ঢাকা, শুক্রবার,২৬ মে ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

কেমন হবে ২০১৭

সালাহউদ্দিন বাবর

০৮ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ১৯:২০


সালাহউদ্দিন বাবর

সালাহউদ্দিন বাবর

প্রিন্ট

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সদ্য আগত ২০১৭ সাল কি একটি স্মরণীয় ও ঘটনাবহুল বছর হয়ে উঠবে, নাকি সাধারণ সাদামাটা বছর হিসেবে অতিবাহিত হবে? এ নিয়ে কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, ২০১৭ সাল নানা দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ একটি বছর। দেশের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা ঘটনাপ্রবাহের কারণেই বছরটি হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিদেশনীতির কারণেও বছরটি জাতীয় জীবনে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছরের সংঘটিত কিছু ঘটনার জের এ বছরও টানতে হতে পারে।
প্রথমে বিদায়ী বছর নিয়ে কিছু আলোকপাত করা যেতে পারে। ২০১৬ সাল তথা বিদায় নেয়া বছরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মাঝে মাঝে তরঙ্গের সৃষ্টি করেছিল। তাতে কিছু আলোড়ন ওঠে। সর্বত্র রাজনীতিতে অর্থনীতির গুরুত্ব সমধিক। দেশে গত বছরের সূচনা হয়েছিল বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে লোপাট হয় বিপুল অর্থ। অন্যান্য সরকারি ব্যাংক থেকেও বহু আর্থিক অনিয়মের খবর আসে। এসব আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে সংবাদপত্রে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। দেশের ব্যাংকিংব্যবস্থার এই অনিয়মের পেছনে রাজনৈতিক কলকাঠি ছিল। ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে যোগ্যতা-দক্ষতার বিচার না করে রাজনৈতিক পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান এমন এক ব্যক্তি, যিনি মাঝারি মানের একজন অর্থনীতিবিদ। ব্যাংকব্যবস্থার ক্ষেত্রে তার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ তার নেতৃত্বেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতেই চলে সরকারি ব্যাংকসহ দেশের গোটা ব্যাংকব্যবস্থা। একজন অর্থনীতিবিদ হলেই ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে পারঙ্গমতা আসবে তা সত্য নয়। এর ফলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে। এখন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে, ব্যাংকের ভেতরের লোকও এ অনিয়মের সাথে জড়িত। এসব ঘটনার দায় মাথায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান বিদায় নিয়েছেন বটে, কিন্তু সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর যে দুরবস্থা, তা আসলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আলামত।
গত বছর আর একটি বিষয় নিয়ে সবসময় আলোচনা চলেছে। তা হলোÑ উগ্রপন্থীদের অপতৎপরতা। দেশের ভেতর উগ্রপন্থীদের খুনখারাবি যেমন ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমর্যদাকে ক্ষুণœ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশীদের ওপর হামলা এবং তাদের হতাহতের ঘটনা দেশের বাইরে দেশের মর্যাদাকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিদেশীদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন। কূটনৈতিক দিক থেকে সন্ত্রাসীদের এই তৎপরতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উগ্রপন্থীদের যে তৎপরতা, এর সাথে এ দেশের উগ্রপন্থীদের যোগাযোগ ছিল। স্বস্তির বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। উগ্রপন্থীদের তৎপরতায় লক্ষ করা গেছে যে, দেশের সাধারণ মানুষ ও দল-মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। জাতীয় ঐক্যের এক চমৎকার নিদর্শন এটা। গত বছরের শেষ দিক পর্যন্ত উগ্রপন্থীদের তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। এই উগ্রপন্থার সাথে নারীরাও জড়িত।
গত বছর আরো কয়েকটি বিষয় লক্ষ করা গেছে। সরকারের দেয়া হয়রানিমূলক মামলায় দেশের প্রধান বিরোধী বড় দল বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের বিভিন্নপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বারবার আদালতে যেতে হয়েছে। এতে তাদের হয়রানি এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। গত বছরও বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলাসহ গুমের ঘটনা ঘটেছে। অপর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর সমানতালে মামলা ও গুমের ঘটনা ঘটে। দলটির সাবেক আমির ও অপর এক কেন্দ্রীয় নেতাকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। দলটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতেও মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতার প্রতি ক্ষমতাসীনদের এই বৈরী আচরণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর এবং এটা সরকারের জবাবদিহিতাকে বিনষ্ট করেছে। বিরোধী দলের সমালোচনাকে যদি আমন্ত্রণ জানানো হতো, তা হতো সরকারের জন্য কল্যাণকর। বিরোধী দল সমালোচনা করলে ও ভুলত্রুটি তুলে ধরলে, ক্ষমতাসীনরা নিজেদের সংশোধন করতে এবং সঠিক পথে চলতে পারত। বিগত বছরেও সরকার প্রতিপক্ষের সমালোচনা সহ্য করার বিষয়টি দেখাতে পারেনি।
২০১৬ সালের মিয়ানমারের বিপুল রোহিঙ্গা মুসলিম উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশের ফলে এখানকার আর্থসামাজিক জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে বাড়তি বোঝা ছাড়াও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারকে তৎপর হতে হয়েছে।
এই উদ্বাস্তুদের আগমন আগেও ঘটেছিল। এখনকার মতো সে সময়ও প্রাণ রক্ষার জন্য হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েও ফেরত পাঠাতে পারেনি। আজো তারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ আগেও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পেয়েছিল। এবারো রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসঙ্ঘ এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থা সমবেদনা প্রকাশ করেছে। আরো একটা বাড়তি জিনিস দেখা গেছে, আর সেটা হলোÑ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ সমস্যার ব্যাপারে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। উভয় দেশই মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সে দেশে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখার জন্য মিয়ানমার ও সে দেশের রাখাইন অঞ্চল সফর করেছেন। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার প্রতিবাদে ও তাদের সাহায্য-সহযোগিতার দাবিতে ইসলামপন্থী দলগুলো সভা-সমাবেশ বিক্ষোভ করে। দেশের সংবাদপত্রগুলোও রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের জন্য প্রচুর লেখা প্রকাশ করে। এসব ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছর দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে। নারী নির্যাতনের ঘটনা অতীতের চেয়ে বহু গুণে বেড়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মানবাধিকার পরিপন্থী কার্যকলাপের বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০১৬ সালে দেশের বড় দুই দল বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে এই দুটি কাউন্সিল ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। রাজনৈতিক দলের এমন বর্ণাঢ্য আয়োজনের আগে আর দেখা যায়নি। উভয় দলের বিভিন্ন পর্যায়ে এবার নবীন ও নতুন মুখ নেতৃত্বে এসেছে। তবে দলের শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসেনি।
গত বছরের শেষ সময়ের কয়েকটি ঘটনা জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি ছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচন। গত পাঁচ বছরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে জনগণের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত হতাশাজনক। কারচুপি, ভোট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল এবং জনগণের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়া সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রের জন্য তা চরম দুর্ভাগ্যের। কিন্তু নাসিক নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আগে ক্ষমতাসীনদের কর্মী-সমর্থকদের হস্তক্ষেপে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যেত। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে, নাসিক নির্বাচনে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। ফলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচন মানে এখন সংঘর্ষ, সঙ্ঘাত ও খুন-জখম। নাসিক নির্বাচনে এসব কিছুই ছিল না।
কিন্তু এ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন পর অনুষ্ঠিত হয় জেলা পরিষদ নির্বাচন। নাসিক নির্বাচনে আলোর যে বিচ্ছুরণ দেখা গিয়েছিল জেলা পরিষদে তা আর ছিল না। সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল তা ম্লান হয়ে যায়। এ নির্বাচন ছিল পরোক্ষ আর এ নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটাররা সবাই একই দলের তথা ক্ষমতাসীন দলের। এর পরও সে নির্বাচনে অনিয়ম, টাকার ছড়াছড়ি এবং নিজেদের মধ্যে ঘটেছে সংঘর্ষ। ভঙ্গ হয়েছে নির্বাচনী আচরণবিধি।
আর একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। গত বছর এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আর তা শেষ হবে এ বছর। বিষয়টি হলোÑ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে আগামী মাসে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠন করতে রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে বৈঠক করছেন। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল ইতোমধ্যে নিজ নিজ প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল এখনো রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেনি। ১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করবে বলে খবর বেরিয়েছে।
বিগত বছরের শেষ দিন গাইবান্ধায় নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এ নির্মম হত্যাকাণ্ড এক দিকে যেমন দুঃখজনক, অপর দিকে ভীতিকর। দেশের ক্ষমতাসীন দলের একজন এমপির দুর্বৃত্তদের হামলায় নিজ ঘরে নিহত হওয়ার ঘটনা যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির স্বাক্ষর, তেমনি দেশের দুর্বৃত্তরা যে কত বেপরোয়া তার প্রমাণ। এখনো পুলিশ এ হামলার কোনো কারণ বের করতে এবং হামলাকারীদের হদিস করতে পারেনি। এ দিকে কিছু পত্রিকায় বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ পাচ্ছে যা জনগণের সত্য জানার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করবে।
আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে নতুন বছরে আলোচনা চলবে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দলের সাথে সংলাপ করে সার্চ কমিটি গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে এবং সদস্যদের নির্বাচিত করার জন্য বিভিন্ন দলের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। এখনো আওয়ামী লীগের সাথে বৈঠক হয়নি। তাই এখনই এ সংলাপ অর্থপূর্ণ হবে বলার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া একক সিদ্ধান্তে কিছু করার এখতিয়ার রাখেন না। আর প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কী পরামর্শ দেবেন, তা বলা যায় না।
রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন দলের সাথে সংলাপের সারাংশ ও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের সমন্বয় করা যাবে কি না সে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা থাকায় এবং তার পরামর্শ যদি অন্যান্য দলের সংলাপের মূল চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে এ দীর্ঘ সংলাপ যেমন অর্থহীন হয়ে পড়বে, তেমনি অন্যান্য দল তা মানবে কি না সেটাও একটি বিষয়। ঐকমত্যের ভিত্তিতে যদি সার্চ কমিটি গঠিত না হয়, তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবার অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সার্চ কমিটি গঠিত হওয়ার পর সেই কমিটি যেসব নামের সুপারিশ করবে, রাষ্ট্রপতি সে মোতাবেক এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। কিন্তু কমিশনের সদস্যরা যদি সবার দৃষ্টিতে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও যোগ্য না হন তাহলেও সমস্যা দেখা দেবে। কেউ কেউ এটা মানতে চাইবেন না।
বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন কমিশন না হলে তা মেনে নেবে না। বর্তমান কমিশন নিয়ে বিএনপির গুরুতর আপত্তি রয়েছে। এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে তারা অনেক নির্বাচনে অংশ নিতে আপত্তি তুলে নির্বাচন বয়কট করেছে। এবারও যদি নির্বাচন কমিশন নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয় তবে গোটা প্রক্রিয়া ভণ্ডুল হয়ে যাবে। গত পাঁচ বছর জনগণ অপেক্ষা করে আছে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে। যোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান হোক এমন আশা সবার।
নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে যদি বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তবে দেশের আর্থসামাজিক জীবনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তিশৃঙ্খলা ব্যাহত হবে। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়বে সর্বত্র। উন্নয়ন কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়বে বেশি। একটি দক্ষ যোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন এবং তার অধীনে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি রয়েছে আন্তর্জাতিক বলয়ে। এর সাথে আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা জড়িত।
গত বছর নানা কারণে বাংলাদেশকে পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে তৎপর থাকতে হয়েছে। নতুন বছরেও এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। পৃথিবীর এক নম্বর পরাশক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে। নয়া সরকারের পররাষ্ট্র নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে, তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। তা ছাড়া বাংলাদেশের রফতানিবাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক উপরে। আমাদের রফতানিবাণিজ্যে পোশাক শিল্পের বড় বাজার সেখানে। এটা শুধু বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতই নয়, এই শিল্পে বিপুল শ্রমশক্তি নিয়োজিত। বিশেষ করে নারীকর্মীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। এ বাণিজ্যে কোনো সমস্যা হলে জাতীয় অর্থনীতি এবং আর্থসামাজিক জীবনে অস্থিরতা দেখা দেবে।
বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এ বছরটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভারতের গুরুত্ব বাংলাদেশের কাছে তেমন দেখা যায় না। লক্ষ্য করা যায়Ñ ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে এ পর্যন্ত শুধু নিয়েছে। কিন্তু দেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো নয়। অপর প্রতিবেশী দেশ চীনের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। আর উন্নয়নসহযোগী হিসেবে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই পক্ষের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এ বছরে কৌশলী ভূমিকা বাংলাদেশকে রাখতে হবে।
চলতি বছর দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশে বেকারদের সংখ্যা বিপুল। এ বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের গুরুত্ব অনেক। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বিষয়টি সবার নজরে থাকা উচিত। বিশেষ করে, সরকারকে এ জন্য দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো নয়। শিল্পে বিনিয়োগ করার লক্ষ্যে সরকার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
বাংলাদেশে উন্নয়নের একটি গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উন্নয়নের সাথে অর্থসম্পদের যেমন সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি অর্থসম্পদের ব্যয়ের সাথে রয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির সম্পর্ক। বাংলাদেশে দুর্নীতির কী হাল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উন্নয়ন যেমন ত্বরান্বিত হচ্ছে, তেমনি দুর্নীতি রোধে সরকারের সজাগ দৃষ্টি থাকতে হবে। দুর্নীতি রোধের জন্য দ্রুত জবাবদিহিতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এ বছরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বছরের শেষের দিকে নতুন সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে তৎপরতা শুরু হতে পারে। চলতি সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এর পরপরই সংসদ নির্বাচন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছরের শেষ দিকেও নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলো এ বছরের শেষ থেকেই প্রস্তুতি নেয়া শুরু করতে পারে। তাই এ বছরের শেষভাগ থেকে রাজনীতি ময়দানে গড়াতে পারে। একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলগুলোকে নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সেটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ বছরটিতে নির্বাচনী রাজনীতি জমে উঠতে পারে। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫