ঢাকা, শনিবার,২৫ মার্চ ২০১৭

মতামত

বিদেশী চ্যানেলে স্বদেশি দর্শক

হোসাইন মুবারক

০৮ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ১৯:৫৯


প্রিন্ট

বাংলাদেশে সম্প্রচার হওয়া বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেলে দেশী বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর মালিকপক্ষের আন্দোলনের মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ৩ জানুয়ারির বেশ ক’টি জাতীয় দৈনিকে।
বিদেশী চ্যানেলে দেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বেশ আগেই দর্শককে হতবাক করেছিল। তখন সচেতন দর্শক বিষয়টা নিয়ে বেশ কৌতূহলে পড়েন। যে বিজ্ঞাপন দর্শকদের সচরাচর দেশী চ্যানেলে দেখে, সে বিজ্ঞাপন যদি বিদেশী চ্যানেলে দেখেন তখন তো আশ্চর্য হওয়ারই কথা।
দর্শক রিমোর্ট টিপে বহু দূরের বিদেশী চ্যানেল একেবারে সামনে পায় স্যাটেলাইটের কল্যাণে। চ্যানেলগুলোর প্রচারিত বহুবিচিত্র অনুষ্ঠানে মুগ্ধ হয়ে দর্শক সময়ের স্রোতে গা ভাসায়। তাই দিনে দিনে বিদেশী চ্যানেলগুলো হয়ে যায় ড্রয়িংরুমের বিনোদনকেন্দ্র।
বহু দূরকে কাছে আনে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিনির্ভর চ্যানেলগুলোকে পণ্য প্রচারে ব্যবহার করছে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বহু শ্রম ও অর্থ ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত শিল্পের প্রসার ঘটাতে যেকোনো শিল্পমালিক সর্বোচ্চ প্রচারকে গুরুত্ব দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। তার উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত প্রচার যদি না হয় তাহলে তো কোম্পানির লক্ষ্য পূরণ হবে না। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেয়া নিয়ে। যেসব কোম্পানির পণ্য স্বদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশী বাজারে স্থান করে নিয়েছে, তাদের প্রচার তো শুধু দেশী চ্যানেল দিয়ে পুরোপুরি সম্ভব নয়। তাদের পণ্যের ক্ষেত্র যেমন বিস্তৃত তেমন প্রচারও ব্যাপক পরিসরে হওয়া চাই।
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সংখ্যা ৪১, সম্প্রচারে আছে ৩২টি। কিন্তু একটি জরিপের মতে, মোট দর্শকের ৮০ শতাংশই ভারতীয় বাংলা চ্যানেল দেখেন।
ভারতীয় চ্যানেল স্টার জলসা, জি-বাংলা, জি-সিনেমা, জলসা মুভিজ এর মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে গেছে দর্শকমহলে। এসব চ্যানেল আজ বাংলার গ্রাম-শহর-বন্দরে চিত্তবিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গ। এই চ্যানেলগুলোর কিছু দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান আছে। এখানে তা উল্লেখ না করলেই নয়।
আগে স্টার জলসায় প্রচার হতো- চোখের তারা তুই, বোঝে না সে বোঝে না, ইষ্টিকুটুম, তোমায় আমায় মিলে। এখন প্রচার হয়- পটল কুমার গানওয়ালা, কুসুম দোলা, কে আপন কে পর, মিলন তিথি, পুণ্যিপুকুর, রাখিবন্ধন, বধূবরণ।
জি-বাংলায় আগে প্রচার হতো- রাশি, গোয়েন্দা গিন্নি; বর্তমানে প্রচার হচ্ছে- দিদি নাম্বার ওয়ান, রাধা, জড়োয়ার ঝুমকো, ভুতু, আমার দুর্গা, এই ছেলেটা ভেলভেলেটা। এসব ধারাবাহিকে দর্শক এত আসক্ত যে, আগামী পর্বে কী প্রচার হবে তা দেখার প্রস্তুতিতে প্রহর গোনেন। রাত-দিন এখন বাংলাদেশী দর্শক বিদেশী চ্যানেলে বিনোদন খোঁজেন। সনি টিভি, সনি ম্যাক্স, স্টার প্লাস, জি-টিভি বাংলাদেশী দর্শকের কাছে আরো খানিকটা জায়গা করে নিয়েছে।
ভারতীয় চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখা নিয়ে পরিবারে মনোমালিন্য এবং রিমোর্ট কাড়াকাড়ি পর্যন্ত হয়। এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া আরো গভীর। এখানে দু’টি পারিবারিক খণ্ড ঘটনা না বলে পারছি না। আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বার্ষিক খেলায় সমবয়সীদের হারিয়ে দু-তিনটা প্রাইজ জেতে এবং বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। এই আদুরে শিশু তার প্রিয় বিদেশী চ্যানেল দেখার জন্য বড়দের কাছ থেকে রিমোর্ট কেড়ে নেয়। কখনো না পেলে ঝগড়া বাধিয়ে কান্না শুরু করে। এ তো গেল এক শিশুর আসক্তির কথা, এবার ঘরের কথা একটু বলি- অফিসের কাজ সেরে যখন রাত ১০-১১টায় বাসায় ফিরি তখন দেখি আমার কাছের মানুষটি রিমোর্ট হাতে টিভি স্ক্রিনে ব্যস্ত। সেটা অবশ্যই বিদেশী চ্যানেলের অনুষ্ঠান নিয়ে। বিরক্ত হয়ে শিক্ষণীয় কিছু বললে, শোনা যায় নিত্যদিনের চেনা শব্দ ও দেখা যায় তৃপ্তির হাসি।
এটা কেবল একটি পরিবারের একক ঘটনা নয়। এ হচ্ছে একটি সামাজিক প্রতিচ্ছবি। হয়তো এর চেয়ে আরো গভীর ঘটনা সমাজে আছে। বিদেশী চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান দেখা, না দেখা নিয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও সংবাদপত্রে দেখা গেছে। এখন আমাদের ভাবার সময় এসেছে, কেন এমন ঘটছে। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ; মানের কারণে কি বিদেশী টিভির প্রতি আসক্তি?
আশির দশকে আমাদের দেশে এত বিদেশী চ্যানেলও ছিল না, আসক্তিও ছিল না। তখন দেশী ধারাবাহিকগুলো ছিল জনপ্রিয়তার তুঙ্গে- এসব দিনরাত্রি, অয়ময়, সংসপ্তক ধারাবাহিক নাটকগুলো দর্শক উপভোগ করত আনন্দের সাথে। বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর একটি নাটকে ‘বাকের ভাই’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। নাটকের ধারাবাহিকতায় তার ফাঁসির আশঙ্কায় ভক্ত-দর্শক রাস্তায় স্লোগান তুলে মিছিল করেছিলেন- ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, ভাঙব টিভি ঘরে ঘরে’। একটি টিভি নাটকে হুমায়ুন ফরীদি অভিনয় করেছিলেন কানকাটা রমজান চরিত্রে। এসব চরিত্র ছিল তখন খুবই জনপ্রিয়। ‘ছিঃ ছিঃ তুমি এত খারাপ’ এ রকম ডায়ালগ রাস্তাঘাটে শোনা গেছে তখন। তখন তো আমরা টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণে সার্থক ছিলাম। এখন কেন দর্শক হারাচ্ছি?
কিছু দিন আগে বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের কিছু শিল্পী-কলাকুশলীর আন্দোলন করতে দেখা গেছে। তাদের দাবি, বিদেশী চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করতে হবে। কারণ ভারতীয় চ্যানেল চালু হওয়ায় বাংলাদেশের দর্শক তাদের দেশীয় চ্যানেল দেখছেন না। এতে দেশী চ্যানেলগুলোর সামগ্রিক ক্ষতি হচ্ছে।
ভারতীয় যে ক’টি চ্যানেল বাংলাদেশে জনপ্রিয় তাদের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, অভিনয় শিল্পীদের চেহারা, পোশাক, শেড, সংলাপ, দৃষ্টিভঙ্গি, অভিনয় দক্ষতা সর্বোপরি থিম- সব কিছুই উপযুক্ত মানসম্পন্ন। বলা যায়, এসব কারণে আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো পিছিয়ে গেছে প্রতিযোগিতায়। এর ফলে দর্শকের সাথে সাথে কিছু বিজ্ঞাপনদাতাও ঝুঁকেছেন বিদেশী চ্যানেলে। আকাশ সংস্কৃতির যুগে সবাই হাতের কাছের ভালোটাই গ্রহণ করবে। এখন আমাদের মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের ভাবতে হবে আমরা কী করব।
২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন পাস হয়। ওই আইনের ১৯(১৩) ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশী কোনো টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না। ওই ধারার লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। ওই আইনের ১৫ ধারা অনুসারে কোনো অনুষ্ঠান ১৯ ধারার পরিপন্থী হলে সরকার তাৎক্ষণিক বা যাচাই করে বিপণন, প্রজ্ঞাপন ও সম্প্রচার সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধের নির্দেশ দিতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার তো শুধু বাংলাদেশী দর্শকদের জন্য নয়, বিদেশে যে এলাকাব্যাপী ওই চ্যানেলের প্রচার কার্যক্রম রয়েছে সেখানে রয়েছে আমাদের দেশী পণ্যের প্রসারিত বাজার। সেসব এলাকায় রীতিমতো আমাদের পণ্য ওই দেশীয় অনেক পণ্যের ভিড়ে বাজার দখল করে আছে। ওই দেশীয় একই ধরনের পণ্যের একই চ্যানেলে বিজ্ঞাপন গেলে এবং আমাদের বিজ্ঞাপন প্রচার না হলে রফতানি পণ্য মার খেতে পারে। এটাও সরকারকে ভাবতে হবে।
চ্যানেল মালিক ও শিল্পীদের ভাবতে হবে আমাদের অসঙ্গতিগুলো কোথায়? সেগুলো আগে দূর করতে হবে, দেশী চ্যানেলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে। আর সরকারেরও উচিত সেই বিষয়গুলো তদন্ত করে একটি বিধিমালার অধীনে আনা।
যে দেশে আমাদের চ্যানেলগুলো সম্প্রচার পায় না, ওই দেশের চ্যানেল আমাদের দেশে সম্প্রচার পাবে কেন? এসব অসঙ্গতি নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫