ঢাকা, শুক্রবার,২৮ এপ্রিল ২০১৭

অবকাশ

শীতের দিনে গুড়ের দেশে

শওকত আলী রতন

০৮ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শীতের সকাল মানেই পিঠা-পায়েস আর খেঁজুরের রস। সাথে নানা স্বাদের খেঁজুরের গুড়। খেঁজুরের গুড় ছাড়া শীতকাল যেন ভাবাই যায় না। খেঁজুরের গুড়ের সাথে জুড়ে আছে যশোর জেলার নাম। তাই যশোরের খেঁজুরের গুড় নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন শওকত আলী রতন

যশোর জেলার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে যে দিকে চোখ যায় দৃষ্টিগোচর হয় সারি সারি খেজুরগাছ। শীত মওসুমে খেজুরগাছ থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে রস উৎপাদন হয়ে থাকে। যশোর জেলায় বাণিজ্যিকভাবে গাছ থেকে রস সংগ্রহের মাধ্যমে গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে, তবে জেলা সদরের নিকটবর্তী এলাকা খাজুরায় সবচেয়ে বেশি গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। শীতের আগমনী বার্তাই স্থানীয় গাছিদের খেজুরগাছ কাটার কথা জানিয়ে দেয়। এখানকার গাছিরা বছরের আট মাস অন্যান্য কৃষিকাজের সাথে যুক্ত থাকলেও নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই চার মাস খেজুরগাছ কাটার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করে তারা। খেজুরগাছ কাটা, রস নামানো, গুড় তৈরি করা ও তা বাজারজাতকরণ সব মিলিয়ে যেন একটু ফুরসত মেলে না।
যশোরে তিন হাজারেরও বেশি খেজুরের বাগান রয়েছে। এ ছাড়া কৃষিজমির আইলের ওপর, সড়কপথ, রেললাইনের ধার, পতিত জমি, রাস্তার দু’পাশে ও বাগানসহ বিভিন্ন স্থানে রোপণ করা হয়েছে খেজুরগাছ। এখানকার বেশির ভাগ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আর এই খেজুরগাছকে ঘিরেই যেন প্রতিদিন জীবনের নতুন নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করে থাকে। তাই তো যশোরের যশ খেজুরের রস এই প্রবাদবাক্যটি এখন মানুষের মুখে মুখে। যশোর জেলার খাজুরা, শার্শা, বেনাপোল, নিজামপুর, মনিরামপুর, বারবাজার, বাঘারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার খেজুরের রস ও গুড়ের সুনাম রয়েছে। এর মধ্যে বাঘারপাড়ার খাজুরা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি রস ও গুড় উৎপাদন হয় বলে জানা যায়।
কথা হয় বাঘারপাড়া ইউনিয়নের গহেরপুর গ্রামের গাছি ওসমান মিয়ার সাথে। তিনি জানান, তার ৮০টির মতো খেজুরগাছ রয়েছে। এই ৮০টি গাছ দুই ভাগে ভাগে করে সপ্তাহভিত্তিক অর্থাৎ তিন দিন পরপর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে থাকেন। দুপুরের পর থেকে গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য হাঁড়ি পাতা হয়। পরদিন ভোরে গাছ থেকে সংগৃহীত রস টিনের বড় পাত্র স্থানীয় নাম তাফালের মধ্যে জাল দিয়ে গুড় তৈরি করে থাকেন।
এ ব্যাপারে কথা হয় বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের একজন গাছির সাথে। তিনি জানান, প্রতি বছর নভেম্বর মাস এলেই আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় শুধু খেজুরগাছের পেছনে। তিনি জানান, সরকার খেজুরগাছ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে রস থেকে গুড় তৈরি করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার এ শিল্পের সাথে যারা জড়িত তাদের কোনো সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসে না।
এ অঞ্চলের মানুষজন কৃষিকাজের সাথে যুক্ত থাকায় শীত এলেই গাছ কাটতে হয় বলে ব্যস্ততা যেন বেড়ে যায় বহুগুণে, তখন একটু বিশ্রামের সময়ও পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে কথা হয় কোদালিয়া গ্রামের গাছি আবু সাঈদের সাথে। তিনি জানান, খেজুরগাছ এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণ। এক সময় শুধু খেজুরের গুড় উৎপাদন করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত এ অঞ্চলের মানুষ। এখন প্রতিনিয়ত কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় মানুষ নানা কাজে ঝুঁকে পড়ছে। তার পরও একশ্রেণীর মানুষের জন্য খেজুরগাছই জীবিকার প্রধান উৎস।
খেজুরের গাছ থেকে উৎপাদিত রস দিয়ে তৈরি হয় নানা রকম পিঠা পায়েস ও গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিক উৎসব হয়ে থাকে যশোরে। তাই খেজুরের গাছ বিশেষ পরিচর্যা ও যতœ হয়ে থাকে। শীত এলেই বাড়তি পরিচর্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। অতিথি আপ্যায়ন ও জামাইজনকে দাওয়াত করে খাওয়ানো চলে খেজুরের রসকে কেন্দ্র করেই। রসের তৈরি নানা ধরনের বাহারি গুড়ের কদর বেড়ে যায় এই শীতেই। তবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের জন্য হাঁড়ি গুড়ের বাড়তি চাহিদা রয়েছে।
শীতের শুরুতেই যশোরের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে শুরু হয় খেজুরের রস সংগ্রহের প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগাড়। গাছ কাটার কাজে গাছিদের পাশাপাশি বাড়ির অন্য সব সদস্যকে এ কাজে সহযোগিতা করতে হয় সমানভাবে।
জানা যায়, একজন গাছি এক মওসুমে একটি গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ কেজি গুড় সংগ্রহের পরিমাণ রস নামিয়ে থাকেন। দেশের অন্যান্য স্থানে কাঁচা রসের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও যশোরে কাঁচা রসের চাহিদা নেই বললেই চলে। প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে থাকেন একজন গাছি।
এ অঞ্চলের খেজুরের রসের খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও জায়গা করে নিয়েছে। যশোরের রসের সুখ্যাতি রয়েছে সারা বিশ্বে। এ ব্যাপারে খাজুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিলন মোল্লা বলেন, খেজুরগাছের জন্যই যশোর জেলার আলাদা একটা পরিচিতি রয়েছে। এ সুখ্যাতি যাতে অক্ষুণœ থাকে সে জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। খেজুরগাছ যেমন আমাদের যশোর জেলাকে বিখ্যাত করেছে, তেমনি আমরাও খেজুরগাছ রক্ষার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করব।
যশোর জেলা বিভাগীয় কৃষি উপপরিচালক চিত্তরঞ্জন বিকাশ বলেন, বেশি করে খেজুরগাছ লাগানোর জন্য আমরা স্থানীয় কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া খেজুরগাছ রক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা আশা করি আগামীতে এ অঞ্চলে খেজুরের রসের উৎপাদন বাড়বে। আর এতে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫