ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২০ জুলাই ২০১৭

অবকাশ

শীতের পাণ্ডুলিপি

জীবনের বাঁকে বাঁকে

জোবায়ের রাজু

০৮ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শীত! ভাবতেই গা হিম হয়ে আসে। গা হিম হয়ে আসুক আর না আসুক, শীত কিন্তু আমার খারাপ লাগে না, বরং ভালোই লাগে। ছাত্রজীবনে যখন বাংলা দ্বিতীয়পত্রে প্রিয় ঋতু সম্পর্কে লিখতে বলা হতো, তখন প্রতিবার যে আমি ঘুরে ফিরে শীতের তাৎপর্য বর্ণনা করেছি, সেটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। কেন জানি শীতের শীতল পরিবেশ আমি বছরময় অনুভব করি। জীবনের এই বয়সে এসেও আজো শীতকাল এলে এক মৌন আনন্দে বিহ্বল হয়ে উঠি।
সেই সুদূরের শৈশবে কুয়াশার অস্তিত্বে জমা রেখেছিলাম অতীতের সকালগুলো। শীতের বিশুদ্ধ সকালগুলোতে তখন কুয়াশারা ঝাঁকে ঝাঁকে রুদ্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে গলে গলে এসে কয়ে কয়ে যেত ‘এই দুষ্ট বালক, কাঁথা ফেলে উঠো এবার। উঠোনে গিয়ে দেখো আমি রোদ এনেছি। তোমার জন্যে!’
রোদ! ওহ! আমার কাক্সিক্ষত রোদ। বৈরী কুয়াশা যখন আমার কাছে মাঘের তাৎপর্য শোনায়, রোদটাকে তখন মনে হতো খুব নিকটের কেউ। সে কারণে তার নাম রেখেছি ‘সোনা রোদ।’ আমার সোনা রোদ। এক উন্মাদ আবেগে সর্বাঙ্গে এই সোনা রোদ মাখি। কী সকালে! কী মধ্য দুপুরে। কোনো কোনো কুয়াশা যখন হানা দিত বেহায়ার মতো, আকাশ মেঘলা হতো অবেলায়Ñ এই আমি সোনা রোদকে কতই ডেকেছি ‘আয় আয় আয় আমার দ্বারে।’ তারপর হঠাৎ করে আকাশের সুঠাম বুক ভেঙে সূর্যের অবয়ব দেখা দিলে সেখান থেকে রোদ আসত আমার কাছে।
শিশির কণাকে মনে হতো আমার প্রাণ ও সই। ভিজে যাওয়া ঘাসবনে যখন মুক্ত বিচরণ করতাম চঞ্চল পায়ে, শিশিরবিন্দু আমার পা ভিজিয়েছে দুঃসাহস নিয়ে। ঘাসের যে বনে বনে শিশিরেরা ঝরে রোজ ভোরে, আমার এত ভালো লাগে কেন কে জানে! রোজ নিশিতে যখন ঘুমিয়ে গেছে সবাই, আমি যখন কাঁথা গায়ে জড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের পাতা উল্টাই, বাইরে তখন ঘরের টিনের চালে শিশির ঝরে পড়ার মৃদু আওয়াজ কানে বাজে। সুরের মতো, কঠিন কোনো রাগিণীর মতো সে মৃদু আওয়াজ তো এই শীত ছাড়া আর কোথায় পাবো!
সকালের খেজুর রসের অমৃত স্বাদ আর কোথায় পাবো! পশ্চিমের রাস্তার পাশে সারি সারি যে খেজুরগাছ দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ দিনের রূপ নিয়ে, তাতে মাটির কলসি দোলে এই শীতে। রাতভর মাটির কলসিতে খেজুর রস জমে। মা যখন চুলোর হাঁড়িতে সে রস বসান, তখন অধীর আগ্রহে বসে থাকি।
আমি আবার ফিরে আসি কুয়াশার সাতকাহনে। শুভ্র সফেদ কুয়াশার আস্তরণে আমার বুকের অতলে প্রেম জাগে। বৃক্ষের পাতায় পাতায় অথবা মাঠের প্রান্তে প্রান্তে দোদুল্যমান ধূসর কুয়াশারা আমাকে মাঘের কিচ্ছা শোনায়। কুয়াশার সফেদ চাদরে জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছে করে শীতের একেকটি সকালকে আর সকালের এক মুঠো রোদ্দুরকে। এভাবেই আমার চেতনার ইতিহাসে প্রতি বছর জমা হয় শীতের একেকটি পাণ্ডলিপি।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫