ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

ভ্রমণ

শিল্পী এসএম সুলতানের বাড়িতে একদিন

এস আর শানু খান

০৭ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ১৮:১৭


প্রিন্ট

বিকেল বেলা বন্ধুদের আড্ডায় ঠিক হলো পরদিন ভোরে আমরা যাবো দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের বাড়ি দেখতে। কথা মতো সকালেই রওনা হলাম আমরা। আমাদের এলাকা থেকে ১৭ কিলোমিটারের রাস্তা নড়াইল মেইন শহর। ১০টা নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম নড়াইল শহরে। সেখান থেকে ইজিবাইকে উঠলাম। নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের পূর্ব পাশ ও চিত্রা নদীর পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে চলতে লাগল ইজিবাইক। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ইজিবাইকটা গিয়ে থামল এস এম সুলতানের বাড়ির সামনে। সবাই এক সাথে সুলতানের বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়ালাম। গেটের বাম পাশে একটি স্বাক্ষর ঘর। অভিজিত গিয়ে ওখানে স্বাক্ষর করে নাম ঠিকানা ও পেশার কথা লিখল। ভেতরে ঢুকে পড়লাম আমরা। ততক্ষণে ভেতরে মানুষ ভরে গেছে। সবাই ব্যস্ত ছবি আর সেলফি তোলায়। কেউ কেউ সুলতানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে। চোখে পড়ল সুন্দর করে লেখা ‘দয়া করে কেউ সমাধিতে জুতা বা স্যান্ডেল পরে উঠবেন না’।
সমাধিতে সাদা একটি টাইলসের ওপর কালো বর্ণে খোদাই করে বাংলা ও ইংরেজিতে লিখা
শিল্পী এস এম সুলতান
জন্ম : ১০ আগস্ট ১৯২৪।। ২৬ শ্রাবণ ১৩৩১
মৃত্যু : ১০ অক্টোবর ১৯৯৪।। ২৫ আশ্বিন ১৪০১
গেট দিয়ে ঢুকেই দুই পাশে নানা রকমের ফুলগাছের সমারোহ। রঙিন সব গাছ। একটু এগিয়ে ডান পাশে একটা ঘর। চার রুমবিশিষ্ট। একটি রুমে বড় পালঙ্ক পাতা রয়েছে। লেখা রয়েছে এস এম সুলতান এটাতে ঘুমাতেন। পাশের রুমে রাখা বড়, ছোট ও মাঝারি আকারের কয়েকটা নোঙর। কোনোটি কাচের ভেতর আবার কোনোটি পলিথিনের ভেতরে রাখা। একই রুমে আরো দেখলাম একটা কোদাল, কুড়াল, দা-কাচি জাতীয় আরো কিছু দৈনন্দিন জিনিসপত্র। আর একটি রুমে আলমারি পাতা, সেখানে রয়েছে অনেক বই। দূর থেকে ভালো দেখা যায় না। তবে একটি বইয়ের কভার পেজ দেখে মনে হলো ‘দি হানড্রেড’ মানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী। এই ঘরের উত্তরে আছে পাশেই সুলতানের সমাধি। এখানেই শায়িত দেশবরণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান। ওখান থেকে সোজা পূর্ব দিকে একটু এগিয়ে দেখি আর একটা গেট তালা মারা। উঁকি মেরে দেখা যায় নদী। সুলতানের চিত্রা নদী।
একটু দক্ষিণে বড় দুইতলাবিশিষ্ট ভবন। সিঁড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন এক চাচা। আমরা গেলে উনি জানালেন আর ভেতরে ঢোকা যাবে না। তা শুনে আমাদের সবার চোখ কপালে উঠল। আমি বললাম, চাচা আমরা অনেক দূর থেকে আসছি। সেই মাগুরা থেকে আসছি। চাচা অসংখ্যবার মাথা নাড়িয়ে বললেন না না না ভেতরে অনেক কাজ। চোখে পড়ল একটা লিফলেট। এতে লেখা সুলতান গ্যালারি সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ও বেলা ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত। তখন ১২টা বাজে। আমি বললাম, চাচা এখনো এক ঘণ্টা বাকি। উনি রেগে গিয়ে বললেন, আমি বলছি এখনই বন্ধ হবে। বন্ধু অভিজিত গিয়ে চাচাকে হাত ধরতে চেষ্টা করল। অভিজিত হাত দিয়ে ইশারা মারল আমাদের ঢুকে পড়তে। আমরা সেকেন্ডের মধ্যে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। দৌড়ে উঠে গেলাম দোতলায়। অপূর্ব সেলিম সনতকে বললাম, আগে দুইতলা ঘুরে আসি তার পর ফেরার পথে জোর করে হলেও নিচের তলার গ্যালারিতে ঢুকবো। দুইতলার বড় গ্যালারিতে প্রায় ৩২টার মতো ছোট বড় আকৃতির ছবি। শিল্পী সুলতান তার প্রতিটি ছবিতে তুলে ধরেছেন গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র। নানা স্মৃতি। প্রতিটি ছবির সাথে মিশে রয়েছে গ্রামবাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষের জয়গান। পেশিবহুল কৃষকের দেহ। আর সুঠাম লাবণ্যতা আর পূর্ণযৌবনে ভরপুর গ্রামবাংলার মহিলাদের ছবি। কখনো পুরুষেরা মাঠে পলো ঝাঁপিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে। কোনোটায় মাছ ধরছেন। কোনোটায় বর্ষা ছুড়ছেন। কোনোটায় আবার মাঝি নদী দিয়ে নৌকা বেয়ে বেড়াচ্ছেন। মহিলারা কলসি কাঁখে নদীর ঘাট থেকে পানি আনছেন। গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে শিল্পীর তুলিতে।
আরো দেখলাম শুধু ঘর, গাছগাছালি, পাখি, নদীর ছবিও এঁকেছিলেন এ মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি যে আসলে কতটা প্রকৃতিপ্রেমিক ছিলেন সেটা তার চিত্রকর্মই প্রমাণ করে। তিনি যে কত বড় খামখেয়ালিপনার মানুষ ছিলেন সেটা বোঝা যায় তার কিছু ছবি দেখলে। বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন অন্যতম খামখেয়ালিপনায় ভরপুর। নিজের প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন। খানেক বাদেই দেখি সেই চাচা ওপর তলায় হাজির হয়েছেন। সবাইকে বের করে দিলেন। সবার আগে আমরা নেমে পড়লাম। আমাদের মধ্য থেকে আমিই আগে নামলাম এবং নিচের তলায় ঢুকে পড়লাম। অভিজিত সেই চাচার সাথে আরামছে তর্কাতর্কি করছিলেন। নিচের তলায় ঢুকে দেখলাম আরো কিছু অসাধারণ চিত্রকর্ম। নিচের তলার গ্যালারির ঠিক মাঝ বরাবর একটা কাচের বাক্স। সেটার ভেতরে রাখা অনেক তুলি। যেগুলো দিয়ে শিল্পী ছবি আঁকতেন। এস এম সুলতান তেল রঙ আর জল রঙ দিয়ে জটের ক্যানভাসে ছবি আঁকেতন।
কাচের ভেতর দেখলাম একটা হারমোনিয়াম, একটা ভাঙা তবলা, কিছু পুরস্কারের স্মারক, একটা হাতির ডল, একটা বাঘের পুতুল। কিছু ছোট ছোট ছুরি বাটাল, উহো, আরো অনেক কিছু।
দেয়ালে কাচ দিয়ে সেলফ বানানো সেখানে রাখা আছে এস এম সুলতানে ব্যবহারের একটা শালের চাদর, একটা গাম্পার, তার নিচে কিছু স্মারক স্মৃতি। কিছু সাদা কাগজ ও কিছু লেখা কাগজ। একটা নূরানী বঙ্গানুবাদ কুরআন শরিফ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫