ঢাকা, শনিবার,২৫ মার্চ ২০১৭

মতামত

বছরের শুরুতে আবারো গাইড

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান

০৬ জানুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ২০:১৯


প্রিন্ট

শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল করার প্রাণন্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। যেখানে শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি কোনো শিক্ষক পাবলিক পরীক্ষায় নোট-গাইডবই থেকে প্রশ্ন করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়াসহ তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। সেই পাবলিক পরীক্ষায় গাইড থেকে প্রশ্ন করা হলো। এই যদি হয় বোর্ড পরীক্ষার চিত্র, তাহলে গোটা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কী হতে পারে! এটা জ্ঞানবান ব্যক্তি মাত্রই অতি সহজে আন্দাজ করতে পারবেন।
বিদ্যালয়গুলোতে চলবে গাইডের মহোৎসব। পুস্তক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে স্যারদের দ্বারে দ্বারে। কোনো কোনো প্রকাশনীর তরফ থেকে মোটা অঙ্কের ডোনেশন পেয়ে থাকেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। আবার ব্যক্তিগত কমিশনে কিছু শিক্ষক নি¤œমানের গাইডটি কৌশলে শিক্ষার্থীদের নিতে বাধ্য করেন।
বছর শেষে এমন কথাও শোনা যায়, একজন শিক্ষার্থী চার থেকে পাঁচটি গাইডবই কিনে নিয়েছে। কারণ তারা জানে, প্রশ্ন হবে হুবহু গাইড বই থেকে। তাই শত ভাগ নম্বর পাওয়ার নিশ্চয়তায় সব কালেকশনগুলোই তাদের কাছে থাকে। আবার কোনো কোনো প্রকাশনীর সাথে বিশেষ হৃদ্যতার সূত্র ধরে অনেক শিক্ষক তাদের রিপ্রেজেনটেটিভের মতো মার্কেট ধরিয়ে দেয়ার কাজটা সহজেই করে দেন। এর বিপরীতে দেখা যায়, বেশির ভাগ শিক্ষক গাইড বই দিয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করছেন, তা সত্ত্বেও কিছু শিক্ষক এমনটি সমর্থন না করলেও অতিরিক্ত ঝামেলা এড়াতে নিজেরাও সেই একই পথে চলছেন। কয়েকটি স্কুলের বার্ষিক ও অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে এর সত্যতা নিশ্চিত করা গেছে। এর সপক্ষে তাদেরও কিছু জোরালো যুক্তি রয়েছে, একটি প্রশ্নপত্রের জন্য সম্মানী হিসেবে তারা পেয়ে থাকেন এক শ’ টাকা, একটি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য তিন থেকে চার টাকা (কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে)। পরীক্ষা কমিটিগুলো চলে প্রধান শিক্ষকের পছন্দ মতো লোক দিয়ে। সংখ্যার হিসাবও তার মর্জিমাফিক। অথচ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বার্ষিক ও অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হয় ১৪০ টাকা। এ ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। আবার নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। কোমলমতি শিশুদের নিয়ে এভাবে হয়রানি আর কতদিন চলবে?
বর্তমান শিক্ষা আইনে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সব ধরনের নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ। বর্তমান প্রশাসন বিষয়টি যেমন এড়িয়ে যাচ্ছে, তেমন শিক্ষকেরাও আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই গাইডনির্ভর হয়ে পড়ছে। যদি গাইড বই থেকে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যেত, তাহলে আশা করি এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ লাভ করা সম্ভব হতো।
অভিভাবকদের দাবি, প্রকৃত অর্থে তাদের ছেলেমেয়েরা সৃজনশীল হোক। যেখানে একজন শিক্ষকই সৃজনশীল হতে পারেননি, তিনি কিভাবে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হিসেবে গড়ে তুলবেন। একজন শিক্ষক কেন সৃজনশীল হতে পারছেন না, সে বিষয়টি আমাদের ভেবে দেখা দরকার। একজন শিক্ষককে সৃজনশীলতা রপ্ত করার জন্য যে পরিমাণ সময় ব্যয় করা দরকার, তিনি কি সে সময়টা দিতে পারছেন? নাকি ইনকামের জন্য আউট সোর্স নিয়ে কর্মব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। প্রাইভেট-টিউশন করে করেই সময় কেটে যাচ্ছে। পেশাগত মানোন্নয়নের দিকে কোনো খেয়াল নেই। এ কারণে, মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রমোশন সিস্টেম থাকাটা খুবই প্রয়োজন। মাধ্যমিক স্তরের জন্য এটাই দুর্ভাগ্যের বিষয়। গবেষণামূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ততা নেই, প্রমোশন নেই। আছে কেবল টাকার পিছু ছুটাছুটি।
এ জন্য শিক্ষকদের অবশ্যই একটি নিয়মনীতির আওতায় আনা দরকার। যেখানে আইনি ভিত্তি হবে শক্তিশালী। সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা থাকবে। কেবল নীতিকথার ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে জীবনটাকে উপভোগ্য করা যায় না। ধরুন, একজন উচ্চপদস্থ আমলার কথা, তিনি কত টাকা বেতন পান, অথচ তাকে যে স্ট্যাটাস ম্যানটেইন করতে হয়; তাতে বেতন দিয়ে কতটা সামলাতে পারেন?
একজন শিক্ষকের উপরি পাওনার কোনো রাস্তা নেই, তাহলে সমাজের আর দশজন মানুষের মতো তিনিও কি ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারেন না? এ ক্ষেত্রে তিনি প্রাইভেট-টিউশনির পথ বেছে নেয়া ছাড়া আর কী করতে পারেন?
একবার চিন্তা করে দেখুন, আজকের এই কোমলমতি সহজসরল অবুঝ শিশুগুলোর কথা। যারা আগামীতে জাতির নেতৃত্ব দেবে। কাদের কাছে (সবাই নয়) আর কোনো মানসিকতায় এরা বেড়ে উঠছে। যাদের চিন্তা-চেতনায় রয়ে যায় পচা দুর্গন্ধের ছাপ তারা দুর্গন্ধ ছাড়া আর কি-ইবা ছড়াতে পারে। এ কথা হলফ করে বলা যায়, যত দিন না আমাদের শিক্ষকসমাজ বদলাবে তত দিন এ জাতি বদলাবে না। আর শিক্ষকসমাজ এমনিতে বদলাবে না। পালা বদলের হাওয়ায় তাদেরকেও উজ্জীবিত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কে করবে এ অসাধ্য সাধনের কাজটি?

লেখক : এম ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫