ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বৃদ্ধাশ্রমে নয়, আশ্রয় হোক সন্তানের কাছে

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

০৬ জানুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:৫৩


প্রিন্ট

সন্তানের কাছে মানুষের বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। থাকে শেষ বয়সে আদরের সন্তানের পাশে থেকে সুখ-দুঃখ ভাগ করার ইচ্ছা। আর এ ইচ্ছা নিয়েই প্রতিটি মা-বাবা প্রহর গুনতে থাকেন দিবা-রজনী। কিন্তু অনেকেরই সেই সন্তানের কাছে আশ্রয় না হয়ে; আশ্রয় হয় আপনজনহীন বৃদ্ধাশ্রমে। শেষ বয়সে মস্ত ফ্ল্যাটের ঘরের কোণেও জনমদুঃখী মা-বাবার এতটুকুও জায়গা মিলে না। তবুও প্রতিবাদ দানা বাঁধে না; মন অভিশাপ দেয় না।
আজ যারা বৃদ্ধ তারা নিজেদের জীবনের সব সময়, ধনসম্পদ বিনিয়োগ করেছিলেন সন্তানের জন্য, নিজের জন্য রাখেননি কিছুই। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে এর একটি ক্ষুদ্র অংশও তারা পাচ্ছেন না। কখনো দেখা যায় সন্তান তার নিজের পরিবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, তাই মা-বাবাকে মনে করছে বোঝা। এমনো দেখা যায় যে সন্তানের অর্থের অভাব নেই; কিন্তু মা-বাবাকে নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন মনে করছে না, বা বোঝা মনে করছে। হয় নিজেই পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, নয়তো অবহেলা দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে যেন তাদের মা-বাবা নিজেরাই সরে যান তার সাধের পরিবার থেকে।
একবার বৃদ্ধনিবাসে পাঠাতে পারলেই যেন সব দায়মুক্তি। এভাবে নানা অজুহাতে মা-বাবাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেক নামী-দামি বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকরিজীবী যারা একসময় খুব বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের সন্তানের মাধ্যমেই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক সন্তান বা আত্মীয়স্বজন আর তাদের কোনো খবরও নেন না। তাদের দেখতে আসেন না, এমনকি প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা বা জিনিসপত্রও পাঠান না। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানে বা ঈদের আনন্দের সময়ও মা-বাবাকে বাড়িতে নেন না। এমনও শোনা যায়, অনেকে বাবা বা মায়ের মৃত্যু শয্যায় বা মারা যাওয়ার পরও শেষবার দেখতে যান না।
বৃদ্ধাশ্রম অবহেলিত বৃদ্ধদের জন্য শেষ আশ্রয়। তাদের সারা জীবনের অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি, শেষ সময়ের সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া হয় এসব বৃদ্ধাশ্রমে। এখানে তারা নির্ভাবনায়, সম্মানের সাথে, আনন্দের সাথে বাকি দিনগুলো কাটাতে পারেন। প্রয়োজনে অনেক বৃদ্ধাশ্রমে চিকিৎসারও সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু সব প্রাপ্তির মধ্যেও এখানে যা পাওয়া যায় না তা হলো নিজের পরিবারের সান্নিধ্য। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তার সন্তান, নাতি-নাতনীদের সাথে একত্রে থাকতে চান। তাদের সাথে জীবনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চান। সারা জীবনের কর্মব্যস্ত সময়ের পর অবসরে তাদের একমাত্র অবলম্বন এই আনন্দটুকুই। বলা যায় এর জন্যই মানুষ সারা জীবন অপেক্ষা করে থাকেন। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় পাওয়া যায়, সঙ্গীসাথী পাওয়া যায়, বিনোদন পাওয়া যায়, কিন্তু শেষ জীবনের এই পরম আরাধ্য আনন্দটুকু পাওয়া যায় না; যার জন্য তারা এ সময়ে প্রবল মানসিক যন্ত্রণা আর ভারাক্রান্ত হƒদয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন।
যে মা-বাবা একসময় নিজে না খেয়েও সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, তারা আজ কোথায় ও কেমন আছেন সেই খবর নেয়ার সময় যার নেই, তার নিজের সন্তানও হয়তো এক দিন তার সাথে এমনই আচরণ করবে। বিভিন্ন উৎসবে, যেমন ঈদের দিনেও যখন তারা তাদের সন্তানদের কাছে পান না, সন্তানের কাছ থেকে একটি ফোনও পান না; তখন অনেকেই নীরবে অশ্রুপাত করেন আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
আমাদের মনে রাখা উচিত আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যান, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ সৃষ্টি করাই সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনো কোনো মা-বাবার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে একটা নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী।হ
লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫