ঢাকা, বুধবার,২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

অর্থনীতি

জলবায়ু সহনীয় গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্প

অনুদানের ৮১ ভাগ অর্থই নেবে ১৬১ পরামর্শক

হামিদ সরকার

০৬ জানুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:৪৫


প্রিন্ট

পরামর্শক বা কনসালট্যান্টদের সেবা করতেই বিদেশী সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে পরামর্শক, প্রশিক্ষণ ও বিদেশে কর্মকর্তাদের শিক্ষা সফরে। ফলে প্রকল্পের জন্য তেমন কোনো অর্থই থাকে না। প্রস্তাবিত জলবায়ু সহনীয় গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পে শুধু পরামর্শক সেবার জন্যই সাতটি খাত রাখা হয়েছে। আর ওই খাতে ১৬১ জন পরামর্শকের পকেটে যাবে ডানিডার অনুদানের ৮১ শতাংশ বা শত কোটি টাকা। অন্য দিকে পরামর্শক ছাড়াও প্রকল্পে জনবল হলো ২০০। পরিকল্পনা কমিশন আপত্তি জানিয়ে বলছে, বৈদেশিক অনুদানের প্রায় সবটুুকুই যদি পরামর্শক সেবায় ব্যয় হয়, তাহলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর প্রভাবে প্রায়ই জান ও মালের ক্ষতি হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের উপকূলীয় এলাকা ও জেলাগুলোতে ১০২টি পুকুর ও খাল খনন ও পুনর্খনন, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মাটি ভরাট, গ্রামীণ হাট উন্নয়ন, ঘাটলা নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণ করা হবে। আর এর জন্য ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছরমেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। যাতে ডানিডা দেবে ১০২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা অনুদান। বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারকে দিতে হবে। প্রথম পর্যায়ে ১৯টি উপজেলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু পরে বুয়েটের প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী এটি বাড়িয়ে ২৪টি করা হয়েছে। দাতা সংস্থার শর্তানুযায়ী অনুদানের ৮১ শতাংশ অর্থই পরামর্শক খাতে ব্যয় করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে অন্তত আটটি প্রলয়ঙ্কারী বন্যা হয়েছে। এতে দেশের ৫০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে দেশের তিনটি প্রধান নদীর (পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা) পানি একই সাথে বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করে। ফলে মধ্য জুলাই থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মারাত্মক বন্যা হয়ে থাকে। আর এই বন্যা ১৫ থেকে ২৫ দিন স্থায়ী হয়। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও গঙ্গার মতো দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ জন্য অধিকতর টেকসই এবং স্থায়ী অবকাঠামো করা জরুরি।
এ দিকে ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, প্রকল্প ব্যয়ে পরামর্শক সেবায় সাতটি উপখাতে এই ৮১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে। প্রকল্পে পরামর্শকের সংখ্যা হলো ১৬১ জন। প্রধান পরামর্শক হলো একজন। যার পেছনে ব্যয় হবে সাত কোটি টাকা। আর উপখাতগুলো হলোÑ আন্তর্জাতিক পরামর্শক, দেশী পরামর্শক ও টিএ সাপোর্ট স্টাফ ১৫৩ জন, শর্ট টার্ম পাঁচজন, বিল্ডিং সুপারভিশন পরামর্শক দুইজন, বেজলাইন মনিটরিং পরামর্শক, অপারেশনাল ও কাইমেট সেন্টার। এখানে দেশী পরামর্শক ও টিএ সাপোর্ট স্টাফের জন্য ব্যয় ৫৬ কোটি টাকা, শর্ট টার্ম পাঁচজনের জন্য দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা, বিল্ডিং সুপারভিশন পরামর্শক দুইজনের জন্য ৮৫ লাখ টাকা, বেজলাইন মনিটরিং পরামর্শকের জন্য ৬৫ লাখ টাকা, অপারেশনাল খাতে চার কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও কাইমেট সেন্টারের জন্য ১৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে শিক্ষা সফরে ব্যয় হবে চার কোটি ৬০ লাখ টাকা।
জানা যায়, প্রকল্পে ৮০ কিলোমিটার গ্রাম সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য দিকে, জিওবি টাকায় ৪০ জন জনবল এবং ডানিডার টাকার ১৫৪ জন জনবল রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটিও কমিশনের দৃষ্টিতে অত্যধিক বলে মনে হচ্ছে। তবে প্রকল্পের অনেক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরে আবার ওই প্রস্তাবিত ব্যয়ই অনুমোদন দেয় পরিকল্পনা কমিশন। এই অনুমোদনকে সমঝোতা বলে মনে করছেন খোদ পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।
এ দিকে পরামর্শক খাতে ব্যয়ের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশন সম্প্রতি পর্যালোচনা সভায় বলেছে, বৈদেশিক সহায়তার প্রায় সবটুকুই যদি পরামর্শক সেবায় চলে যায় তাহলে মূল কর্মসূচি বা পূর্ত কাজের উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। এ খাতে ব্যয় কমিয়ে আনা উচিত। অন্য দিকে এই ব্যয় খাতের পক্ষে শক্ত অবস্থান এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর। তার বক্তব্য হলোÑ মাঠপর্যায়ে জিওবি ও ডানিডা অর্থের সব কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য এই পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছে। অধিক পরিমাণে পরামর্শকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এখানে গ্রামীণ অবকাঠামো তাহলে কিভাবে নির্মাণ করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশনের প্রণীত মূল্যায়ন কমিটি মন্তব্য করেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫