ঢাকা, মঙ্গলবার,২৫ জুলাই ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহ : উত্তরণের পথ

আতিকুর রহমান নগরী

০৬ জানুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

একটু আশ্রয়ের জন্য দিগি¦দিক ছোটাছুটি করছে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। শুধু তারাই নয়, সারা বিশ্বে মুসলমানের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন মুসলমানরা নির্যাতিত। সত্যিই তো! এর কারণ কী? তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে শান্তির বার্তাবাহক মহানবী সা: বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন মুসলমানরা সংখ্যায় অধিক হবে, তদুপরি তারা কাফের-মুশরিক, নাস্তিক-মুরতাদ তথা বিধর্মী পরাশক্তির ফেলা জালে আবদ্ধ হয়ে নানা বিপদের সম্মুখীন হবে।’ এর কারণ হবে তারা ঐক্যের বন্ধনে থাকবে না। ঐক্য। যার গুরুত্বের অন্ত নেই। অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারী বিষয়টি হচ্ছে ঐক্য। মহান সৃষ্টিকর্তা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সব মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তাগিদ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর, আর পরস্পর পৃথক হয়ো না।’ (সূরা আল্-ইমরান, আয়াত ১০৩ ) হাদিস শরিফে মহানবী হজরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সা: ইরশাদ করেন, অর্থাৎ ‘আল্লাহর নুসরাত তথা সাহায্য দলবদ্ধ জামাতের ওপর।’ যেখানে ঐক্য নেই সেখানে খোদায়ি সাহায্য আশা করা আকাশ কুসুম ছাড়া কিছুই নয়। এ থেকেই আমরা অনুভব করতে পারি মুসলমানদের অধঃপতনের পেছনে মূল রহস্য কী?
মুসলিম উম্মাহর পতনের কারণ : হজরত আলী রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ভবিষ্যতে মানুষের সামনে এমন একটা যুগ আসবে যখন নাম ব্যতিরেকে ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আল-কুরআনের তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের মসজিদগুলো হবে বাহ্যিক দিক দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে হেদায়াতশূন্য। আর তাদের আলেমরা হবে আকাশের নিচে জমিনের ওপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।
কারণ তাদের মধ্য থেকে ইসলাম বা দ্বীন সম্পর্কে ফিতনা প্রকাশ পাবে। অতঃপর সে ফিতনা তাদের দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।’ (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান অধ্যায়)
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যা
এ হাদিসের মধ্যে রাসূল সা: মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নি¤েœাক্ত ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।
১. ইসলামের নামটা ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকবে না :
রাসূল সা: এই পৃথিবীতে এসেছিলেন সব মতবাদের উপরে ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সব দ্বীনের ওপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’ (সূরা আস-সফ, ৯)
ইসলামকে বিজয়ী আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে রাসূল সা: ও তাঁর সাহাবীগণ অবর্ণনীয় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:-এর মাধ্যমে দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং
তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।’ (সূরা মায়েদা, ৩)
মানবতার কল্যাণে যে ইসলাম বা জীবনব্যবস্থা পৃথিবীতে এসেছে সেই ইসলামের বাস্তব প্রতিফলন সমাজে থাকবে না। শুধু নামে থাকবে ইসলাম। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে দলে দলে বিভক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্কবাণী উল্লেখ পূর্বক খুবই সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দ্বীনকে বহু ভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।’ (সূরা মুমিনুন, ৫৩)। ‘যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।’ (সূরা আর-রূম, ৩২)
২. আল-কুরআনের আরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না :
মহাগ্রন্থ আল কুরআন বিশ্বমানবতার হেদায়াতের একমাত্র গাইডলাইন।
পৃথিবীর যে-কেউ হেদায়াত পেতে চাইলে তাকে এর ছায়াতলে আসতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।’ (সূরা বনি ইসরাইল, ৯) আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনে আরো বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের কাছে আল্লাহর পথ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।’ (সূরা মায়িদা ১৫-১৬) এই কুরআনকে সম্পূর্ণভাবে মেনে চললে সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘আর আমি তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।’ (সূরা আন-নাহল ৮৯)। বর্তমান সময়ের মুসলমানরা এই আল-কুরআনকে তিলাওয়াতসর্বস্ব কিতাবে পরিণত করেছে। এ কথার দ্বারা এটা মনে করার সুযোগ নেই যে, কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। বরং আল-কুরআন তিলাওয়াত করলে আপনি অবশ্যই প্রতি হরফে ১০টি করে নেকি পাবেন। এ সম্পর্কে রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল-কুরআন তিলাওয়াত করবে প্রতিটি হরফের তার জন্য রয়েছে ১০টি করে সওয়াব।’ (আল-বুরহান ফি উলুমিল কুরআন) আল-কুরআনের হক হচ্ছে তাকে তিলাওয়াত করতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে, বাস্তব জীবনে কুরআনের
বিধান মেনে চলতে হবে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা পাঠ করে যথার্থভাবে। তারাই তাঁর প্রতি ঈমান আনে। আর যে তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সূরা বাকারা )কারণ এই আল-কুরআন কিয়ামতের দিন আপনার আমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এ সম্পর্কে রাসূল সা: বলেছেন, ‘আল-কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে।’ (আহকামুশ-শরিয়াহ)
৩. হেদায়াতশূন্য জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদ :
রাসূল সা:-এর জামানায় মসজিদ ছিল সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রনায়ক রাসূল সা: এর কোনো রাজসিংহাসন ছিল না। ছিল না গণভবন বা প্রেসিডেন্ট মহল। মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে অথবা বসে ইসলামি রাষ্ট্রের সব কার্যাদি সম্পাদন করতেন।
মুসলিম জাতির আদর্শিক পিতা হজরত ইবরাহিম আ:-এর আদর্শ অনুসরণ করত: রাসূল সা: একটি সুসংগঠিত জাতি তৈরি করেছিলেন। আমরা আজ সে আদর্শে উদাসীন হয়ে নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এ যেন নি¤েœাক্ত হাদিসের জ্বলন্ত প্রমাণ। রাসূল সা: বলেছেন, ‘বনি ইসরাঈলরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল আর আমার উম্মতরা তেহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। তন্মধ্যে একটি ছাড়া বাকিরা জাহান্নামে যাবে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন সে দল কোনটি? রাসূল সা: বললেন, ‘আমি আমার সাহাবিদের নিয়ে যে কাজ করেছি এ কাজগুলো যারা করবে তারাই হবে জান্নাতি’।
Ñ সুনানে আত-তিরমিযি
এসব দল তৈরি হয়েছে খোলাফায়ে রাশিদিনের পর থেকে অদ্যাবধি সমাজের এক শ্রেণীর আলেমদের মাধ্যমে। রাসূল সা: রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে একটি অবিভাজ্য দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাসূল সা:-এর পর তাঁর উত্তরসূরি হজরত উমর রা: রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অনুরূপ একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এটাই মুসলিম বিশ্বের পতনের বহুবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ। একজন মুসলমান আর একজন মুসলমানকে বরদাশত করতে পারে না। বাংলাদেশেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অনৈক্য, দলাদলি ও বিভেদ রয়েছে মুসলমানদের মধ্যে। এমতাবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহ, রাসূল সা:-এর সিরাত ও সাহাবায়ে কেরামদের জীবনালেখ্য অধ্যয়ন করে সরাসরি আমল করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫