরীরে, তার চেয়ে বেশি ঘটে মনের মধ্যে। তাই দেখা যায়, যে লোকটির ব্লাড প্রেসার এতদিন স্বাভাবিক ছিল, সে এখন উচ্চ রক্তচাপের রোগী হয়ে গেল। কারণ, বয়সের কারণে তার আবেগগত পরিবর্তন ঘটে যায়। তাই তিনি অতি সংবেদনশীল। বিজ্ঞানের ভাষায়, বার্ধক্যে মস্তিষ্ক ছোট হয়ে আসে, যাকে বলা হয় ব্রেইন এট্রফি। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এজন্য কেউ কেউ আলঝেইমারস ডিজিজ বা ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত হন। ফলে তার স্মৃতিশক্তি কমে যায়, আবেগ, অনুভূতি, বিচারবুদ্ধি, বিবেচনাশক্তি, চিন্তাশক্তি, কার্যশক্তিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সে সময় অনেকের আচার-আচরণে শিশুসুলভ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। স্মৃতিশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি এই তিন প্রয়োজনীয় শক্তি বার্ধক্যে হ্রাস পায়। প্রশান্তির নিদ্রাও কমে যায়। দীর্ঘ রাত জেগে থাকাটা তার মনোব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষদের মনোব্যথার সাথে যোগ হয় প্রস্রাবের সমস্যা। প্রস্টেটগ্রন্থী বড় হলে প্রস্রাবের সমস্যাটা তীব্র হয়। তা ছাড়া বয়সের কারণে কিডনির ছাঁকার ক্ষমতাও লোপ পায়। অনেক সময় কিডনি ফেইলিউর হলে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর যারা ডায়াবেটিসে ভোগেন তাদেরকে কিডনি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বয়স বাড়লে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াশিলতা কমে যায়। রক্তনালি সরু হয়ে যায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি হতে পারে। বয়স বাড়লে খাবার-দাবারে পরিবর্তন আসে। এ সময় পাকস্থলিতে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ক্ষরণ কমে যায়। ফলে হজম ক্ষমতাও অনেক লোপ পায়। কারো কারো কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়মিত কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধ বয়সে ফুসফুস বাতাস টেনে নিয়ে প্রয়োজনমতো ছাড়তে পারে না। কারণ, বুকের পাঁজরগুলো এ সময় অনেক কঠিন হয়ে যায় এবং পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বুকের ওঠা-নামায় সাহায্য করতে পারে না। এ সময় ব্রঙ্কাইটিস এবং এমফিসিমা (ফুসফুসের অস্বাভাবিক স্ফীতি) বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া নিউমোনিয়া এবং যক্ষ্মার প্রকোপও বয়স্কদের নিয়মিত সমস্যা হিসেবে দেখা যায়। বয়স বাড়লে শরীরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যায়। হাড়গোড় নরম হয়ে যায়। তাই অল্প ধাক্কাতেই ছাড় ভেঙে যেতে পারে। অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস এ সময় বেশি দেখা দেয়।
বার্ধক্যে পরিবার-পরিজনদের সাথে একত্রে বসবাস নিজেকে সুস্থ রাখার অন্যতম উপায়। ওল্ড হোম বা বৃদ্ধ নিবাসের ধারণা মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। সন্তানরা বৃদ্ধ পিতা-মাতার সার্বিক দেখাশুনা করবে, এটাই মুসলিম সমাজের অন্যতম আদর্শ। কুরআনের ভাষ্য হচ্ছেÑ ‘অর্থাৎ আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি (আনকাবুত-৮)’ পবিত্র কুরআনে আরো অনেক আয়াতে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহানবী সা:-ও পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যান্য ধর্মের আদর্শেও পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ রয়েছে।
বার্ধক্যের নানা সমস্যার সমাধানে নিজেকেই সচেতন থাকতে হবে। নিজেকে বৃদ্ধ না ভেবে সুস্থ-সবল ভাবাই শ্রেয়। সব সময় নিজেকে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। অর্থ উপার্জনের কাজ প্রয়োজন না হলে সমাজ কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। পরিবার-পরিজনের সাথে সময় কাটাতে হবে। নিয়মিত মেডিক্যাল চেক আপ করাতে হবে। নিজের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তার প্রবাহ বাড়াতে হবে। একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হবে।

ইসলামিক সাইকোথেরাপি ফিচার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫