ঢাকা, শনিবার,২৫ মার্চ ২০১৭

মতামত

নোট বাতিল ও ব্যক্তিপূজা

হরিশ খারে

০৭ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৯:১৫


প্রিন্ট

আমরা কি কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যা আমাদের নিজের টাকা খরচ করার স্বাধীনতাটুকুও হরণ করে নেবে? “আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতার মতো আরেক ‘ঈশ্বর’ আমরা চাই না। শুধু যে আরেকজন ঈশ্বরের অবশ্যই কোনো প্রয়োজন নেই, তা নয়। প্রধানমন্ত্রীর অফিসকে যে অতিরিক্ত গুরুত্ব আমরা দিচ্ছি, তা-ও কমাতে হবে।”
জ্ঞানগর্ভ এসব উক্তি যিনি করেছেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে এখন নয়াদিল্লির একটি নার্সিং হোমে শয্যাশায়ী। বার্ধক্য ও আনুষঙ্গিক রোগব্যাধি গ্রাস করার অনেক আগে থেকেই ইনি বিজেপির পক্ষ থেকে সুশাসন আর গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার বিষয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য রাখতেন। মানুষটির নাম যসওয়ান্ত সিং। অটল বিহারি বাজপেয়ি আমলের সবচেয়ে শিক্ষিত, দায়িত্ববান ও চমৎকার আচরণের অধিকারী মন্ত্রী তিনি।
যসওয়ান্ত সিং ওপরের কথাগুলো বলেছিলেন ১৯৮৭ সালে। তখন লোকসভায় প্রধানমন্ত্রীর দলের আসন ছিল চার শতাধিক। রাজ্যসভাতেও তিনিই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। তার পক্ষে ছিলেন একদল গলাবাজ নেতা, যারা পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের পরিচালককে দমিয়ে রাখতেন। সে যুগের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এক কর্তাব্যক্তি প্রকাশ্যেই বিরোধী দলের নেতাদের ‘বোকাচণ্ডি’ বলে হেয় করতেন। সে সময়ে প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন সর্বেসর্বা এবং এর ফলে এমন বহু জাতীয় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, যার আর সুরাহা হয়নি।
আসুন, আমরা ইতিহাসের একটু গভীরে যাই। বছরটি ১৯৭১। কথিত আছে, কিংবদন্তিতুল্য সেনাব্যক্তিত্ব স্যাম মানেকশ অধৈর্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে ‘অ্যাকশন’ নেয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত হবেন না, যে পর্যন্ত না তিনি নিশ্চিত হবেন যে, এর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে এবং লজিস্টিক্যাল বাধাগুলো দূর হয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রীর সুবুদ্ধির উদয় হয়েছিল একজন জাঁদরেল অফিসারের জোরালো পরামর্শ গ্রহণ করার জন্য। পরে প্রধানমন্ত্রী দেখেছিলেন, কিভাবে ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী পাকিস্তানকে ভেঙে দিয়েছিল।
অতীতের এসব নজির স্মরণ করতে হলো সাম্প্রতিক ইতিহাসের কিছু শিক্ষা আবার তুলে ধরার জন্য। ১৯৭৫-৭৭ সাল থেকে এই শিক্ষাই দ্ব্যর্থহীনভাবে পাওয়া গেছে যে, সর্বশক্তিমান প্রধানমন্ত্রী আর তার অতি আকাক্সক্ষার প্রতি অনাস্থা বিদ্যমান থাকে। অত্যধিক ক্ষমতাশালী প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপারে সাবধান! ভারতের মতো বিরাট দেশ কোনো প্রধানমন্ত্রীর করুণায় এবং তার প্রজ্ঞা দিয়ে চলতে পারে না।
নোট বাতিল ও অদক্ষতা
এবার নোট বাতিল ইস্যুতে যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা হয়েছে, তা যাতনা ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যসওয়ান্ত সিংয়ের সতর্কবাণীর সত্যতাই তুলে ধরছে। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন ওই নেতার বিরুদ্ধে, যাকে বিধাতার পর্যায়ে তোলা হয় এবং যার প্রতি শর্তহীন আনুগত্য অবশ্য করণীয় মনে করা হয়। এবার নোট বাতিল ইস্যুতে সরকার চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এটাই স্পষ্ট যে, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) নিজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আর নিজস্ব অবস্থান পরিত্যাগ করেছে। জেনারেল স্যাম মানেকশ যেমন অতীতে একজন প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, তেমনি রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ‘ধীরে চলুন’ বলাটাই তার দায়িত্ব। গোটা দেশ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্তারা রিজার্ভ ব্যাংকের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন এবং তা করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।
অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণের প্রাধান্য
এমন এক সরকার ক্ষমতায়, যার সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা ব্যবস্থাপনার সাফল্যের জন্য বেশ গর্বিত। তারা অসম্ভবকে সম্ভব করে গুজরাটে নাম কুড়িয়েছেন অনেক। কিন্তু নোট বাতিলের পরে কী কী সমস্যা হতে পারে, সে ব্যাপারে তারা মনোযোগ দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ। এ ক্ষেত্রে চরম খামখেয়ালিপনা এবং এর নৈরাজ্যকর পরিণতিকে খাটো করতে বলা হচ্ছে, ‘এই দুর্ভোগ তো স্বাভাবিক।’ আরো বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী মোদির নোট বাতিলের উদ্দেশ্য ভালো।
অন্য মন্ত্রীদের কথা না হয় বাদই দিলাম, স্বয়ং অর্থমন্ত্রী কালো টাকার ওপর প্রধানমন্ত্রীর এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ব্যাপারে জানতেন কি না, নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কাগুজে মুদ্রা বা নোটের ব্যাপারে এই তুঘলকি আর অত্যন্ত কঠোর পরিবর্তন আনার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীকে কে দিয়েছে, সে ব্যাপারে দেশটা অন্ধকারে রয়ে গেছে।
চীনের আগ্রাসনের পর মোরারজি দেশাই স্বর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এরপর আর কোনো সরকারের কোনো পদক্ষেপ এবারকার নোট বাতিলের মতো এত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের জীবনে প্রভাব ফেলেনি। মনে হয়, সামষ্টিক ভাবনা আর সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অবাঞ্ছিতভাবে পুঞ্জীভূত হওয়ার ফল কেবল মন্দই হতে পারে। ব্যক্তিপূজার প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে ইতোমধ্যেই। প্রধানমন্ত্রী এবং তার ‘সাহসী’ পদক্ষেপের আদর্শিক রাজনৈতিক ও নৈতিক অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে। কেউ ‘নেতা’র সাথে দ্বিমত পোষণ করলে বলা হচ্ছে, একমত না হওয়া তার মজ্জাগত বদ অভ্যাস; তিনি ভুয়া সেকুলার এবং সম্ভাব্য দেশদ্রোহী। ভিন্নমত প্রকাশকারীকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে ‘দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসবাদীদের দোসর’ বলে।
একই লাইনের কর্মকর্তারা এহেন ‘রাজকীয় অসহিষ্ণুতা’ জনগণকে খামোশ রাখার ছাড়পত্র বলে মনে করছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইন্দোরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের যেকোনো সমালোচনাকে কর্তাব্যক্তিরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তাদের মতে, সামাজিক গণমাধ্যমের যুদ্ধ সামাজিক শান্তিকে করতে পারে বিঘ্নিত। ‘নেতা’ মিলিয়নকে মিলিয়ন নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে বিঘœ ঘটাতে পারেন। কিন্তু কোনো নাগরিক নিজের টাকার ওপর অধিকার হারিয়ে তার দুর্ভোগ জানানোর কিংবা ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার থেকেও বঞ্চিত। অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রীর দফতর মতামত জরিপ পরিচালনার জন্য সেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে। এভাবে তারা দাবি করছেন, ‘নোট বাতিলের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে।’
সরকারের ভীতিকর অনুপ্রবেশ
কোনো ব্যক্তি যতই জনপ্রিয়, জ্ঞানী ও সৎ হন, তাকে কেন মুদ্রা নিয়ে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেয়া হবে? এটা এক ধরনের স্টালিনবাদ। রাষ্ট্রের সামষ্টিক তাড়নাই লাগামছাড়া হয়ে পড়েছে। লাখ লাখ পরিবারকে বাধ্য করা হয়েছে তাদের যৎসামান্য সঞ্চয়ও ব্যাংকের কাছে সমর্পণ করতে। এই অর্থ এখন পাবে সর্বশক্তিমান সরকার। আর তা শাসক চক্রের অগ্রাধিকার মোতাবেক ছড়িয়ে দেয়া হবে।
স্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগরিকদের বাধ্য করেছিলেন শিল্পায়ন আর ‘মাতৃভূমির’ গৌরবের জন্য তাদের শ্রম দান করতে। আমরাও আমাদের জনগণকে বাধ্য করতে পারি তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় পুরোটাই উগড়ে দেয়ার জন্য। ‘বদের হাড্ডি’ পাকিস্তানকে লড়াই করে হারিয়ে দেয়ার জন্য এটা করতে হবে। আকারে ও শক্তিতে বিশাল, এমন এক সরকারের ভীতিপ্রদ অনুপ্রবেশ সম্পন্ন হয়েছে। দেশের সবচেয়ে প্রত্যন্ত জনপদের বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য। প্রতিদিন সরকার ফরমান জারি করে জানাচ্ছে, একজন নাগরিক কিভাবে কতটা ব্যবহার করতে পারবে তার নিজের টাকা। এসব কিছুই করা হচ্ছে, কারণ ‘নেতা’ বলেছেন ভারতকে রূপান্তরের জন্য ‘সাহসী’ হতে হবে। গত ৭০ বছরে কোনো ভারতীয় নেতাই এটা করেননি।
স্টালিনবাদের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে (ভার্চুয়াল) জনতাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে তারা নিন্দা করে এমন সব ব্যক্তির, যারা ক্ষমতাসীন সরকারের অগ্রাধিকার ও পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পায়। আমরা নতুন নতুন গোঁড়ামির জন্ম দিচ্ছি। যেমন, সরকারি উদ্যোগ ভালো, মন্দ কি অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হোক, তা দিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, যদি ঘোষণা করা হয় ‘এটা দুর্নীতি, কালো টাকা, সন্ত্রাসবাদ ও জাল নোটের বিরুদ্ধে’ লড়াই করতে সহায়ক হবে। সরকার চাচ্ছে, এসব লক্ষ্যে ‘আমাদের লড়াই’ চালাতে গেলে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, নাগরিকেরা তা যেন সহ্য করে যায়। কমরেড স্টালিনের আমলেও তার সরকারকে মেনে নেয়াই ছিল প্রত্যাশিত। শুধু দাঁড়িয়ে যান এবং হাতে তালি দিন। একজন রাজাকে সর্বদাই পরামর্শ দেয়া হতো, যাতে তিনি মানুষের দু’টি সম্পদে হাত না দেন- একটি জমি, আরেকটি জরু (নারী)। গণতান্ত্রিক হোক আর স্বেচ্ছাচারী হোক, শাসকেরা যখনই নাগরিকের ভূমি আর নারীর অধিকার ছিনিয়ে নিতে চেয়েছে, তখনই সম্মুখীন হয়েছে প্রতিরোধের। এখন আমরা দেখছি, নতুন এক পরীক্ষা। তা হলো, নির্বাচিত এক রাজা প্রজাদের জেবে (পকেট) হাত দিচ্ছেন। এর যা ফল হওয়ার, তা-ই হবে।

(‘ট্রিবিউন’ পত্রিকার সৌজন্যে)
ভাষান্তর- মীযানুল করীম

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫